১৫ আগস্ট সংঘর্ষ-২৫ আগস্ট মীমাংসার ছবি-২৬ আগস্ট ভাঙচুর
নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ কুষ্টিয়ায় গণঅধিকার পরিষদ ও জামায়াত-সমর্থিত সংসদ সদস্য আমির হামজার অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনার ৮ দিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে দুই পক্ষের ‘মীমাংসা’ হয়ে যাওয়ার ছবি ও পোস্ট। আর সেই ছবি ও পোস্ট ভাইরাল হওয়ার ঠিক পরদিনই গণঅধিকার পরিষদ কুষ্টিয়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল খালেকের মালিকানাধীন এম আর টি ব্রিকস নামের একটি ইটভাটায় পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান ঘিরে কুষ্টিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা।
২৫ আগস্ট কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বোয়ালদহ ও হাটশ হরিপুর এলাকায় অবস্থিত এম আর টি ব্রিকসে অভিযান চালিয়ে স্কেভেটর দিয়ে ইটভাটাটির কিলন ও চিমনী সম্পূর্ণ ভেঙে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বন্ধ করে দেওয়া হয় ভাটার কার্যক্রম। পরিবেশ অধিদপ্তরের দাবি, অবৈধভাবে স্থাপিত ইটভাটার বিরুদ্ধে নিয়মিত আইনানুগ কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই এ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
তবে অভিযানের সময়কাল নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, ১৫ আগস্টের সংঘর্ষের পর দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা, ২৪ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘মীমাংসা’র ছবি প্রকাশ এবং তার পরদিনই সংঘর্ষে আলোচিত এক পক্ষের নেতার ইটভাটায় অভিযান ঘটনার এই ধারাবাহিকতা কুষ্টিয়ার রাজনৈতিক মহলে নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতোমধ্যে কেউ কেউ এটিকে নিছক প্রশাসনিক অভিযান হিসেবে দেখলেও অন্যরা রাজনৈতিক প্রভাব বা প্রতিশোধের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। যদিও এ ধরনের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার পক্ষে এখন পর্যন্ত প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।
গত ১৫ আগস্ট সন্ধ্যার দিকে কুষ্টিয়া শহরের ছয়রাস্তা মোড় এলাকায় গণঅধিকার পরিষদ এবং জামায়াতে ইসলামী-সমর্থিত সংসদ সদস্য আমির হামজার অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের সময় কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজার গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। তিনি মাথায় আঘাত পেয়েছেন বলেও তার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। এ ঘটনায় উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হন।
গণঅধিকার পরিষদের পক্ষ থেকে বলা হয়, দলটির সভাপতি নুরুল হক নুর ও সাবেক নেতা রাশেদ খানকে নিয়ে আমির হামজার কথিত বক্তব্যের প্রতিবাদে ছয়রাস্তা মোড়ে কর্মসূচি পালন করছিলেন তাদের নেতাকর্মীরা। ওই সময় আমির হামজার গাড়ি ওই এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় উত্তেজনা তৈরি হয় এবং একপর্যায়ে সংঘর্ষ বেধে যায়।
অন্যদিকে আমির হামজার পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, গণঅধিকার পরিষদের জেলা সাধারণ সম্পাদক আব্দুল খালেক ও সাংগঠনিক সম্পাদক তৌকির আহমেদের নেতৃত্বে একদল নেতাকর্মী লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল নিয়ে তার গাড়িতে হামলা চালায়। এতে তিনি ও তার কয়েকজন অনুসারী আহত হন বলে দাবি করা হয়।
তবে গণঅধিকার পরিষদের পক্ষ থেকে পাল্টা অভিযোগ করে বলা হয়, তাদের কর্মসূচিতে হামলার পাশাপাশি সংঘর্ষের পর দলীয় কার্যালয় ও নেতাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও হামলা-ভাঙচুর চালানো হয়েছে।
দলটির নেতাকর্মীদের অভিযোগ, সংঘর্ষের পর সন্ধ্যার দিকে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে তাদের জেলা কার্যালয়ে হামলা চালানো হয়। কার্যালয়ের কম্পিউটার, এসি, চেয়ার-টেবিল, থাই গ্লাস, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ভাঙচুর করা হয়। এমনকি বাথরুমের ফিটিংসও ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।
গণঅধিকার পরিষদের জেলা সাধারণ সম্পাদক আব্দুল খালেকের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। তার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, নগদ টাকা লুট, এসি চুরি ও ভাঙচুর, কম্পিউটার ও সিসি ক্যামেরা নষ্ট এবং ডিভিআর মেশিন চুরির ঘটনা ঘটেছে। এতে ৪০ লাখ টাকার বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।
সংঘর্ষের ঘটনায় পরে কুষ্টিয়া মডেল থানায় পৃথক দুটি মামলা হয়েছে বলে জানা গেছে। মামলায় উভয় পক্ষের নেতাকর্মীদের আসামি করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাগুলো তদন্তাধীন রয়েছে।
১৫ আগস্টের সংঘর্ষের পর দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা চলার মধ্যেই ২৪ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হঠাৎ কিছু ছবি ও পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে। এসব ছবিতে সংসদ সদস্য আমির হামজা, তার সহযোগী-সমর্থক এবং গণঅধিকার পরিষদের জেলা সাধারণ সম্পাদক আব্দুল খালেক ও সাংগঠনিক সম্পাদক তৌকির আহমেদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিকে একসঙ্গে দেখা যাচ্ছে বলে পোস্টদাতারা দাবি করেন।
ছবিগুলো প্রকাশ করে একাধিক পোস্টে দাবি করা হয়, ১৫ আগস্টের সংঘর্ষের ঘটনায় দুই পক্ষের মধ্যে মীমাংসা হয়েছে এবং বিরোধের অবসান ঘটেছে।
একটি পোস্টে বলা হয়, রাজনীতিতে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, আলোচনা-সমালোচনা, মিটিং-মিছিল থাকবে; তবে শেষ পর্যন্ত সবাই এক টেবিলে বসে আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করবে—এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।
ফলে ২৪ আগস্টের এসব ছবি ও পোস্টকে অনেকেই ১৫ আগস্টের সংঘর্ষের পর দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার দৃশ্য হিসেবে দেখেন।
২৪ আগস্টের ‘মীমাংসা’র ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরদিন, ২৫ আগস্ট কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বোয়ালদহ ও হাটশ হরিপুর এলাকায় অবস্থিত এম আর টি ব্রিকসে অভিযান পরিচালনা করে পরিবেশ অধিদপ্তর, কুষ্টিয়া জেলা কার্যালয়।
পরিবেশ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইটভাটাটি অবৈধভাবে স্থাপিত হওয়ায় আইনানুগ ব্যবস্থা হিসেবে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে স্কেভেটর দিয়ে ভাটার কিলন ও চিমনী সম্পূর্ণ ভেঙে দেওয়া হয় এবং ইটভাটার কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়।
অভিযানে বিচারিক দায়িত্ব পালন করেন কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিদ মোস্তফা হাসান। প্রধান প্রসিকিউটর হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ অধিদপ্তর কুষ্টিয়ার উপপরিচালক মো. এমদাদুল হক। প্রসিকিউটর হিসেবে ছিলেন সিনিয়র কেমিস্ট মো. হাবিবুল বাসারসহ দপ্তরের অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কুষ্টিয়া পুলিশ বিভাগ ও জেলা আনসার ব্যাটালিয়নের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন।
পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে অভিযানটিকে সম্পূর্ণ প্রশাসনিক ও আইনানুগ কার্যক্রম হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে—এম আর টি ব্রিকসের বিরুদ্ধে এই অভিযান বা ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া আগে থেকেই চলছিল কি না এবং থাকলে ঠিক কবে থেকে তা চলছিল।
ইটভাটাটি অবৈধ হলে পরিবেশ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এম আর টি ব্রিকসের বিরুদ্ধে আগে কোনো নোটিশ দেওয়া হয়েছিল কি না, মামলা বা জরিমানা করা হয়েছিল কি না, তদন্ত বা উচ্ছেদ-ধ্বংসের কোনো প্রক্রিয়া আগে থেকেই চলছিল কি না।
অভিযানের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। কোনো কোনো পোস্টে বলা হয়েছে, একদিকে দুই পক্ষের ‘মীমাংসা’র ছবি প্রকাশ করা হলো, অন্যদিকে তার পরদিনই প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইটভাটায় অভিযান চালিয়ে ‘ভাটা উড়িয়ে দেওয়া’ হলো।
কেউ কেউ সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান কি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নাকি এর পেছনে রাজনৈতিক কোনো প্রভাব কাজ করেছে।
আবার কিছু পোস্টে দুই পক্ষের রাজনৈতিক আচরণ নিয়েও সমালোচনা করা হয়েছে। সেখানে অভিযোগ করা হয়েছে, নিজেদের লোকের ক্ষেত্রে এক ধরনের ব্যাখ্যা এবং প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রে অন্য ধরনের অবস্থান নেওয়া হচ্ছে।
তবে এসব পোস্ট ও মন্তব্য মূলত ব্যক্তিগত মতামত, রাজনৈতিক বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দাবি। এগুলো কোনো সরকারি তদন্তের ফলাফল বা প্রমাণিত তথ্য নয়।
অভিযানের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে আলোচিত দাবিগুলোর একটি হলো—ইটভাটায় অভিযানটি নাকি সংসদ সদস্য আমির হামজার নির্দেশে হয়েছে।
তবে এ দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো প্রকাশ্য সরকারি নথি, লিখিত নির্দেশনা কিংবা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকেও অভিযানটি কোনো রাজনৈতিক নির্দেশে পরিচালিত হয়েছে—এমন কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবু ঘটনাগুলোর সময়গত ধারাবাহিকতা কুষ্টিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন তৈরি করেছে। একদিকে ১৫ আগস্টের সংঘর্ষ, এরপর পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও মামলা; দ্বিতীয়দিকে ২৪ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই পক্ষের ‘মীমাংসা’র ছবি; আর তার পরদিনই গণঅধিকার পরিষদের জেলা সাধারণ সম্পাদক আব্দুল খালেকের মালিকানাধীন বলে পরিচিত এম আর টি ব্রিকসে পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান।
এই তিনটি ঘটনা নিছক কাকতালীয় ধারাবাহিকতা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো রাজনৈতিক সমীকরণ রয়েছে—এ প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
এদিকে ইটভাটায় অভিযান নিয়ে বিতর্কের মধ্যেও গণঅধিকার পরিষদ কুষ্টিয়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল খালেকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একই বিষয়ে কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজার বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।








