মিজানুর রহমান নয়ন ॥ আজ মহালয়ের মধ্যদিয়ে শুরু হবে দেবী দুর্গার আরোধনা। মন্দির গুলোতে শুরু হবে ঢাকের বাদ্য, শঙ্খ আর উলু ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠবে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর মন্দির গুলোতে। চলছে শেষ মুহূর্তে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রস্তুতি।
তবে কুমারখালী পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের শতবর্ষী খয়েরচারা সার্বজনীন মাতৃমন্দিরের চিত্র যেন একবারেরই ভিন্ন। উৎসব শুরুর আগেই মন্দিরটিতে শুরু হয়েছে বিষাদের সুর। মন্দির কমিটি ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বৃহস্পতিবার দিবাগত গভীর রাতে মন্দিরের গণেশ, লক্ষী, সিংহসহ অন্তত চারটি প্রতিমায় ভাঙচুর চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। উৎসবের বদলে এখন যেন সেখানে বিষাদের সুর বাজছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সুত্রে জানা যায়, খয়েরচারা মাতৃমন্দিরে দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রতিমা তৈরির কাজ চলছিল। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ২টার দিকে প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ করেন কারিগর অধীর বিশ্বাস। এ সময় কারিগরের সঙ্গে মন্দিরের সাধারণ কৌশিক বিশ্বাসসহ আরও কয়েকজন ছিলেন। এরপর সকাল ৬টার দিকে মন্দির কমিটির লোকজন দেখতে পান মন্দিরের বাঁশের বেড়া ভাঙা। ভিতরের গণেশ, লক্ষী, সিংহসহ চারটি প্রতিমাতে ভাঙচুরের ক্ষত। নেই সিসিটিভি কিংবা নিরাপত্তার বলয়।
সকাল সাড়ে ১১টার দিকে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, মন্দির চত্বরে পুলিশ, পূজা উদযাপন পরিষদের নেতা, মন্দির কমিটির লোকজনসহ উৎসুক জনতার ভিড়। মন্দিরের বাঁশের বেড়া ভাঙা। মন্দিরের ভিতরে থাকা, গণেশ, লক্ষী, সিংহসহ চারটি প্রতিমায় ভাঙচুরের ক্ষত।
এসময় মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক কৌশিক বিশ্বাস বলেন, রাত দুইটার দিকে কাজ শেষে সকলেই বাড়ি চলে যায়। সকাল ৬টার দিকে এসে দেখি গণেশ, লক্ষী, সিংহসহ চারটি প্রতিমা ভাঙা রয়েছে। তার ভাষ্য, আর্থিক সংকটের কারণে এখনও সিসিটিভি স্থাপন করা হয়নি। পূর্বশত্রুতার জেরে কে কা কাহারা হামলা চালিয়েছে। আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আইনজীবি শংকর মজুমদার বলেন, সমাজের মধ্যে এক ধরণের অসুর রয়েছে। তারা উৎসবকে বিঘ্ন করতে এবং পরিবেশ নষ্ট করতে এমন ভাঙচুর চালিয়েছে। প্রশাসক দোষীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করুক।
সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য একধরনের কুচক্রী মহল রাতের অন্ধকারে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটিয়েছে বলে দাবি করেন উপজেলা বিএনপির সাধানণ সম্পাদক মো. লুৎফর রহমান। তিনি বলেন, শারদীয় দুর্গোৎসব নির্বিঘ্ন করতে বিএনপির নেতাকর্মীরা এবং প্রশাসন সর্বদা সতর্ক আছে।
জানা গেছে প্রায় ১৯২২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মন্দিরটির জমি এবং কমিটি নিয়ে দীর্ঘদিন বিরোধ চলে আসছিল। তারই মধ্যে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে। তবে ঘটনার সুষ্ঠ তদন্ত ও দোষীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে শুক্রবার বিকেলে মন্দিরটি পরিদর্শন করেছেন কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মো. আমিনুল ইসলাম।
মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক কৌশিক বিশ্বাস জানান, রাত দুইটা পর্যন্ত তাঁরা মন্দিরে ছিলেন। প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ হওয়ার পর সেগুলো ঢেকে রেখে সবাই বাড়ি ফিরে যান। সকালে ভাঙচুরের বিষয়টি জানতে পেরে ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রতিমাগুলো ভাঙা দেখতে পান। তাঁর ধারণা, রাত দুইটার পর এ ঘটনা ঘটেছে।
দুর্গাপূজা সামনে রেখে এমন ঘটনায় আতঙ্কিত জানিয়ে কৌশিক বিশ্বাস বলেন, কে বা কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, সে বিষয়ে তাঁরা নিশ্চিত নন। ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল উদ্দিন বলেন, মন্দির কমিটি নিয়ে সেখানে দুটি পক্ষ আছে। তাদের মধ্যে বিরোধ আছে। বিরোধ মেটাতে উভয় পক্ষ বৈঠকও করেছে। আজ আবার বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। এ ছাড়া জায়গাজমি নিয়ে স্থানীয়ভাবে বিরোধ রয়েছে। সব দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত চলছে।
মন্দিরে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো ছিল জানিয়ে ওসি জামাল উদ্দিন আরও বলেন, তবে বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়ার আশঙ্কায় মন্দিরের লোকজন গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে ক্যামেরাগুলো খুলে রেখেছিলেন। এ কারণে কোনো ফুটেজ পাওয়া যাচ্ছে না।
কুমারখালী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাভিদ সারওয়ার বলেন, এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভাঙা অংশ দ্রুত মেরামত করা হচ্ছে। সেখানে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
কুমারখালী থানার ওসি জামাল উদ্দিন বলেন, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। মন্দির কমিটি ও জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কেউ লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি। তবুও তদন্ত করছে পুলিশ। দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সন্ধায় পরিদর্শনে আসেন কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন হাসান। তিনি মন্দিরটিতে উৎসব বজায় রাখার পাশাপাশি ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন। তিনি বলেছেন, মন্দিরটিতে সিসিটিভি স্থাপনের পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সকলের সহযোগীয় সকল ধর্মের সম্প্রতির বাংলাদেশ গড়তে চাই।
উৎসব শুরুর আগেই কেন এমন মন্দিরের প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা। কারা রয়েছেন এঘটনার পিছনে। এসব খতিয়ে দেখে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সম্প্রতি বজায় রাখার দাবি স্থানীয়দের।









