খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ই জুন ২০২৬, ২:৩৯ এএম

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া শহরের লাহিনী বটতলা থেকে সান্দিয়ারা পর্যন্ত সড়কের ধার দিয়ে সবুজে ঘেরা পাকা সড়ক। একপাশে বয়ে চলেছে জিকে সেচ খাল। অন্যপাশে সারি সারি সবজির ক্ষেত। সকাল হতেই রাস্তার ধারে বসে পড়েন কৃষকরা। সামনে সাজানো লাউ, কুমড়া, ঝিঙে, বেগুন, মরিচ, কলা, কাঁঠালসহ নানা ধরনের তাজা শাক-সবজি ও ফলমূল। মাঠ থেকে তুলে আনা এসব পণ্য বিক্রি হচ্ছে সরাসরি কৃষকের হাত থেকে ক্রেতার হাতে। কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কাঞ্চনপুর এলাকার এই ব্যতিক্রমী বাজার স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ‘টাটকা সবজির হাট’ নামে। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এখানে ভিড় করেন স্থানীয় বাসিন্দা, পথচারী এবং দূর-দূরান্ত থেকে আসা ক্রেতারা। কারণ একটাই, একেবারে টাটকা ও বিষমুক্ত কৃষিপণ্য তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায় এই বাজারে।
গতকাল সোমবার (২২ জুন) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জিকে সেচ খালের পাশের পাকা সড়কের দুই ধারে কৃষকরা নিজেদের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে বসেছেন। কেউ বিক্রি করছেন মরিচ, কেউ চালকুমড়া, কেউবা ঝিঙে বা মিষ্টি কুমড়া। ক্রেতারা পছন্দমতো সবজি কিনছেন, আবার অনেকেই কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে পণ্যের গুণগত মান সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছেন। স্থানীয় কৃষক কামরুজ্জামান পলাশ রানা জানান, “গত দুই মাস ধরে এখানে চালকুমড়া, মিষ্টিকুমড়া, ঝিঙে, বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি বিক্রি করছি। বাজারে নিয়ে গেলে অনেক সময় ন্যায্য দাম পাওয়া যায় না। এখানে ক্রেতারা সরাসরি আমাদের কাছ থেকে কিনছেন। টাটকা পণ্য হওয়ায় ভালো দামও পাওয়া যায়।” তিনি বলেন, আমার দুই বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করেছি। সাথী ফসল হিসেবে সেই জমিতে মিষ্টি কুমড়া, চালকুমড়া, ঝিঙে আবাদ করেছি।
পেয়াজ উত্তোলনের পর এসব সবজি মাঠ থেকে তুলে এ সড়কেই বিক্রি করি। এতে করে বেশ ভালোই লাভ হয়। আমরাও খুশী আবার ক্রেতারাও খুশি। কৃষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “কাঁঠাল, কলা, মিষ্টি কুমড়াসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য নিয়ে আসি। আমাদের জমির কাছেই এই রাস্তা। তাই পরিবহন খরচ ছাড়াই সরাসরি বিক্রি করতে পারি। এতে লাভও বেশি থাকে।” একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানালেন কৃষক নজির উদ্দিন। তিনি বলেন, “মাঠ থেকে তুলে এনে এখানেই বিক্রি করি। এতে সময়ও বাঁচে, আবার মধ্যস্বত্বভোগীর ঝামেলাও থাকে না। ক্রেতারাও টাটকা পণ্য পেয়ে খুশি।” ক্রেতাদের মধ্যেও রয়েছে সন্তুষ্টি।
মাহিরুল ইসলাম নামে এক ক্রেতা বলেন, “এখানে যে সবজি পাওয়া যায়, তা একেবারে ক্ষেত থেকে তোলা। বাজারের তুলনায় অনেক বেশি টাটকা এবং দামও তুলনামূলক কম।” আমি চাকরি করি। অফিস শেষ করে বাসায় ফিরছি। এখানে টাটকা সবজি দেখে মুগ্ধ হয়ে কিনে নিলাম। বাসায় টাটকা সবজি দেখে বউও খুশি হবে। আরেক ক্রেতা খাইরুল হাসান বলেন, “গ্রামের কৃষকরা নিজেরাই বাজার বসিয়েছেন। তাই আমরা নিশ্চিত থাকি যে পণ্যগুলো তাজা। সুযোগ পেলেই এখান থেকে সবজি কিনি।” মনিরুল ইসলাম নামের এক কৃষি উদ্যোক্তা বলেন, এই কাঞ্চনপুর মাঠের টাটকা শাকসবজি সড়কের ধারেই কৃষকরা বিক্রি করে। টানা কয়েকদিনের বৃষ্টিতে এই মাঠে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে বেশ ক্ষতি সাধন হয়েছে। এটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কিংবা সংশ্লিষ্টরা একটু উদ্যোগ নিলেই এই জলাবদ্ধতা নিরসনে উদ্যোগ নিতে পারে।
তাহলে কৃষকদের অনেকটাই কষ্ট লাঘব হবে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, করোনা মহামারির সময় যখন বাজারব্যবস্থা কিছুটা স্থবির হয়ে পড়েছিল, তখন স্থানীয় সমাজসেবী মুন্সী মহুরির উদ্যোগে এই বাজারের যাত্রা শুরু হয়। উদ্দেশ্য ছিল কৃষকদের উৎপাদিত ফসল সরাসরি বিক্রির সুযোগ তৈরি করা এবং সাধারণ মানুষের কাছে টাটকা কৃষিপণ্য পৌঁছে দেওয়া। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ছোট উদ্যোগ আজ একটি জনপ্রিয় কৃষক বাজারে পরিণত হয়েছে। চাপড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এনামুল হক মনজু বলেন, “এ ধরনের বাজার কৃষক ও ক্রেতা উভয়ের জন্যই লাভজনক। কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন, অন্যদিকে ক্রেতারা কম দামে টাটকা পণ্য কিনতে পারছেন। এটি স্থানীয় অর্থনীতির জন্যও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।”
তিনি আরও বলেন, “যদি এই বাজারকে আরও পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করা যায়, তাহলে এটি কুমারখালীর কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির একটি সফল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।” জিকে সেচ খালের পাড়ে গড়ে ওঠা এই টাটকা সবজির হাট শুধু একটি বাজার নয়, এটি কৃষকের পরিশ্রম, উদ্যোক্তার দূরদর্শিতা এবং স্থানীয় অর্থনীতির এক সফল উদাহরণ। যেখানে মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই কৃষক ও ক্রেতার সরাসরি সংযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে কৃষক পাচ্ছেন ন্যায্য মূল্য, আর ক্রেতা পাচ্ছেন নিরাপদ ও টাটকা খাদ্যপণ্য। সবুজ প্রকৃতির মাঝে গড়ে ওঠা মুন্সীর বাজার আজ প্রমাণ করেছে, সঠিক উদ্যোগ ও স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ থাকলে গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করে তোলা সম্ভব।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য