খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ই জানুয়ারি ২০১৫, ১২:৪৪ পিএম

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গঙ্গা অববাহিকায় অবস্থিত কুষ্টিয়া জেলা কেবল নদীমাতৃক ভূপ্রকৃতির জন্যই নয়, বরং এর সমৃদ্ধ ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি এবং প্রশাসনিক বিবর্তনের জন্যও বিশেষভাবে পরিচিত। একটি অঞ্চল কীভাবে তার বর্তমান নামে পরিচিতি লাভ করে, তার পেছনে বহুস্তরীয় ঐতিহাসিক উপাদান, ভাষাগত পরিবর্তন, স্থানীয় উপভাষা এবং অর্থনৈতিক কার্যকলাপের গভীর প্রভাব থাকে। কুষ্টিয়া জেলার নামকরণের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কোনো একটি একক সূত্র বা তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে এই নাম নির্ধারিত হয়নি; বরং বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল, ব্রিটিশ আমলের গেজেটিয়ার, ফারসি শব্দের প্রভাব এবং স্থানীয় কৃষিপণ্যের উৎপাদন এই নামকরণের প্রক্রিয়ায় ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।

ঐতিহাসিক ও গবেষকদের মতে, ‘কুষ্টিয়া’ নামটি মূলত বহুমাত্রিক উৎস থেকে বিবর্তিত হয়েছে। নিচে এই নামকরণের পেছনে প্রচলিত সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য তত্ত্বগুলো বিশ্লেষণ করা হলো:
কুষ্টিয়া অঞ্চলের মাটি ও জলবায়ু প্রাচীনকাল থেকেই পাট চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। স্থানীয় গ্রামীণ জনপদে পাট গাছকে ঐতিহাসিকভাবে ‘কুষ্টা’ বা ‘কোষ্টা’ নামে অভিহিত করা হতো।
ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে মোগল সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলে (১৫৯২–১৬৬৬) এই অঞ্চল গড়াই ও পদ্মা নদীর অববাহিকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর ও পাট বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে।
এই জনপদে প্রচুর পরিমাণে পাট উৎপাদিত এবং প্রক্রিয়াজাত হওয়ায় কালক্রমে এই এলাকা ‘কুষ্টা’ থেকে ‘কুষ্টিয়া’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে বলে অনেক গবেষক মত প্রকাশ করেছেন।
মোগল ও ব্রিটিশ আমলের সংযোগকালে প্রশাসনিক নথিপত্র এবং আঞ্চলিক কথ্য ভাষায় ফারসি ভাষার সুদূরপ্রসারী প্রভাব ছিল।
ফারসি শব্দ ‘কুশতহ’ (Kushtah)-এর অর্থ হলো ছাই দ্বীপ, ভস্মভূমি বা প্লাবনোভূমি।
গঙ্গা ও এর শাখা নদীগুলোর ভাঙাগড়া এবং পলি জমার মধ্য দিয়ে গঠিত এই পলিদ্বীপ সদৃশ ভৌগোলিক অঞ্চলে অতীতে পলি বা ছাই সদৃশ মাটির অবক্ষেপণ অথবা কোনো বিশেষ ঐতিহাসিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে স্থানটিকে ফারসি প্রভাবে ‘কুশতহ’ বলা হতো, যা পরবর্তী সময়ে রূপান্তরিত হয়ে ‘কুষ্টিয়া’ রূপ ধারণ করে।
ব্রিটিশ ভূগোবিদ ও ইতিহাসবিদদের নথিপত্রে এই অঞ্চলের নামকরণের ভিন্ন একটি প্রামাণ্য রূপ দেখতে পাওয়া যায়।
১৮২০ সালে প্রকাশিত ওয়াল্টার হ্যামিলটনের বিখ্যাত গেজেটিয়ার ও ভৌগোলিক বিবরণে এই অঞ্চলকে ‘কুষ্টি’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও নদীতীরবর্তী জনপদবাসী চলতি ভাষায় জায়গাটিকে ‘কুষ্টি’ বলে সম্বোধন করত। ব্রিটিশ প্রশাসনের প্রশাসনিক নথিপত্র তৈরির সময় এই লোকায়ত উচ্চারণটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।
ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে আঞ্চলিক ভাষার ধ্বনি পরিবর্তন নামকরণে একটি বিরাট ভূমিকা রাখে। নদীয়া ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের স্থানীয় কথ্যরীতিতে দীর্ঘ স্বরবর্ণ বা শব্দের বিন্যাসে বিশেষ টান লক্ষ্য করা যায়।
সাধারণ মানুষের মুখে মুখে উচ্চারণ বিবর্তিত হয়ে ‘কুষ্টিয়া’ শব্দটি দীর্ঘদিন ধরে ‘কুষ্টে’ বা ‘কুইষ্টে’ হিসেবে উচ্চারিত হয়ে আসছে।
লোকায়ত এই ধ্বনিগত রূপান্তরটিই কালক্রমে মান্য বাংলার দাপ্তরিক ও সাহিত্যিক পরিসরে ‘কুষ্টিয়া’ হিসেবে স্থায়ী রূপ লাভ করে।
কুষ্টিয়া কেবল একটি প্রাচীন জনপদই নয়, এর প্রশাসনিক কাঠামোরও দীর্ঘ ঐতিহাসিক পথপরিক্রমা রয়েছে।
ঐতিহাসিক নদিয়া জেলার একটি ক্ষুদ্র মহকুমা হিসেবে অবিভক্ত বাংলার প্রেসিডেন্সি বিভাগের অধীনে কুষ্টিয়ার কার্যক্রম পরিচালিত হতো।
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ভারত ভাগের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রেডক্লিফ রোয়েডের সীমানা নির্ধারণের মাধ্যমে কুষ্টিয়া তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়।
দীর্ঘ সময় মহকুমা হিসেবে থাকার পর প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমের পরিধি বৃদ্ধির ফলে কুষ্টিয়া ধাপে ধাপে একটি পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদায় উন্নীত হয়।
ঐতিহাসিক দলিলপত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কুষ্টিয়ার ভৌগোলিক অস্তিত্ব বহু প্রাচীন কাল থেকেই নদীভিত্তিক সভ্যতার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে প্রখ্যাত গ্রিক জ্যোতির্বিদ ও ভূগোলবিদ টলেমির প্রণীত মানচিত্রে গঙ্গা নদীর অববাহিকায় বদ্বীপ অঞ্চলের যে ক্ষুদ্র দ্বীপগুলোর উল্লেখ পাওয়া যায়, অনেক গবেষক সেগুলোকে বর্তমান কুষ্টিয়া ও এর পার্শ্ববর্তী নদীমাতৃক অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
এটি সুনির্দিষ্ট কোনো প্রাচীন নগরকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠেনি, বরং নদীবন্দর, কৃষি এবং নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্যের সুবাদে একটি সংহত জনপদ হিসেবে এর বিকাশ ঘটেছে।
কুষ্টিয়ার নামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য। এই জনপদকে ঘিরে রয়েছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত শিলাইদহ কুঠিবাড়ি, বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইজির মাজার ও আখড়া। নদীমাতৃক এই জনপদের চাপড়া নদীবন্দর এবং কুমারখালীর প্রাচীন মুদ্রণ ইতিহাসের কেন্দ্রগুলো কুষ্টিয়ার ঐতিহ্যকে কেবল স্থানীয় সীমানায় আটকে রাখেনি, বরং জাতীয় সংস্কৃতির মূলধারায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। নামকরণের নানা তত্ত্বের সমান্তরালে এই সাংস্কৃতিক পরিচয়ও কুষ্টিয়া নামের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে দৃঢ় করেছে।
| নামকরণের তত্ত্ব | মূল উৎস / শব্দমূল | ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট | মূল ভিত্তি |
| পাট বা কুষ্টা তত্ত্ব | বাংলা ও স্থানীয় কৃষি শব্দ ‘কুষ্টা’ | মোগল আমল ও নদীবন্দর কেন্দ্রিক বাণিজ্য | প্রচুর পাট উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ |
| ফারসি কুশতহ তত্ত্ব | ফারসি শব্দ ‘কুশতহ’ (ছাই দ্বীপ) | প্রশাসনিক ও নদীমাতৃক ভূপ্রকৃতি | প্লাবনভূমি ও পলি জমার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য |
| হ্যামিলটন গেজেটিয়ার | ১৮২০ সালের ব্রিটিশ গেজেটিয়ার | ঔপনিবেশিক ভৌগোলিক জরিপ | স্থানীয় জনগণের মুখে ব্যবহৃত ‘কুষ্টি’ শব্দ |
| উপভাষা রূপান্তর তত্ত্ব | আঞ্চলিক কথ্যরীতি (‘কুষ্টে’/‘কুইষ্টে’) | লোকায়ত ধ্বনিগত বিবর্তন | গ্রামীণ মানুষের স্বাভাবিক উচ্চারণরীতি |

গবেষকদের মতে, কুষ্টিয়া নামটি স্থানীয় কৃষি শব্দ ‘কুষ্টা’ (পাট) অথবা ফারসি শব্দ ‘কুশতহ’ (ছাই দ্বীপ) কিংবা স্থানীয় উপভাষার লোকায়ত রূপ থেকে উদ্ভূত হয়েছে।
১৮২০ সালের হ্যামিলটনের গেজেটিয়ারে এই অঞ্চলকে ‘কুষ্টি’ নামে উল্লেখ করা হয়েছিল।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পূর্বে কুষ্টিয়া অবিভক্ত বাংলার নদীয়া জেলার একটি মহকুমা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
মোগল সম্রাট শাহজাহানের আমল থেকেই কুষ্টিয়া অঞ্চলে পাট (কুষ্টা) চাষ ও এর নদীবন্দর কেন্দ্রিক ব্যবসার ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়।
খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে টলেমির মানচিত্রে গঙ্গা অববাহিকার যে বদ্বীপ অঞ্চলের উল্লেখ রয়েছে, তাকে কুষ্টিয়ার প্রাচীন ভৌগোলিক কাঠামোর আদি রূপ হিসেবে অনুমান করা হয়।
স্থানীয় জনগণের মুখে ‘কুষ্টিয়া’ শব্দটি পরিবর্তিত হয়ে ‘কুষ্টে’ বা ‘কুইষ্টে’ হিসেবে উচ্চারিত হতো, যা পরবর্তীতে দাপ্তরিকভাবে কুষ্টিয়া নাম ধারণ করে।
মন্তব্য