বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, বৈষম্য নিরসন এবং প্রান্তিক মানুষের অধিকার আদায়ের তাত্ত্বিক রূপকারদের মধ্যে ড. আবুল বারকাত অন্যতম। প্রথাগত পুঁজিবাদের বাইরে গিয়ে মানবকল্যাণমুখী অর্থনীতির যে রূপরেখা তিনি প্রণয়ন করেছেন, তা তাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। কুষ্টিয়ার এই কৃতি সন্তান একাধারে একজন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ, গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য অধ্যাপক এবং মুক্তচিন্তার এক অগ্রগামী বুদ্ধিজীবী।
তার গবেষণার মূল ভিত্তি হলো রাজনৈতিক অর্থনীতি (Political Economy)। সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর বঞ্চনার কারণ উদ্ঘাটন এবং বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে তার গবেষণা ও নীতিনির্ধারণী প্রস্তাবনাগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতির ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
Table of Contents
Toggleজন্ম, শেকড় ও শিক্ষাজীবন
১৯৫৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলায় আবুল বারকাত জন্মগ্রহণ করেন। কুষ্টিয়ার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ও প্রতিবাদী পরিবেশ তার শৈশব ও মনন গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। সমাজের সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম খুব কাছ থেকে দেখার কারণে অল্প বয়সেই তার মধ্যে সমাজতান্ত্রিক ও সাম্যবাদী চিন্তাধারার বীজ রোপিত হয়।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা নিজ এলাকায় সম্পন্ন করার পর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে পাড়ি জমান। মস্কোর স্বনামধন্য ‘ইনস্টিটিউট অব ন্যাশনাল ইকোনমি’ (বর্তমান প্লেখানভ রাশিয়ান ইউনিভার্সিটি অফ ইকোনমিকস) থেকে তিনি উন্নয়ন অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। সোভিয়েত ইউনিয়নে অধ্যয়নের সময়কাল তার অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে একটি মজবুত তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রদান করে, যা তার পরবর্তী জীবনের গবেষণায় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব
উচ্চশিক্ষা শেষে দেশে ফিরে ড. আবুল বারকাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। দীর্ঘ বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে তিনি এই বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। শ্রেণিকক্ষে কেবল তাত্ত্বিক অর্থনীতির পাঠদানের মধ্যেই তিনি সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং শিক্ষার্থীদের দেশের বাস্তব আর্থসামাজিক সমস্যা নিয়ে গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করেছেন।
অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিয়েছেন:
- বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি (BEA): তিনি একাধিকবার এই শীর্ষ পেশাজীবী সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তার নেতৃত্বে সংগঠনটি দেশের সাধারণ মানুষের উপযোগী বিকল্প বাজেট প্রণয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
- জনতা ব্যাংক লিমিটেড: রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি ব্যাংকিং খাতে বেশ কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, যার মধ্যে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি অন্যতম।
গবেষণার মূল ক্ষেত্র ও সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি চিন্তা
ড. আবুল বারকাতের গবেষণার পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক ও বহুমাত্রিক। তবে তার কাজের সবচেয়ে শক্তিশালী দিকটি হলো প্রান্তিক মানুষের বঞ্চনার পেছনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলো সাহসিকতার সঙ্গে তুলে ধরা।
অর্পিত সম্পত্তি ও ভূমি অধিকার নিয়ে কাজ
বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভূমি থেকে উচ্ছেদের অন্যতম হাতিয়ার ছিল ‘অর্পিত সম্পত্তি আইন’। ড. বারকাত অত্যন্ত নিবিড় ও মাঠপর্যায়ের গবেষণার মাধ্যমে এই আইনের ধ্বংসাত্মক প্রভাব জাতির সামনে তুলে ধরেন। তার গবেষণালব্ধ তথ্য ও পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে রাষ্ট্র এই বৈষম্যমূলক আইন সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এটি তার গবেষণার অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রায়োগিক সাফল্য।
মৌলবাদের রাজনৈতিক অর্থনীতি
তার সবচেয়ে আলোচিত ও যুগান্তকারী গবেষণার ক্ষেত্র হলো ‘মৌলবাদের অর্থনীতি’। তিনি পরিসংখ্যানগত তথ্য-উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, ধর্মীয় চরমপন্থা কেবল একটি আদর্শিক সংকট নয়; এর পেছনে রয়েছে এক বিশাল অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য। মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো কীভাবে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ব্যাংকিং ও পরিবহন খাতে বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরে একটি সমান্তরাল অর্থনীতি গড়ে তুলেছে, তা তার গবেষণায় অত্যন্ত সুচারুভাবে উঠে এসেছে।
দারিদ্র্য বিমোচন ও বিকল্প বাজেট প্রণয়ন
প্রচলিত মুক্তবাজার অর্থনীতি কীভাবে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বাড়ায়, সে বিষয়ে তিনি বরাবরই সোচ্চার। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি হিসেবে তিনি প্রতি বছর যে ‘বিকল্প বাজেট’ প্রস্তাব করেন, সেখানে শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কালোটাকা উদ্ধার, সম্পদ কর আরোপ এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দের রূপরেখা থাকে।
বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণে আবুল বারকাতের প্রভাব
একজন বুদ্ধিজীবী হিসেবে আবুল বারকাতের সবচেয়ে বড় সফলতা হলো অ্যাকাডেমিক গবেষণাকে সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষায় রূপান্তর করা। তার লিখিত গ্রন্থ ও প্রবন্ধগুলো দেশের নীতিনির্ধারক, গবেষক এবং রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য এক আকরিক উপাদান হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি অর্থনীতি এবং নারী উন্নয়ন সংক্রান্ত তার প্রস্তাবনাগুলো বিভিন্ন সময় জাতীয় পরিকল্পনায় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়েছে।
কুষ্টিয়ার এক সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে মেধা, প্রজ্ঞা ও নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি দেশের অর্থনীতি ও সমাজতত্ত্বে যে অবদান রেখেছেন, তা সমাজ গবেষণার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
ড. আবুল বারকাত কে?
তিনি বাংলাদেশের একজন প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক, গবেষক এবং বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি।
কুষ্টিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ক কী?
তিনি ১৯৫৪ সালে কুষ্টিয়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা তার অর্থনৈতিক চিন্তাধারাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
তার গবেষণার সবচেয়ে আলোচিত বিষয় কোনটি?
তার গবেষণার সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো ‘মৌলবাদের রাজনৈতিক অর্থনীতি’ এবং ‘অর্পিত সম্পত্তি আইন’। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে ধর্মীয় চরমপন্থার পেছনে বিশাল অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য কাজ করে এবং কীভাবে প্রান্তিক মানুষ ভূমির অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।
বিকল্প বাজেট কী এবং এর সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা কতটুকু?
বিকল্প বাজেট হলো প্রচলিত রাষ্ট্রীয় বাজেটের বাইরে একটি জনকল্যাণমুখী অর্থনৈতিক রূপরেখা, যা মূলত বৈষম্য নিরসন ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে প্রণয়ন করা হয়। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি হিসেবে ড. বারকাত এই বিকল্প বাজেট প্রণয়নের মূল রূপকার।
উচ্চশিক্ষায় তিনি কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি লাভ করেন?
তিনি তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমান রাশিয়া) মস্কোস্থ প্লেখানভ রাশিয়ান ইউনিভার্সিটি অফ ইকোনমিকস থেকে উন্নয়ন অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
এক নজরে
- জন্ম ও শেকড়: ১৯৫৪ সালে কুষ্টিয়া জেলায় জন্ম নেওয়া এই অর্থনীতিবিদ তার শেকড়ের সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম দ্বারা গভীরভাবে অনুপ্রাণিত।
- শিক্ষাগত পটভূমি: সোভিয়েত ইউনিয়নে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের ফলে তার মধ্যে মানবকল্যাণমুখী ও বৈষম্যহীন অর্থনীতির একটি শক্তিশালী তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি হয়।
- প্রাতিষ্ঠানিক অবদান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি এবং জনতা ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
- ঐতিহাসিক গবেষণা: ‘অর্পিত সম্পত্তি আইনের প্রভাব’ এবং ‘মৌলবাদের অর্থনীতি’ নিয়ে তার বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা দেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ডিসকোর্সে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে।
- জনকল্যাণমুখী দর্শন: পুঁজিবাদের অন্ধ অনুকরণের বদলে তিনি বরাবরই বিকল্প বাজেট, সম্পদ কর বৃদ্ধি এবং দরিদ্রবান্ধব নীতির পক্ষে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে আসছেন।






