খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ই জুন ২০২৬, ৩:২৯ এএম

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ পিতা জীবিত, একই শহরে অবস্থান করছেন তবুও দীর্ঘ দেড় বছর ধরে পিতার স্নেহ, ভালোবাসা ও দায়িত্ব থেকে বঞ্চিত দুই সন্তান। একদিকে বাবার দ্বিতীয় বিয়ে, অন্যদিকে ভরণপোষণ বন্ধ ও উচ্ছেদের আশঙ্কা সব মিলিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে কুষ্টিয়া শহরের হাজীর গলির বাসিন্দা রুকাইয়া খাতুন (১৮) ও ইবনে আব্দুল্লাহর (১৪)। দুই ভাইবোনের দাবি, “আমরা আমাদের বাবাকে ফিরে পেতে চাই।” তাদের পিতা মোঃ শিপন উদ্দিন (৪২), দীর্ঘ প্রায় ২২ বছর ধরে দুবাই প্রবাসী। তার গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কয়া ইউনিয়নে।
পিতা আব্দুল জলিলের ছেলে শিপন কুষ্টিয়া শহরের হাজীর গলিতে তিনটি বহুতল ভবনের মালিক বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, দেড় বছর আগে প্রথম স্ত্রী ও দুই সন্তানকে গোপন রেখে তিনি আরেক বিধবা নারীকে বিয়ে করেন। ওই নারীর আগের সংসারের একটি সন্তানও রয়েছে। দ্বিতীয় বিয়ের পর থেকে শিপন কুষ্টিয়া শহরের চামড়াপট্টি এলাকায় দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করছেন বলেও অভিযোগ করা হয়। এমন অভিযোগ তুলে শনিবার সকাল ১১টায় কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের এম এ রাজ্জাক মিলনায়তনে দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন শিপনের প্রথম স্ত্রী রিমা খাতুন।
সেখানে লিখিত বক্তব্যে তিনি তার দাম্পত্য জীবনের নানা নির্যাতন, প্রতারণা ও আর্থিক সংকটের কথা তুলে ধরেন। সংবাদ সম্মেলনে রিমা খাতুন বলেন, প্রায় ২২ বছর ধরে স্বামী বিদেশে অবস্থান করলেও তিনি সংসার ও সন্তানদের দায়িত্ব একাই পালন করেছেন। বহু কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করে সন্তানদের মানুষ করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু প্রায় দেড় বছর আগে তিনি জানতে পারেন, তার স্বামী তাকে ও দুই সন্তানকে গোপন রেখে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। এমনকি দ্বিতীয় বিয়ের সময় তার পূর্ববর্তী সংসার, স্ত্রী ও সন্তান থাকার বিষয়টিও গোপন রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
রিমা খাতুনের দাবি, দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর থেকেই তার জীবনে নেমে আসে দুর্ভোগ। তিনি অভিযোগ করেন, স্বামী তাকে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করেছেন, মারধর করেছেন এবং একাধিকবার প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছেন। অতীতেও স্বামীর বিরুদ্ধে একাধিক নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি। এসব বিষয়ে তিনি পূর্বে থানায় অভিযোগ করলেও কার্যকর সমাধান হয়নি বলে দাবি করেন। তিনি আরও জানান, চলতি মাসের ১৮ তারিখে তাকে তালাক দেওয়া হয়েছে।
তালাকের পর স্বামী হিসেবে ন্যূনতম দায়িত্বও পালন করা হচ্ছে না। গত দেড় বছর ধরে দুই সন্তানের কোনো ভরণপোষণ বা খরচ দিচ্ছেন না শিপন। বর্তমানে তারা যে ভবনে থাকেন, সেই বাড়ির ভাড়ার অর্থ দিয়ে কোনোভাবে সংসার চালানো হচ্ছিল। তবে সম্প্রতি বাড়ির ভাড়াটিয়াদের ভাড়া বন্ধ করে দেওয়ার জন্য নোটিশ পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। রিমা খাতুন বলেন, “যদি ভাড়ার টাকা বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে আমার সন্তানদের নিয়ে হয়তো না খেয়ে থাকতে হবে। মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকুও হারানোর শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আমাদের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার চক্রান্ত চলছে। এমন পরিস্থিতিতে আমরা কোথায় যাব জানি না।” তিনি অভিযোগ করেন, কুষ্টিয়া শহর ও গ্রামের বাড়িতে বিপুল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও শিপন নিজের সন্তানদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চাইছেন। এ
কজন বাবা হয়ে সন্তানদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়া মানবিক নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে রিমা খাতুন প্রশাসন, মানবাধিকার সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে চার দফা দাবি জানান। দাবিগুলো হলো—নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ভয়ভীতি ও উচ্ছেদের চেষ্টার বিষয়ে তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, দুই সন্তানের ন্যায্য ভরণপোষণ ও সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করা এবং দ্বিতীয় বিয়ের সময় তথ্য গোপন, নির্যাতন ও দায়িত্বহীন আচরণের বিষয়ে যথাযথ তদন্ত করা। এ সময় আবেগঘন বক্তব্য দেন রিমা-শিপন দম্পতির মেয়ে রুকাইয়া খাতুন।
তিনি বলেন, পিতা জীবিত থাকার পরও গত দেড় বছর ধরে আমরা পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত। বাবা এই শহরেই আছেন, কিন্তু আমাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখেন না। আমাদের খাওয়ার খরচও বন্ধ করে দিয়েছেন। খুব কষ্ট করে দিন পার করছি। সংবাদ সম্মেলনের শেষ দিকে অনেকটা নিশ্চুপ ও মন খারাপ করে বসে থাকা ছেলে ইবনে আব্দুল্লাহ বাবাকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়ে বলেন, আমরা আমাদের বাবাকে ফিরে পেতে চাই। আপনারা তাকে এনে দেন।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য