বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাবর আলী গেট-চামড়াপট্টি এলাকায় সরকারি খোলা বাজারে বিক্রয় (ওএমএস) কর্মসূচির চাল ও আটা নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি এবং প্রকৃত নিম্নআয়ের মানুষের পরিবর্তে দালালচক্রের মাধ্যমে পণ্য তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় স্থানীয় ভোক্তাদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ওই ওয়ার্ডের ওএমএস ডিলার ওয়াকার পারভেজ জীবন অধিক লাভের আশায় সরকারি বরাদ্দের চাল ও আটা কালোবাজারে বিক্রি করছেন।
তিনি কুষ্টিয়া পৌর যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক বলেও জানা গেছে। গতকাল বুধবার (১৯ আগস্ট) শহরের চামড়াপট্টি ওএমএস বিক্রয়কেন্দ্র থেকে ১৫০ কেজি আটা ও ৫০ কেজি চাল নিয়ে যাওয়ার সময় অরুণ কুমার রায় নামে এক ব্যক্তিকে নারকেলতলা এলাকায় স্থানীয় জনতা আটক করেন। পরে আটক ব্যক্তিকে পণ্যসহ কোর্ট স্টেশন এলাকার কাছে নিয়ে আসা হয়। সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনে অরুণ ও ভ্যানচালক মহসিন তাদের বক্তব্য দেন। আটক অরুণ কুমার রায়ের দাবি, তিনি ওএমএসের পণ্য কেজিপ্রতি নির্ধারিত দামের চেয়ে ৬ টাকা বেশি দিয়ে ডিলার ওয়াকার পারভেজ জীবনের কাছ থেকে কিনেছেন।
এর আগেও তিনি জীবনের কাছ থেকে পণ্য কিনে কেজিপ্রতি ২ থেকে ৪ টাকা লাভে স্থানীয় মানুষের কাছে বিক্রি করেছেন বলে জানান। অরুণ কুমার রায় বলেন, তিনি সিরাজগঞ্জ জেলার রায়গঞ্জ উপজেলার চান্দাইকোনা এলাকার বাসিন্দা। ছেলের চাকরির সুবাদে দীর্ঘদিন ধরে কুষ্টিয়ায় বসবাস করছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ওএমএসের চাল ও আটা সংগ্রহ করে শহরের বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁ ও খুচরা বাজারে বিক্রি করে আসছেন।
এদিকে স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, উঠতি বয়সী পথশিশু ও নিম্নআয়ের শিশুদের দিয়ে ওএমএসের লাইনে দাঁড় করিয়ে পণ্য সংগ্রহ করান অরুণ। পরে তাদের হাতে ২০ থেকে ৫০ টাকা দিয়ে পণ্য নিয়ে নেওয়া হয়। ফলে প্রকৃত নিম্নআয়ের মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও অনেক সময় সরকারি ওএমএসের পণ্য পান না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী ভোক্তা বলেন, আমরা ওএমএসের মাল নিতে গেলে অনেক সময় পাই না।
লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর বলা হয়, মাল সব শেষ হয়ে গেছে। তাহলে আমরা সাধারণ মানুষ কীভাবে সরকারি বরাদ্দের চাল-আটা পাব? আরেক ভোক্তা অভিযোগ করে বলেন, টোকাই ছেলে দিয়ে লাইনে দাঁড় করিয়ে ওএমএসের মাল তুলে নেওয়া হয়। পরে তাদের হাতে ২০ থেকে ৫০ টাকা দিয়ে মাল নিয়ে নেওয়া হয়। এতে প্রকৃত নিম্নআয়ের মানুষ বঞ্চিত হচ্ছেন। ওএমএসের পণ্য পরিবহনের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে ভ্যানচালক মহসিন বলেন, ওই ব্যক্তি যখন আমাকে রাজারহাট থেকে নিয়ে আসেন, তখন তিনি চামড়াপট্টি যাওয়ার কথা বলেন। সে সময় তাঁর হাতে ১০ কেজি চাল ছিল।
পরে চামড়াপট্টিতে গিয়ে তিনি আমাকে বলেন, তিন বস্তা আটা ও এক বস্তা চাল নিয়ে যেতে হবে। আমি রাজি হই। মহসিন আরও বলেন, এরপর তারা ডিলারের ঘরে ঢুকে তিন বস্তা আটা খুলে অন্য বস্তায় ভরে দেন। এ সময় আমাকে বলা হয়, ডিলারের বস্তা নেওয়া যাবে না। পরে আমি চাল নিয়ে নারকেলতলা চলে আসি। স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু অরুণ কুমার রায় নয়, আরও একটি মধ্যস্বত্বভোগী চক্র ওএমএসের পণ্য সংগ্রহের সঙ্গে জড়িত।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু ডিলার প্রকৃত উপকারভোগীদের পরিবর্তে এসব ব্যক্তির কাছে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে চাল ও আটা বিক্রি করেন। পরে তা খুচরা বাজার, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন স্থানে বেশি দামে বিক্রি করা হয়। এতে একদিকে সরকারি ভর্তুকির সুবিধা প্রকৃত নিম্নআয়ের মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না, অন্যদিকে সরকারি খাদ্য সহায়তার পণ্য নিয়ে একটি অসাধু চক্র লাভবান হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ঘটনাস্থলে উপস্থিত সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, কুষ্টিয়া সদরে প্রতিদিন নয়জন ডিলারের মাধ্যমে খাদ্য বিতরণ করা হয়।
যে ডিলারের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে, তাকে আমরা ফোন করে বিষয়টি জানিয়েছি। তবে অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে আমরা এখনো নিশ্চিত হতে পারিনি। অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হলে সংশ্লিষ্ট ডিলারের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওএমএস ডিলার ওয়াকার পারভেজ জীবন। তিনি বলেন, আসলে এই ঘটনার সঙ্গে আমি সম্পর্কিত নই। ষড়যন্ত্র করে একটি কুচক্রী মহল এগুলো করেছে। ভ্যানচালক ও ক্রেতা কেন তাঁর দোকানের নাম বলছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে জীবন বলেন, এগুলো সব আসলে তাদের সাজিয়ে দেওয়া কথা।
কারা এ ঘটনা সাজিয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি সালাম ও দিবস নামের দুজনের কথা উল্লেখ করেন। তবে তাঁর এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় সরকারি ওএমএস কর্মসূচির পণ্য বিতরণে অনিয়ম হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ভোক্তারা। তাদের মতে, নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বরাদ্দ সরকারি খাদ্যসামগ্রী কোনোভাবেই মধ্যস্বত্বভোগী বা কালোবাজারি চক্রের হাতে চলে যাওয়া উচিত নয়।









