দৌলতপুর প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ‘পীর’ শামীম জাহাঙ্গীর ওরফে আব্দুর রহমান কে হত্যার ঘটনায় জামায়াত নেতাকে প্রধান আসামি করে মামলা করার প্রতিবাদে দৌলতপুরে জামায়াতের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে দৌলতপুর উপজেলা মডেল মসজিদ ও ইসলামী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিলটি শুরু হয়ে দৌলতপুর থানার সামনে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
বিক্ষোভ সমাবেশে দৌলতপুর উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা মো. বেলাল উদ্দিন বলেন, ঘটনাটির সুষ্ঠ তদন্তের দাবিতে শুরু থেকেই তারা প্রশাসনের কাছে ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের আহ্বান জানিয়ে আসছেন। তিনি বলেন, পরিকল্পিতভাবে জামায়াত নেতা খাজা আহম্মেদকে মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে। এলাকায় খাজা আহম্মেদের জনপ্রিয়তা ও সম্ভাব্য ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচনে অংশগ্রহণে তার আকাশ চুম্বি সমর্থনে ঈর্ষান্বিত হয়ে প্রতিপক্ষ একটি মহল তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে।
একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করে বলেন, একটি স্বার্থান্বেষী চক্র রাতের আঁধারে সাধারণ মানুষের বাড়িতে গিয়ে মামলা ভয় দেখিয়ে অবৈধভাবে অর্থ আদায় করছে। এদিকে, মামলার বিষয়টি সামনে আসার পর জামায়াতের পক্ষ থেকে এর আগে একটি লিখিত বিবৃতি প্রদান করা হয় এবং পরবর্তীতে এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে একটি সংবাদ সম্মেলনও অনুষ্ঠিত হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
কুষ্টিয়া জেলা জামায়াতের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক এনামুল হক বলেন, দরবারে হামলা ও হত্যার ঘটনাকে তারা কোনোভাবেই সমর্থন করেন না। তিনি জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দ্রুত বিচারের দাবি করে বলেন, ঘটনারি কয়েকদিন পর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিরোধী মত দমনের লক্ষ্যে জামায়াত নেতাকে প্রধান আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে, যদিও ঘটনার সময় তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। তিনি অবিলম্বে মামলাটি প্রত্যাহার এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
এদিকে আলোচিত এ ঘটনায় পাঁচ দিনেও কোনো আসামি গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। মামলায় ‘হুকুমের আসামি’ করা জামায়াত নেতা খাজা আহমেদকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সরব দেখা গেছে। গত মঙ্গলবার রাতেও নিজের ফেসবুক আইডিতে ১২ মিনিটের একটি ভিডিও প্রকাশ করে হত্যার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন। আজ (গতকাল) অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ সমাবেশের ব্যানারের ছবিও পোস্ট করেছেন তিনি। এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এজাহারের দ্বিতীয় আসামি খেলাফত মজলিসের দৌলতপুর উপজেলা সভাপতি আসাদুজ্জামানকে গতকাল দুপুর ১২টার দিকে হোসেনাবাদ বাজারে একাধিক ব্যক্তি মোটরসাইকেলে যেতে দেখেছেন। ঘটনার দিন থেকে মামলার ৩ নম্বর আসামি জামায়াতের কর্মী রাজীব মিস্ত্রি পলাতক।
জানতে চাইলে দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান বলেন, এ ঘটনায় ৬দিন পার হলেও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। অভিযান চালিয়েও আসামিদের পাওয়া যাচ্ছে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তাঁদের সরব উপস্থিতি আছে। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে ওসি আরিফুর রহমান বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা নেই। তিনি আরও বলেন, জামায়াতে ইসলামীর নেতা কর্মীরা বিকেলে শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করেছেন।
উল্লেখ্য, হত্যাকাণ্ডের তিনদিন পর সোমবার রাত ১১টায় নিহত পীরের বড় ভাই ফজলুর রহমান সান্টু বাদী হয়ে দৌলতপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন (মামলা নং-৩৬)। মামলায় কুষ্টিয়া জেলা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি ও দৌলতপুর উপজেলা জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য খাজা আহম্মেদ (৩৬) কে হুকুমের প্রধান আসামি করা হয়। এছাড়া মামলায় আরও তিনজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হলেন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের দৌলতপুর উপজেলা শাখার সভাপতি আসাদুজ্জামান আসাদ (৪৮), জামায়াত সমর্থক রাজিব মিস্ত্রি (৩২) এবং একটি স্থানীয় মাদ্রাসার শিক্ষক সিহাব (সাফি) (৪৫)। সিহাব (সাফি) বিএনপি সমর্থক বলে বলে জানা গেছে।
এছাড়াও মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ১৮০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে পীর শামীম হত্যার বলে জানিয়েছেন দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আরিফুর রহমান। এরআগে পবিত্র কোরআন অবমাননার অভিযোগ এনে শনিবার (১১ এপ্রিল) দুপুর আড়াইটার দিকে দৌলতপুর উপজেলার দক্ষিণ-পশ্চিম ফিলিপনগর গ্রামে বিভিন্ন বয়সী শতাধিক উচ্ছৃশঙ্খল জনতা পীর শামীম জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে তার আস্তানা বা দরবারে হামলা চালায়।
এসময় রাজিবসহ হামলাকারী যুবকরা পীর শামীমকে তার কক্ষ থেকে টেনে হেঁচড়ে বের করে তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ও লাঠি দিয়ে পিটিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে দোতলা থেকে তাকে নীচে ছুড়ে ফেলে। এরপর হামলাকারীরা সংগবদ্ধভাবে আস্তানায় আগুন জ্বালিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাটের তান্ডলীলা চালায়। নির্মম এ ঘটনায় দেশ বিদেশে চাঞ্চল্য ও আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
