জামায়াত-শিবিরের নেতা কর্মীদের বিরুদ্ধে ভাংচুর-লুটপাটের অভিযোগ
বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ায় গণঅধিকার পরিষদ ও জামায়াত-শিবিরের নেতা কর্মীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে গণঅধিকার পরিষদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রঅধিকার পরিষদের কুষ্টিয়া সরকারী কলেজ শাখার সভাপতি সোহাগ আহমেদ তুফান, সাধারণ সম্পাদক মোসাদ্দেক হোসেন এবং সাংগঠনিক সম্পাদক শাহারিয়ার হোসনে সহ আরও ৪ থেকে ৫ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। এর মধ্যে সভাপতি সোহাগ আহমেদ তুফান. সাধারণ সম্পাদক মোসাদ্দেক হোসেনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন গণঅধিকার পরিষদের জেলার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল খালেক।
এছাড়াও গণঅধিকার পরিষদের জেলার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল খালেকের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে নগদ ৫ লক্ষ টাকা লুট, ৪টি এসি চুরি, ২টি এসি ভাংচুর, ২টা কম্পিউটার ভাংচুর, সিসি ক্যামেরা ভাংচুর ও সিসি ক্যামেরার ডিভিআর মেশিন চুরির অভিযোগ উঠেছে জামায়াত-শিবিরের নেতা কর্মীদের বিরুদ্ধে। গণঅধিকার পরিষদের জেলার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল খালেকের ভাষ্যমতে, তার ব্যক্তিগত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার ফলে তার ৪০ লক্ষাধিক টাকার ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে।
অন্যদিকে এই ঘটনায় কুষ্টিয়া সদরের স্ব-ঘোষিত প্রধানমন্ত্রী সদর আসনের জামায়াত এমপি আমির হামজার গাড়ী ভাংচুরেরও অভিযোগ পাওয়া গেছে। জানা যায়, গতকাল শনিবার (১৫ আগস্ট) সন্ধার আগে কুষ্টিয়া শহরের ছয়রাস্তার মোড়, থানাপাড়া, এনএস রোড ও হাইস্কুল মার্কেট এলাকায় এসব ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের সময় ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও র্যাব সদস্যদের তৎপর হতে দেখা যায়।
এছাড়াও সংঘর্ষের পর সন্ধ্যা সাতটার দিকে শহরের হাইস্কুল মার্কেট এলাকায় গণঅধিকার পরিষদের জেলা কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, আমির হামজার সমর্থক হিসেবে পরিচিত একদল নেতা-কর্মী লাঠিসোঁটা নিয়ে সেখানে হামলা চালান। পরে তারা মিছিল নিয়ে ছয়রাস্তা মোড়সংলগ্ন হরিপুর সংযোগ সেতুর নিচে যায়। সেখানে গণঅধিকার পরিষদের জেলা সাধারণ সম্পাদক আবদুল খালেকের ব্যক্তিগত কার্যালয়ে ভাঙচুরের অভিযোগও ওঠে।
এ সময় ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালন করতে যাওয়া কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে হামলাকারীদের বাকবিতণ্ডা ও অসদাচরণের ঘটনাও ঘটে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। ঘটনার পরে রাত্রে দুই দলের পক্ষ থেকে কুষ্টিয়া শহরের এনএস রোডে পৃথক বিক্ষোভ মিছিল করা হয়েছে।
পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আমির হামজা গণঅধিকার পরিষদ ও সংগঠনটির নেতাদের নিয়ে বক্তব্য দেন। ওই বক্তব্যের প্রতিবাদে শনিবার বিকেলে শহরের থানাপাড়া জামে মসজিদের সামনে ছয়রাস্তার মোড়ে প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করে গণঅধিকার পরিষদ। সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে আমির হামজা একটি অনুষ্ঠান শেষে গাড়িতে করে নিজ বাসার দিকে যাচ্ছিলেন। তাঁর গাড়ির সামনে ও পেছনে পুলিশ ও র্যাবের গাড়ি ছিল।
গাড়িটি ছয়রাস্তার মোড়ে পৌঁছালে সমাবেশে থাকা গণঅধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে গাড়িবহরের সঙ্গে থাকা জামায়াত-শিবিরের নেতা কর্মীদের ধাক্কাধাক্কি ও পাল্টাপাল্টি স্লোগান শুরু হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরে উভয় পক্ষের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। এতে আমির হামজার গাড়ির পেছনের কাচসহ বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
জেলা জামায়াতের আমির খন্দকার এ কে এম আলী মহসীন অভিযোগ করেন, গণঅধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা আমির হামজার গাড়িতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেছেন। তাঁর দাবি, হামলার ঘটনায় ছাত্রদলের লোকজনও গণঅধিকার পরিষদের সঙ্গে ছিল। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে বিএনপি।
অন্যদিকে গণঅধিকার পরিষদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি শেষে নেতা কর্মীরা ফিরে যাওয়ার সময় জামায়াত-শিবিরের নেতা কর্মীরা তাদের ওপর হামলা চালান। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হাসান আল মামুন তাঁর ফেসবুক পোস্টে দাবি করেন, হামলায় গণঅধিকার পরিষদের ৪০-৫০ জন নেতা-কর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন।
কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন জানান, রক্তাক্ত অবস্থায় তিনজন হাসপাতালে এসেছিলেন। তাঁদের শরীরে সামান্য কাটাছেঁড়ার চিহ্ন ছিল। প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে তাঁরা চলে যান।
গণঅধিকার পরিষদের কুষ্টিয়া জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক তৌকির আহমেদ বলেন, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি শেষে ফেরার সময় জামায়াত-শিবিরের নেতা কর্মীরা তাঁদের ওপর হামলা চালান। এতে তাঁদের কয়েকজন নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন। তবে জামায়াতের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, আমির হামজার গাড়িতে পরিকল্পিতভাবে হামলা করা হয়েছে এবং তাঁদের নেতা-কর্মীরা তা প্রতিহত করতে গেলে সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়।
এদিকে কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্যসচিব জাকির হোসেন সরকার জামায়াতের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা গিয়ে দুই পক্ষকেই সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাঁর ভাষ্য, আমির হামজার বক্তব্যের প্রতিবাদেই গণঅধিকার পরিষদ সমাবেশ করছিল এবং বিএনপি সংঘর্ষে জড়িত ছিল না।
আমির হামজার মিডিয়া সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত তানভীর হোসাইন অভিযোগ করেন, গাড়িবহর বাসায় ফেরার সময় গণঅধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা গাড়িতে ইট নিক্ষেপ করেন। তাঁর পায়েও ইটের আঘাত লেগেছে বলে দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে সংসদ সদস্য আমির হামজা বলেন, ‘আমি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই দিকে প্রোগ্রামে ছিলাম। রাস্তাঘাট কালভার্ট কোথায় কোনটা করতে হবে সেই তথ্য নিচ্ছিলাম। আমি ২০ তারিখে মন্ত্রণালয়ে যাবো সেজন্য। এ সময় খবর পাই আমার বাবা-মা তুলে আমাকে গালাগালি করছে। আমি সদর থানার ওসিকে কল দিই। তার গাড়ি আগে এবং আমার গাড়ি পেছনে ছিল। এ সময় অতর্কিতভাবে আমার গাড়িতে লাঠি-হকিস্টিক দিয়ে হামলা করা হয়। গাড়ির সামনে বসে থাকা আমার চাচার পা কেটে যায় ও আমি মাথায় আঘাত পেয়েছি। গণধিকার পরিষদের আব্দুল খালেক ও তৌকিরের নেতৃত্বে এ হামলার ঘটনা ঘটেছে। আমি এ বিষয়ে আজকেই মামলা করবো।
অন্যদিকে কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কবির হোসেন মাতুব্বর বলেন, পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল। এর মধ্যেই হঠাৎ ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। সংসদ সদস্য আমির হামজা নিরাপদে তাঁর বাসায় আছেন এবং পরিস্থিতি আপাতত নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সংঘর্ষের পর সংসদ সদস্য আমির হামজার বাসার আশপাশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
সন্ধ্যার দিকে তাঁর বাসার সামনে বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী জড়ো হন। তাদের কয়েকজনের হাতে লাঠিসোঁটা দেখা যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। ঘটনার পর শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের টহল ও অবস্থান জোরদার করা হয়েছে। রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত দুই দলের পক্ষ থেকেই আইনি পদক্ষেপ গ্রহন প্রক্রিয়াধীন আছে বলে জানাগেছে।








