খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ই জুন ২০২৬, ৩:৪০ এএম

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ “আমি তিন মাসের গর্ভবতী। বারবার বলেছি আমাকে ছেড়ে দেন, আমার শরীর খারাপ, আমি সন্তানসম্ভবা। অনেক কাকুতি-মিনতি করেছি, কিন্তু কেউ আমার কথা শোনেনি। আমাকে ছয়তলায় আটকে রাখা হয়েছিল। জানালা দিয়ে মানুষ দেখে চিৎকার করে বলেছি—আমাকে বাঁচান।” কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই নিজের ওপর ঘটে যাওয়া বিভীষিকার বর্ণনা দিয়েছেন কুষ্টিয়া শহরের থানাপাড়া এলাকার বাসিন্দা অন্তি। স্বামীর বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগের জেরে তাকে শহরের গোরস্থানপাড়া এলাকার একটি বাড়ির ছয়তলায় আটকে রেখে মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ ঘিরে কুষ্টিয়া শহরজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগী অন্তির দাবি, গত শুক্রবার ভোর আনুমানিক ৬টার দিকে তাকে কৌশলে শহরের শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. এইচ এস কল্লোলের পৈতৃক বাসভবনে নিয়ে যাওয়া হয়।
সেখানে নিয়ে যাওয়ার পর থেকেই তার স্বামী জীবন কোথায় আছেন, সে বিষয়ে তথ্য দেওয়ার জন্য তার ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়। অন্তি বলেন, তারা আমাকে বারবার বলছিল আমার স্বামী কোথায় আছে তা জানাতে। আমি বলেছি, আমি জানি না সে কোথায় আছে। তারপরও তারা বিশ্বাস করেনি। আমি তিন মাসের গর্ভবতী ছিলাম। শরীর খারাপ লাগছিল। এরপর দুপুরের দিকে আমাকে বাড়ির ছয়তলায় নিয়ে রাখা হয়। বাইরে যেতে দেওয়া হয়নি, কারও সঙ্গে যোগাযোগও করতে পারিনি। তিনি আরও বলেন, আমি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল আমার কোনো ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। বারবার বলেছি, আমি গর্ভবতী, আমাকে ছেড়ে দেন। কিন্তু কেউ আমার কথা শোনেনি। পরে জানালার কাছে গিয়ে দেখি নিচে মানুষজন চলাফেরা করছে। তখন চিৎকার করে বলেছি—‘আমাকে বাঁচান, আমাকে দুই দিন আটকে রাখা হয়েছে।’
অন্তির ভাষ্য অনুযায়ী, বিকেল ৩টার দিকে তার চিৎকার শুনে স্থানীয় বাসিন্দারা ঘটনাটি জানতে পারেন। পরে তারা জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন দেন। খবর পেয়ে পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যান। পরে পরিবারের সদস্যদের জিম্মায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। অন্তির ভাই জুবাইর ইসলাম অভিযোগ করেন, তার বোনের স্বামী জীবনের বিরুদ্ধে নির্মাণাধীন বাড়ি থেকে মালামাল চুরির অভিযোগ রয়েছে। তবে সেই অভিযোগের কোনো বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীকে আটকে রাখা সম্পূর্ণ বেআইনি ও অমানবিক। পরিবারের আরেক সদস্য ইসমতারা বলেন, আমার ননদ অন্তঃসত্ত্বা। তাকে ঠিকমতো খেতেও দেওয়া হয়নি। একজন গর্ভবতী নারীর সঙ্গে এমন আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, ডা. কল্লোলের পরিবারের বিরুদ্ধে অতীতেও গৃহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও নির্যাতনের নানা অভিযোগ শোনা গেছে।
এদিকে, সরাসরি সাক্ষাৎকারে শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. এইচ এস কল্লোল তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, যে বাড়ির কথা বলা হচ্ছে, সেটি আমার বাবা-মায়ের বাড়ি। এখনও তারা ওই বাড়িতেই থাকেন। আমি আলাদা বাসা ভাড়া করে থাকি। তিনি বলেন, তার বাবা-মায়ের ওই বাড়িতে বর্তমানে নির্মাণকাজ চলছে। ডা. কল্লোলের ভাষ্য, নির্মাণাধীন ওই বাড়ি থেকে কিছু মালামাল চুরির অভিযোগ ওঠে এবং ওই ঘটনায় ভুক্তভোগী নারীর স্বামী জীবনকে সন্দেহ করা হয়। তিনি বলেন, গত শুক্রবার রাতে আমি মাকে নিয়ে থানায় গিয়েছিলাম। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটি তারা তদন্ত করছে। এর আগে, গত শুক্রবার রাতে ডা. কল্লোল ও তার মাকে কুষ্টিয়া মডেল থানায় প্রবেশ করতে দেখা যায়। কিছুক্ষণ পর তারা দ্রুত থানা ত্যাগ করেন। উপস্থিত সাংবাদিকরা এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ কবির হোসেন মাতুব্বর বলেন, ওই নারীকে উদ্ধার করে তার ভাইয়ের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে। তিনি পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন বলে জানিয়েছেন। তিনি যদি আইনগত সহায়তা চান, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একজন তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা নারীকে স্বামীর বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগের জেরে আটকে রাখার অভিযোগ, জানালা দিয়ে তার আর্তচিৎকার, স্থানীয়দের ৯৯৯-এ ফোন করে উদ্ধার অভিযান এবং অভিযুক্ত চিকিৎসকের অভিযোগ অস্বীকার সব মিলিয়ে ঘটনাটি কুষ্টিয়া শহরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য