খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ই জুন ২০২৬, ২:৪০ এএম

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার বহলবাড়িয়া ইউনিয়নের নওদা খাদিমপুর গ্রামে অবস্থিত ক্ষুদ্রঋণভিত্তিক প্রতিষ্ঠান দীপিকা সমাজকল্যাণ সংস্থাকে ঘিরে দিন দিন ঘনীভূত হচ্ছে কোটি কোটি টাকার গ্রাহক আমানত আত্মসাৎ, আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ।
প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ দাউদার রহমান, তার ভাতিজা বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা আশিক আহমেদ সিদ্দিকী ওরফে পলাশ আহমেদ, এবং প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক আহসান হাবিবের বিরুদ্ধে আর্থিক অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও গ্রাহকদের কষ্টার্জিত সঞ্চয়ের টাকা ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী সদস্য ও এলাকাবাসী। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এলাকার সাধারণ মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক, নিম্ন আয়ের পরিবার, এমনকি প্রবাসী আয়নির্ভর পরিবারের সদস্যরাও নিরাপদ সঞ্চয় এবং অধিক লাভের আশায় প্রতিষ্ঠানটিতে কোটি কোটি টাকা জমা রাখেন। মেয়াদি সঞ্চয়, মাসিক কিস্তিভিত্তিক আমানত এবং বিভিন্ন লাভজনক স্কিমের মাধ্যমে বহু মানুষ তাদের জীবনের সঞ্চয় এখানে বিনিয়োগ করেন।
কিন্তু বর্তমানে সঞ্চয়ের মেয়াদ শেষ হলেও অধিকাংশ গ্রাহক তাদের জমাকৃত অর্থ ফেরত পাচ্ছেন না। টাকা চাইতে গেলে নানা অজুহাতে মাসের পর মাস ঘুরানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কখনো বলা হচ্ছে “আগামী সপ্তাহে আসেন”, কখনো “ঢাকা থেকে টাকা আসছে”, আবার কাউকে বলা হচ্ছে “কাগজপত্র প্রক্রিয়াধীন রয়েছে”। ফলে দিনের পর দিন অপেক্ষা করেও নিজেদের সঞ্চয় ফেরত না পেয়ে চরম হতাশা ও আর্থিক সংকটে পড়েছেন বহু পরিবার। অনেকের অভিযোগ, টাকা চাইতে গেলে দুর্ব্যবহার, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং হুমকি-ধামকির ঘটনাও ঘটেছে।
একাধিক স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের দাবি, একসময় দীপিকা সমাজকল্যাণ সংস্থায় ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকারও বেশি গ্রাহক আমানত ছিল। যদিও চেয়ারম্যান দাউদার রহমান পূর্বে দাবি করেছিলেন, প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৫ কোটি টাকার গ্রাহক সঞ্চয় রয়েছে। এই বিপরীত তথ্য নিয়ে এলাকাজুড়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন ও সন্দেহ। স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থা এতটাই নাজুক যে তহবিল কার্যত শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। ফলে সাধারণ মানুষের মনে বড় প্রশ্নকোটি কোটি টাকা কোথায় গেল? কারা এই অর্থ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল? কেন এখন পর্যন্ত গ্রাহকদের কাছে স্বচ্ছ হিসাব তুলে ধরা হচ্ছে না?
ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রতিষ্ঠানের অর্থ কোথায় ব্যয় হয়েছে, কীভাবে স্থানান্তর করা হয়েছে কিংবা কার নিয়ন্ত্রণে ছিল এসব বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য হিসাব দিতে পারেনি। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সিদ্ধান্ত ও অর্থ ব্যবস্থাপনা কার্যত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ দাউদার রহমানের নিয়ন্ত্রণেই পরিচালিত হতো। একইসঙ্গে তার ভাতিজা বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা মোহাম্মদ পলাশ আহমেদ প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কার্যক্রমে সরাসরি প্রভাব বিস্তার করতেন এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সম্পৃক্ত ছিলেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, ব্যাংকিং খাতের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে পলাশ আহমেদ প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন ও অর্থ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এমনকি অর্থ স্থানান্তর, আর্থিক অনিয়ম এবং লুটপাটের সুবিধাভোগী হিসেবেও স্থানীয়ভাবে তার নাম আলোচনায় রয়েছে।
যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পলাশ আহমেদ, তবে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার বিষয়টি পুরোপুরি এড়িয়ে যেতে পারেননি বলে দাবি স্থানীয়দের। ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্যমতে, গত ৩১ মে চেয়ারম্যান দাউদার রহমানের বাসভবনের সামনে গ্রাহক সদস্য, চেয়ারম্যান, নির্বাহী পরিচালক, চেয়ারম্যানের ভাতিজা পলাশ আহমেদ এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে গ্রাহকদের কাছ থেকে তিন মাস সময় নেওয়া হয়। প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, এই সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ অডিট সম্পন্ন করে প্রকৃত হিসাব প্রকাশ করা হবে এবং গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, বৈঠকের ১৭ দিন অতিবাহিত হলেও অডিট কার্যক্রম শুরু হওয়ার কোনো দৃশ্যমান আলামত পাওয়া যায়নি।
বরং আগের মতোই গ্রাহকদের অপেক্ষা করতে বলা হচ্ছে। এতে সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ, হতাশা ও অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। তাদের অভিযোগ, সময়ক্ষেপণের মাধ্যমে প্রকৃত আর্থিক অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সদস্য অভিযোগ করেন, চেয়ারম্যান ও তার ভাতিজার সিদ্ধান্ত ছাড়া প্রতিষ্ঠানে কোনো বড় আর্থিক লেনদেন হতো না। কোটি কোটি টাকা কোথায় গেল, তার জবাব আজও কেউ দিচ্ছে না। আমরা চাই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন হোক এবং আমাদের কষ্টের সঞ্চয় ফেরত দেওয়া হোক। আরেক ভুক্তভোগী বলেন, প্রতিষ্ঠানের ওপর অগাধ বিশ্বাস ছিল। সেই বিশ্বাসের কারণেই আমরা টাকা জমা রেখেছিলাম। এখন টাকা চাইলে শুধু নতুন নতুন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। এতে আমাদের আর্থিক ও পারিবারিক জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ইতিপূর্বে দীপিকা
সমাজকল্যাণ সংস্থার নির্বাহী পরিচালক আহসান হাবিব দাবি করেন, প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কার্যক্রম, আর্থিক লেনদেন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত মূলত চেয়ারম্যান নিজেই পরিচালনা করতেন। তার ভাষ্যমতে, প্রতিষ্ঠানে কোনো কার্যকর হিসাবরক্ষক, স্থায়ী ম্যানেজার কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত আর্থিক কর্মকর্তা কার্যকরভাবে নিয়োজিত ছিলেন না। গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ কোথায় রাখা হতো, কীভাবে পরিচালিত হতো এসব বিষয়ে চেয়ারম্যানই একমাত্র অবগত ছিলেন। আহসান হাবিব বলেন, “আমি কাগজে-কলমে নির্বাহী পরিচালক ছিলাম, কিন্তু বাস্তবে কোনো আর্থিক ক্ষমতা আমার হাতে ছিল না।
চেয়ারম্যান প্রায়ই বলতেন ‘তুমি বাইরে বাইরে থাকো, অফিসের বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে না। কোথাও স্বাক্ষরের প্রয়োজন হলে জানাব, তখন শুধু স্বাক্ষর করে দেবে।’” তিনি আরও অভিযোগ করেন, চেয়ারম্যান কখনো ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে, আবার কখনো হাতে নগদ অর্থ রেখে আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনা করতেন বলে তার ধারণা। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, আহসান হাবিব নিজেও একটি সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক থাকা অবস্থায় অধিক লাভের আশায় গোপনে প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করতেন এবং তার স্ত্রীও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির নামে থাকা প্রায় এক কোটি টাকা মূল্যের জমি বন্ধক রেখে নতুন করে ব্যাংক ঋণ নেওয়ার চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে চেয়ারম্যান মোহাম্মদ দাউদার রহমান পূর্বে বলেছিলেন, “আমাদের কাছে প্রায় ৫ কোটি টাকার গ্রাহক সঞ্চয় রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের জমি মর্টগেজ রেখে এক কোটি টাকা ঋণের চেষ্টা করছি। ঢাকার কয়েকটি ব্যাংকের সঙ্গে কথা চলছে। ঋণ পেলে সমস্যার সমাধান হবে।” তবে প্রশ্ন উঠেছে যেখানে গ্রাহকদের কোটি কোটি টাকার আমানত বকেয়া, সেখানে মাত্র এক কোটি টাকার ঋণ নিয়ে কীভাবে পুরো সংকটের সমাধান সম্ভব হবে? এ বিষয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি চেয়ারম্যান বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পায়। অভিযোগ রয়েছে, মিরপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল হালিমের নির্বাচনী প্রচারণায় প্রতিষ্ঠানটির অর্থ ব্যবহার করা হয়েছিল। এলাকাবাসীর ভাষ্য, প্রায় ১৫ বছর আগে একজন সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন মোহাম্মদ দাউদার রহমান।
পরে শিক্ষকতা ছেড়ে পুরোপুরি দীপিকা সমাজকল্যাণ সংস্থা পরিচালনায় যুক্ত হন। অল্প সময়ের ব্যবধানে কুষ্টিয়া শহরসহ বিভিন্ন স্থানে বহুতল ভবন, জমিজমা ও বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ায় তার সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একইভাবে স্থানীয়দের অভিযোগ, চেয়ারম্যানের ভাতিজা পলাশ আহমেদও নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন, যা নিয়েও এলাকায় নানা আলোচনা রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীপিকা সমাজকল্যাণ সংস্থার আর্থিক অনিয়ম, গ্রাহকদের আমানত ব্যবস্থাপনা, সংশ্লিষ্টদের সম্পদের উৎস এবং কোটি কোটি টাকার অর্থ কোথায় গেছে—এসব বিষয় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা জরুরি।
ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত তদন্ত শুরু করে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করুক এবং ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের কষ্টার্জিত সঞ্চয় ফেরতের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করুক। এ বিষয়ে সংস্থার চেয়ারম্যান মোহাম্মদ দাউদার রহমান ও তার ব্যাংক কর্মকর্তা ভাতিজা মোহাম্মদ পলাশ আহমেদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য