কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

অগ্নিকান্ডে পরিবারের ৪ সদস্য সহ সাংবাদিক দেবাশীষ নিহত

নিজ সংবাদ ॥ কলকাতার নিউমার্কেটের কাছে মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে মধ্যরাতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজকের পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক দেবাশীষ দত্ত (৩৮), তার স্ত্রী আফসানা সিমমিন (২৫), সন্তান স্বর্ণ শীষ দত্ত (৩) এবং শ্বশুর আকরাম আলী (৬৪) নিহত হয়েছেন।

কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও স্থানীয় দৈনিক আজকের আলো পত্রিকার সম্পাদক গাজী মাহবুব রহমান চারজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, দেবাশীষ দত্ত আজকের আলো পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

এছাড়াও দেবাশীষ দত্ত চ্যানেল নাইন ও দৈনিক আজকের পত্রিকার কুষ্টিয়া প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সাংবাদিক দেবাশীষ দেবাশীষ দত্ত কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়ার রাজারহাট এলাকার দিলীপ দত্তের ছেলে এবং তার শ্বশুর আকরাম আলীর বাড়ি থানাপাড়া এলাকায়।

পারিবারিক সূত্র জানায়, অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য গত ৩ আগস্ট দেবাশীষ দত্ত ভারতের ব্যাঙ্গালোরে গিয়েছিলেন এবং গতকাল বুধবার (১৯ আগস্ট) তাদের দেশে ফেরার কথা ছিলো। দেবাশীষের আট বছর বয়সী অপর একটি কন্যা সন্তান এবং বাবা-মা রয়েছেন। দিলীপ দত্ত জানান, দেবাশীষের এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ে মহিমা দত্তকে (৭) রেখে ৩ আগস্ট তিনি স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে ভারতে যান। দুই দিন পর তাঁর শ্বশুরও কলকাতায় যান।

প্রথমে তাঁরা কলকাতায় দুই দিন ছিলেন। এরপর স্ত্রী ও ছেলের চিকিৎসার জন্য বেঙ্গালুরুতে যান। গত সোমবার রাত এগারোটায় উড়োজাহাজে করে কলকাতায় আসেন তাঁরা। সেখানে হোটেলে উঠেছিলেন। গতকাল বুধবার সকালে দিলীপ দত্ত যোগাযোগমাধ্যমে তিনি ছেলের (দেবাশীষ) লাশের ছবি দেখে জানতে পারেন যে অগ্নিকাণ্ডে তাঁরা সবাই মারা গেছেন।

আমার ছওয়ালের নিয়ে নিল রে, এ কী করে সহ্য করবো আমি, আমি সহ্য করতে পারবো না, আমার দেবাশীষ নাই। এভাবেই আহাজারি করছিলেন কলকাতায় আগুনের ঘটনায় নিহত দেবাশীষ দত্তের মা। কোন কিছু বোঝার আগেই বাবা-মা ও সাড়ে তিন বছরের ছোট ভাইকে হারিয়ে অনেকটা একা হয়ে গেছে ছয় বছরের মহিমা। দেবাশীষের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর গতকাল সকাল থেকে তাঁর বাড়িতে বন্ধু, সাংবাদিক ও প্রতিবেশীরা ভিড় করেন।

ছেলেকে হারিয়ে মা স্বপ্না দত্ত পাগলপ্রায়। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলতে থাকেন, ‘আমার দেবা (দেবাশীষ) একটু পরই বাড়িতে আসবে। এত দেরি করছে কেন? রাতে বলেছিল, ব্যাগ গোছাচ্ছে। সকালেই রওনা দেবে বাড়ির উদ্দেশে। সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের মর্মান্তিক মৃত্যুতে আজকের পত্রিকা পরিবার গভীরভাবে শোক জানিয়েছে এবং বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেছে। পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কামরুল হাসান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ‘এই অকালমৃত্যু আমাদের গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। পরিবারটির এমন অপূরণীয় ক্ষতির মুহূর্তে আজকের পত্রিকা তাদের পাশে রয়েছে। আমরা প্রয়াত দেবাশীষ দত্ত ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি এবং শোক সন্তপ্ত স্বজনেরা যেন এই কঠিন সময়ে ধৈর্যধারণ ও শোক সামলানোর শক্তি পান, সে জন্য প্রার্থনা করছি।

গতকাল বুধবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানান, কলকাতায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৫ বাংলাদেশি নাগরিককে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একই পরিবারের সদস্য চারজন। তিনি বলেন, নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। এজন্য সরকার সব ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। শামা ওবায়েদ ইসলাম জানান, কলকাতায় নিযুক্ত বাংলাদেশের ডেপুটি হাই কমিশনার স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।

তিনি এরই মধ্যে দুর্ঘটনাস্থল এবং হাসপাতালে গিয়ে পরিস্থিতির খোঁজখবর নিয়েছেন। আইনি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ামাত্রই মরদেহগুলো দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে। এদিকে, মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার খরচ সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সাধারণত এমন ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে খরচ বহন করা হয়। তবে কোনো পরিবার যদি এই ব্যয়ভার বহন করতে অক্ষম হয়, তবে সরকার মানবিক বিবেচনায় তা দেখবে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে।

অগ্নিকান্ডের ঘটনায় পশ্চিবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু বুধবার দুপুরে সমাজমাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রী লেখেন, “বছরের পর বছর ধরে কোনও নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই কলকাতা তথা রাজ্যে পরিকাঠামো গড়ে উঠেছে। অগ্নিসুরক্ষা সংক্রান্ত নিয়মবিধি উপেক্ষা করেই বিভিন্ন ভবন গড়ে তোলা হয়েছে। সেগুলিকে হোটেল এবং অন্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।” শুভেন্দুর বক্তব্য, পূর্বতন সরকারের অবহেলার ফলেই নিউ মার্কেটের হোটেলে এই অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। তাঁর অভিযোগ, আগের সরকার ইচ্ছাকৃত ভাবে এই বিষয়গুলি থেকে নজর ঘুরিয়ে রেখেছিল।

শুভেন্দু সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, তাঁর সরকার বর্তমানে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা চালাচ্ছে। দুর্ঘটনার কারণ খোঁজার চেষ্টা করছে। তবে ‘বাস্তব পরিস্থিতি’ থেকে নজর ঘুরিয়ে রাখা যায় না। তৃণমূল জমানায় যে ‘ক্ষত’ তৈরি হয়েছে, তাঁর সরকার এখন তা মেরামতের চেষ্টা চালাচ্ছে বলে লিখেছেন মুখ্যমন্ত্রী। অগ্নিকাণ্ডে দমবন্ধ হয়ে ৯ জনের মৃত্যুর ঘটনায় গতকাল বুধবার সকালেই দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছান পশ্চিমবঙ্গের দমকল প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী এবং পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা।

দু’জনেই অভিযোগ তোলেন পূর্বতন সরকারের আমলের অব্যবস্থার দিকে। মন্ত্রী জানান, ভবনটির প্রতিটি তলে চার-পাঁচটা করে হোটেল রয়েছে। হোটেলের ঘরগুলিতে কোনও জানলাও ছিল না। মন্ত্রীর কথায়, শুধুমাত্র একটি ঘরেই জানলা ছিল। সেখান থেকে দমকলকর্মীরা মইয়ে করে দু’জনকে উদ্ধার করেন। তাঁর আক্ষেপ, সঠিক ব্যবস্থা থাকলে বাকিদেরও বাঁচানো সম্ভব হত।

এ প্রসঙ্গে কৌশিক বলেন, পূর্বতন সরকারের আমলের কলকাতা পুরসভার অভিশাপ আমাদের বহন করতে হচ্ছে। তারা কী করে এখানে ট্রেড লাইসেন্স, হোটেল করার অনুমতি দিয়েছে, তা নিয়ে তদন্ত হবে। প্রত্যেকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হবে।

কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন হাসানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কলকাতার অগ্নিকাণ্ডে ৯ জন নিহত হওয়ার কথা তিনি শুনেছেন। এর মধ্যে কুষ্টিয়ার কেউ রয়েছেন, তা তার জানা ছিল না। তবে নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা যেতে পারে। মরদেহ দেশে এলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

একটি পরিবারের চার সদস্যের একসঙ্গে চলে যাওয়া যেন মুহূর্তেই নিঃস্ব করে দিয়েছে আড়ুয়াপাড়ার এই পরিবারকে। আর সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তের মৃত্যুতে কুষ্টিয়ার সাংবাদিক অঙ্গন হারাল একজন সহকর্মী, বন্ধু ও নিষ্ঠাবান সংবাদকর্মীকে।

Tags :

কুষ্টিয়া জেলা নিউজ ডেক্স, কুষ্টিয়া জিলাইভ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর