মাদকসহ ধরা যুবককে ছাড়ার অভিযোগে প্রশ্নের মুখে জগতি ক্যাম্প পুলিশ - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

মাদকসহ ধরা যুবককে ছাড়ার অভিযোগে প্রশ্নের মুখে জগতি ক্যাম্প পুলিশ

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: জুন ৮, ২০২৬

আটকের পর টাকার খেলা!

 

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া শহরের জগতি পুলিশ ক্যাম্পে এক যুবককে মাদকসহ আটকের পর রহস্যজনকভাবে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, আটকের পর ক্যাম্পে অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে পুরো বিষয়টি ‘ম্যানেজ’ করা হয়। ঘটনাকে ঘিরে পুলিশের দায়িত্বশীলতা, আইন প্রয়োগের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন জগতি ক্যাম্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত এসআই সালাউদ্দিন। তবে তিনি এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন।

স্থানীয় একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, গত ৩ জুন রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে কুষ্টিয়া সদর উপজেলা এলাকার জননী ফার্মেসির মালিকের ছেলে আল-আমিনকে আটক করে জগতি ক্যাম্প পুলিশ। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, জগতি কো-অপারেটিভ মোড়ে আটকের সময় আল-আমিনের কাছে নীল টেপে মোড়ানো প্রায় ৩০টি ইয়াবা ট্যাবলেট, দেড় বোতল ফেন্সিডিল এবং মাদক সেবনের কাজে ব্যবহৃত একটি পাইপ পাওয়া যায়। পরে তাকে জগতি পুলিশ ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের আরও দাবি, আটকের কিছু সময় পর রাশেদ ও ওসমান নামে দুই ব্যক্তি ক্যাম্পে এসে দেনদরবার শুরু করেন।

দীর্ঘ আলোচনা শেষে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বিষয়টি ‘মীমাংসা’ করা হয় বলে এলাকায় আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে আল-আমিনকে ছেড়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে, আটক হওয়া আল-আমিনের বক্তব্য ঘটনাটিকে আরও আলোচনায় নিয়ে এসেছে। তিনি দাবি করেন, তার কয়েকজন বন্ধু ঢাকা থেকে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে কুষ্টিয়ায় এসেছিলেন। তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠানস্থলে যাওয়ার পথে জগতি পুলিশ ক্যাম্পের সামনে কো-অপারেটিভ মোড়ে পৌঁছালে এসআই সালাউদ্দিন ও অপর এক পুলিশ সদস্য তাদের তল্লাশি করেন।

আল-আমিনের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় তার কাছে ২৫ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট ও এক বোতল ফেন্সিডিল ছিল, যা তল্লাশির সময় পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। পরে তাকে ক্যাম্পে নেওয়া হয়। একপর্যায়ে তিনি তার চাচা রাশেদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তার দাবি, প্রায় ২০ হাজার টাকা জোগাড় করার পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এছাড়া গত ৫ জুন আরও ৮ হাজার টাকা দেওয়া হয়, যা রাশেদের মাধ্যমে এসআই সালাউদ্দিনের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য আরও চাঞ্চল্যকর।

তাদের দাবি, আটক অবস্থায় আল-আমিন মোবাইল ফোনে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং রাশেদের মোবাইল নম্বরে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা পাঠানো হয়। পরে বিআইডিসি বাজার এলাকার একটি এজেন্ট পয়েন্ট থেকে সেই টাকা উত্তোলন করা হয়। খরচ বাদে প্রায় ১৯ হাজার ৫০০ টাকা সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার কাছে পৌঁছানো হয়েছে বলে এলাকায় আলোচনা রয়েছে। এছাড়া জব্দকৃত মাদকের একটি অংশ মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

প্রত্যক্ষদর্শী ও ঘটনাটির কথিত মধ্যস্থতাকারীদের একজন রাশেদ, ঘটনার সময় তার বিকাশ অ্যাকাউন্টে নগদের মাধ্যমে ২০ হাজার টাকা লেনদেনের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রথমে হেসে বলেন, “তুমি তো সব জানো, তারপর আবার কেন শুনছো?” পরে তিনি বলেন, “তুমি যার কাছ থেকে শুনছো, সে তো তোমাকে পরিষ্কার করেই বলেছে। লেনদেন যেহেতু হয়েছে, টাকা আসতেই পারে।” রাশেদ ঘটনার সময় একজন সহযোগীসহ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার বিষয়টিও স্বীকার করেন। এ বিষয়ে তার ভাষ্য, “পরিচিত কেউ বিপদে পড়লে তার পাশে দাঁড়াতে হয়।”

ঘটনার দুই দিন পর বাকি টাকা লেনদেন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ওই লেনদেন তারা নিজেরাই সেরে নিয়েছে, আমাকে আর ডাকেনি।” অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জগতি ক্যাম্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত এসআই সালাউদ্দিন বলেন, “গত ৩ তারিখে আল-আমিন নামে একজনকে আমরা আটক করেছিলাম। তবে তার কাছ থেকে কোনো মাদক উদ্ধার হয়নি। একটি খালি বোতল ও একটি পাইপ পাওয়া গিয়েছিল। যেহেতু তার কাছ থেকে কোনো অবৈধ মাদক পাওয়া যায়নি, তাই তার আত্মীয়-স্বজন এসে তাকে নিজেদের জিম্মায় নিয়ে যায়।”

তিনি আরও বলেন, “আমার নাম ব্যবহার করে কেউ যদি টাকা লেনদেন করে থাকে, সেটি আমার জানা নেই। আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো টাকা গ্রহণ করিনি।” তবে ঘটনাটিকে ঘিরে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। যদি আল-আমিনের কাছ থেকে কোনো মাদক উদ্ধার না হয়ে থাকে, তাহলে তিনি নিজেই কেন ইয়াবা ও ফেন্সিডিল বহনের কথা স্বীকার করছেন? আবার যদি সত্যিই মাদক পাওয়া গিয়ে থাকে, তবে আইনগত ব্যবস্থা না নিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়ার কারণ কী? আটক ব্যক্তিকে পরিবারের জিম্মায় দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো জিডি, লিখিত নথি বা আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, সেটিও এখন প্রশ্নের মুখে।

স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে জগতি ক্যাম্পকে ঘিরে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও অধিকাংশ ঘটনা তদন্তের আগেই ধামাচাপা পড়ে যায়। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা। তাদের মতে, মোবাইল কল রেকর্ড, মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেনের তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের দায়িত্বকালীন কার্যক্রম তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন জরুরি।

এ বিষয়ে কুষ্টিয়া মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ কবির হোসেন মাতুব্বর বলেন, “উপযুক্ত প্রমাণ থাকলে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া যারা টাকা দিয়েছে তারা অভিযোগ করলে আইন অনুযায়ী তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” এ প্রসঙ্গে বক্তব্য জানতে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন, পিপিএম (বার) এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) ফয়সাল মাহমুদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।