কুষ্টিয়াকে বাদ দিয়ে পাংশায় পদ্মা ব্যারেজ - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

কুষ্টিয়াকে বাদ দিয়ে পাংশায় পদ্মা ব্যারেজ

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: মে ২০, ২০২৬

পুনর্বিবেচনার দাবি

 

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের পানি সংকট নিরসনে বহুল আলোচিত ‘পদ্মা ব্যারেজ’ মেগাপ্রকল্প অনুমোদনের পর কুষ্টিয়াজুড়ে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিকভাবে কুষ্টিয়ায় ব্যারেজ নির্মাণের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলাকে প্রকল্প বাস্তবায়নের স্থান হিসেবে চূড়ান্ত করায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন জেলার সচেতন নাগরিকরা।

তারা বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) রাজবাড়ীর পাংশা পয়েন্টে পদ্মা নদীর ওপর ব্যারেজ নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। প্রায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্প ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং পুরো অর্থায়ন হবে সরকারি তহবিল থেকে। প্র

কল্পের আওতায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারেজ, ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট, ১৮টি আন্ডার স্লুইস, দুটি ফিশ পাস, নেভিগেশন লক এবং ১১৩ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি গড়াই-মধুমতী নদীতে ড্রেজিং, হিসনা নদী ব্যবস্থাপনায় পুনঃখনন এবং বিভিন্ন অঞ্চলে পানি প্রবাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও পরিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

সরকারের দাবি, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে খুলনা, রাজশাহী, ঢাকা ও বরিশাল বিভাগের ১৯টি জেলা উপকৃত হবে। হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতী, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদী ব্যবস্থাপনা পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট কমবে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা ও মরুকরণ রোধে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তবে প্রকল্পটির স্থান নির্বাচন নিয়ে কুষ্টিয়ায় নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০০২ সালে পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা (ডঅজচঙ) পরিচালিত প্রাক-সমীক্ষায় গঙ্গা বা পদ্মা নদীতে ব্যারেজ নির্মাণের জন্য কুষ্টিয়ার ঠাকুরবাড়ি ও রাজবাড়ীর পাংশা—এই দুটি স্থানকে সম্ভাব্য সাইট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে কারিগরি সমীক্ষা ও নকশা প্রণয়নের ভিত্তিতে পাংশাকে চূড়ান্ত স্থান হিসেবে নির্বাচন করা হয়। এ সিদ্ধান্তে কুষ্টিয়ার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, কুষ্টিয়ার ঠাকুরবাড়ি এলাকায় ব্যারেজ নির্মাণ করা হলে জেলার কৃষি, নদীপথ, মৎস্যসম্পদ ও আঞ্চলিক অর্থনীতি আরও বেশি উপকৃত হতে পারত। একইসঙ্গে পদ্মা নদীর ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় কুষ্টিয়াও একটি যৌক্তিক ও সম্ভাবনাময় স্থান ছিল বলে তারা মনে করেন। এদিকে পরিবেশ ও পানি বিশেষজ্ঞদের একাংশ প্রকল্পটি নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।

তাদের মতে, শুধু প্রত্যাশিত সুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়ে এমন বড় মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়ন না করে এর সম্ভাব্য পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও আন্তঃদেশীয় প্রভাব গভীরভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, উজানে পলি জমে নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে গেলে পাংশা থেকে রাজশাহী পর্যন্ত নদীভাঙন বৃদ্ধি, বন্যার ঝুঁকি এবং কিছু এলাকায় পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি ভারতের ফারাক্কা বাঁধের বাস্তবতায় কার্যকর পানি বণ্টন চুক্তি ছাড়া প্রকল্পটির কাঙ্ক্ষিত সুফল পুরোপুরি পাওয়া কঠিন হতে পারে। এ অবস্থায় কুষ্টিয়াবাসী পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের স্থান নির্বাচন পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।

তারা মনে করেন, কুষ্টিয়াকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নতুন করে পর্যালোচনা করা উচিত এবং বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করেছেন।

এ বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্য সচিব প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার বলেন, পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য যদি পানি সংকট নিরসন, কৃষি উন্নয়ন, নদী পুনরুজ্জীবন ও আঞ্চলিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা হয়, তাহলে কুষ্টিয়ার ঠাকুরবাড়ি অঞ্চল আরও উপযোগী ও কার্যকর স্থান হতে পারত। তিনি বলেন, “ঠাকুরবাড়ি এলাকায় ব্যারেজ নির্মাণ করা হলে প্রকল্পের লক্ষ্য শতভাগ সফলভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হতো। একইসঙ্গে একটি সেতু নির্মাণ হলে কুষ্টিয়া ও পাবনার মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেত। কর্মসংস্থান, শিল্প-বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতো, যা বৃহত্তর অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করত।”

অন্যদিকে কেন্দ্রীয় বিএনপির স্থানীয় সরকার বিষয়ক সম্পাদক ও কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের প্রশাসক, বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিন বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি সংকট নিরসনে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়ন সময়ের দাবি এবং জাতীয় স্বার্থে এটি দ্রুত বাস্তবায়ন হওয়া জরুরি। তিনি বলেন, “এটি কোনো একক জেলার প্রকল্প নয়; বরং জাতীয় প্রয়োজনের একটি বৃহৎ উদ্যোগ। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কারিগরি বিশেষজ্ঞরা যেখানে অধিক উপযোগী মনে করবেন, সেখানেই ব্যারেজ নির্মাণ হওয়া উচিত। আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত—প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত সুফল নিশ্চিত করা।”

অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিন আরও বলেন, “শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান গঙ্গা ব্যারেজ প্রকল্পের ভিত্তি ও ভাবনা তৈরি করেছিলেন। পরবর্তীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এ প্রকল্পকে পুনরায় সক্রিয় করার উদ্যোগ নেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই প্রকল্প অনুমোদনের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের একটি জাতীয় প্রত্যাশা বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নিয়েছেন।”

এদিকে কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কুতুব উদ্দিন আহমেদ বলেন, পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প একটি কারিগরি ও সম্ভাব্যতা নির্ভর বিষয়। সরকারি সমীক্ষায় পাংশা ও কুষ্টিয়ার ঠাকুরবাড়ি দুটি স্থানই সম্ভাব্য হিসেবে ছিল। তাই স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে কী ধরনের কারিগরি যুক্তি কাজ করেছে, তা জনসম্মুখে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, “যদি কারিগরি ও সম্ভাব্যতার বিচারে পাংশা অধিক উপযোগী হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের আপত্তি নেই। তবে কুষ্টিয়ার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলন করেছে। আমাদের বিশ্বাস, ঠাকুরবাড়ি পয়েন্টে ব্যারেজ নির্মাণ করা হলে কুষ্টিয়া-পাবনার যোগাযোগ বৃদ্ধি, আঞ্চলিক অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হতো।” তিনি আরও বলেন, “আমরা আরও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছি। যদি প্রকৃত কারিগরি ফিজিবিলিটির প্রশ্ন থাকে, আমরা তা সম্মান জানাবো। তবে যৌক্তিকতার প্রশ্নে কুষ্টিয়া অধিক উপযোগী হলে কুষ্টিয়ায় ব্যারেজ বাস্তবায়নের দাবি আরও জোরালোভাবে উত্থাপন করা হবে।”