কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

কুষ্টিয়ায় কুমারখালী আবাসন প্রকল্পের চরম বেহাল দশা: ভূমিহীনদের ‘স্বপ্নের ঠিকানা’ এখন ‘দুর্দশার আস্তানা’

মোঃ মোমিন ইসলাম ॥ মাথার ওপর একটি নিজস্ব ছাদ—ভূমিহীন ও গৃহহীন অসহায় মানুষদের কাছে এটি এক পরম আরাধ্য স্বপ্ন। কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার হাবাসপুর আবাসন প্রকল্পটি ঠিক এমনই এক স্বপ্ন নিয়ে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু অযত্ন, অবহেলা আর দীর্ঘদিনের রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভূমিহীনদের সেই স্বপ্নের ঠিকানা আজ পরিণত হয়েছে এক অবর্ণনীয় দুর্দশার আস্তানায়। মরিচা ধরা টিনের চাল, ফুটো হওয়া দেয়াল, আর চারপাশের ভগ্নদশার মাঝে জীবনের ন্যূনতম মৌলিক চাহিদাটুকুও আজ সেখানে অমিল। বাধ্য হয়ে ১২০টি পরিবারের মধ্যে ৮০টি পরিবারই এই নরকযন্ত্রণা ছেড়ে চলে গেছে। আর নিরুপায় হয়ে যে ৪০টি পরিবার পড়ে আছে, তারা প্রতিদিন মানবেতর এক জীবনযুদ্ধ পার করছে।

 

যেভাবে গড়ে উঠেছিল স্বপ্নের ঠিকানা:

সরেজমিনে গিয়ে ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আজ থেকে প্রায় ২০ বছর আগে ভূমিহীন ও দুস্থদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে কুমারখালী উপজেলার নন্দলালপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের হাবাসপুর গ্রামে গড়াই নদীর তীর ঘেঁষে এই আবাসন প্রকল্পটি নির্মাণ করা হয়। সেনাবাহিনীর নিবিড় তত্ত্বাবধানে সরকারি খাস জমির ওপর নির্মিত এই প্রকল্পে মোট ১২টি ব্যারাক তৈরি করে দেয় সরকার। প্রতিটি ব্যারাকে ১০টি করে কক্ষ, অর্থাৎ ১২০টি পরিবারের মাথা গোঁজার জন্য ১২০টি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। টিনের দেয়াল ও টিনের ছাউনি দিয়ে তৈরি সেই ঘরগুলো একসময় ভূমিহীনদের মুখে হাসি ফুটিয়েছিল। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সংস্কারের অভাবে সেই হাসি আজ কান্নায় রূপ নিয়েছে।

 

অগ্নিকাণ্ড, জরাজীর্ণতা ও গোয়ালঘরে রূপ নেওয়া আবাসন:

বর্তমানে আবাসন প্রকল্পের ১২০টি ঘরের মধ্যে প্রায় ৭০টি ঘরই পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। প্রকল্পের ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে আগাছায় ছেয়ে যাওয়া প্রবেশপথ আর জরাজীর্ণ অবকাঠামো। পরিত্যক্ত ঘরগুলোর ভেতরে এখন মানুষ নয়, গরু-ছাগল পালন করা হচ্ছে!

বাসিন্দারা জানান, প্রায় ১৮ বছর আগে বিদ্যুতের মিটার বিস্ফোরণে একটি ব্যারাকের ১০টি ঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এরপর একই কারণে সাত বছর আগে আরও ১০টি এবং দুই বছর আগে আরও ১০টি ঘর পুড়ে যায়। কিন্তু বছরের পর বছর পার হলেও পুড়ে যাওয়া এই ৩০টি ঘর আর সংস্কার করা হয়নি। যে ঘরগুলো টিকে আছে, সেগুলোর টিনে মরিচা ধরে বড় বড় ছিদ্র হয়ে গেছে।

 

বিশুদ্ধ জল ও স্যানিটেশনের তীব্র সংকট:

বাসিন্দাদের বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও শৌচাগারের তীব্র অভাব। ১২০টি পরিবারের জন্য ১২টি টিউবওয়েল স্থাপন করা হলেও এর মধ্যে ১০টিই অনেক আগে সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে গেছে। বাকি যে দুটি টিউবওয়েল রয়েছে, সেগুলোতেও ঠিকমতো পানি ওঠে না। বাধ্য হয়ে এখানকার মানুষদের অনেক দূর থেকে কষ্ট করে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয়। শৌচাগার বা বাথরুমগুলোর অবস্থা আরও ভয়াবহ। সবগুলোই ভেঙে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। নারীদের চরম অস্বস্তির মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে, আর বাধ্য হয়ে গড়াই নদীর চরকে শৌচাগার হিসেবে ব্যবহার করছেন এখানকার বাসিন্দারা, যা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।

 

বৃষ্টি এলে আমরা পাখির মতো ঘরের কোণে জড়োসড়ো হয়ে থাকি’

হাবাসপুর আবাসনের সভাপতি আজাদ শেখ দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে এখানে বসবাস করছেন। ক্ষোভ ও আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, “আবাসনের ঘর, টিউবওয়েল, বাথরুম, যাতায়াতের রাস্তা—সবকিছুরই খুবই দুরবস্থা। ঘরগুলো অনেক আগেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। টিন পচে ভেঙে গেছে। বৃষ্টি হলে ঘরের মধ্যে পানি পড়ে। এই চরম কষ্টের কারণে ১২০ পরিবারের মধ্যে ৮০ পরিবারই এখান থেকে বাধ্য হয়ে চলে গেছে। তারা এখন কুষ্টিয়া শহরে ভাড়া বাসায় থেকে ভ্যান-রিকশা চালায় বা দিনমজুরি করে। আমরা যে ৪০ পরিবার পড়ে আছি, আমাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই।”

আবাসন চালু হওয়ার মাত্র এক সপ্তাহ পর থেকে এখানে বসবাস করছেন সত্তোরোর্ধ বৃদ্ধা রিজিয়া খাতুন। বার্ধক্যের ভারে ন্যুব্জ এই বৃদ্ধা অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, “জায়গা-জমি নেই বলেই আমরা গরিব মানুষ এখানে পড়ে আছি। ঘরগুলোর অবস্থা এত খারাপ যে, সেই কষ্টের কথা মুখে বলা যায় না। একটু বৃষ্টি এলেই চালের ফুটো দিয়ে পানি পড়ে সবকিছু ভিজে যায়। তখন জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে আমরা পাখির মতো ঘরের একটা কোণে জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকি। সরকার যদি দয়া করে ঘরগুলো মেরামত করে দিত, বাথরুম আর টিউবওয়েল দিত, তাহলে জীবনের শেষ কয়টা দিন একটু শান্তিতে কাটাতে পারতাম।”

আবাসনের অন্য বাসিন্দা জবেদা খাতুন, রুবেলা, আশরাফুল ইসলাম, আনোয়ারা খাতুন, বেবী রানী ও মর্জিনা খাতুনদের কণ্ঠেও একই হাহাকার। তারা জানান, বৃষ্টির দিনে ঘরের ভেতরে বিছানাপত্র সব ভিজে একাকার হয়ে যায়। বিশুদ্ধ পানি ও বাথরুমের অভাবে তাদের প্রতিদিনের জীবন এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। তারা দ্রুত এই আবাসন সংস্কার করে টিকে থাকার আকুতি জানিয়েছেন সরকারের কাছে।

 

প্রশাসনের বক্তব্য:

আবাসন প্রকল্পের এই ভয়াবহ বেহাল দশা সম্পর্কে জানতে নন্দলালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান খোকন এবং ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নয়ন আলীর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি।

তবে এ বিষয়ে কুমারখালী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) সাইদুর রহমান বলেন, “আবাসন প্রকল্পের বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ঘরগুলো সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দের আবেদন করা হয়েছে। বরাদ্দ হাতে পেলেই দ্রুত তাদের সমস্যাগুলো সমাধান করা হবে।”

সার্বিক বিষয়ে কথা বলার জন্য কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম মিকাইল ইসলামের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি বর্তমানে একটি মিটিংয়ে আছি, তাই এই মুহূর্তে কথা বলা সম্ভব হচ্ছে না। পরে এ বিষয়ে কথা বলব।”

স্বাধীন দেশের একজন নাগরিক হিসেবে মাথা গোঁজার একটি নিরাপদ ঠাঁই এবং ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা পাওয়া এই ভূমিহীন মানুষগুলোর অধিকার। আবাসন প্রকল্পের এই জরাজীর্ণ অবকাঠামো সংস্কার করে দ্রুত এই হতদরিদ্র পরিবারগুলোর মানবেতর জীবনের অবসান ঘটাতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল।

Tags :

Desk Reporter

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর