মিরপুর প্রতিনিধি ॥ বিদেশে গিয়ে ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন ছিল শিক্ষিত তরুণ আলামিনের। জীবনের একটি সময়ে কৃষিকাজ থেকে দূরে সরে বিদেশের মাটিতে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার পরিকল্পনাও করেছিলেন। নানা কারণে সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তবে বিদেশ যাওয়া হয়নি বলে থেমে থাকেননি তিনি। বরং নিজের মাটি, নিজের কৃষি আর নিজের স্বপ্নকে নতুন করে আঁকড়ে ধরেছেন আলামিন।
কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার মালিহাদ ইউনিয়নের বাজিতপুরের শেষ প্রান্তে, আলমডাঙ্গার মাঠে গড়ে উঠেছে তার মাল্টা-কমলার বাগান। সবুজে ঘেরা এই বাগানে এখন প্রায় ১৭০টি মাল্টা ও কমলা গাছ। গাছগুলোকে ঘিরেই নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন এই তরুণ উদ্যোক্তা।
সম্প্রতি আলামিনের বাগান পরিদর্শন করেছেন মিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আফরোজ শাহীন খসরু। এ সময় সঙ্গে ছিলেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মতিয়র রহমান, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, স্থানীয় ইউপি সদস্যসহ সংশ্লিষ্টরা।
বাগান ঘুরে দেখা হয় গাছের পরিচর্যা, ফলন সম্ভাবনা, রোগবালাই, মাটি ও পানি ব্যবস্থাপনাসহ নানা বিষয়। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা আলামিনকে প্রয়োজনীয় পরামর্শও দেন।
আলামিনের কৃষির সঙ্গে সম্পর্ক অবশ্য নতুন নয়। জীবনের শুরুতে কৃষিকাজেই ব্যস্ত ছিলেন তিনি। পরে নিজের ভবিষ্যৎ বদলানোর স্বপ্নে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু নানা প্রতিকূলতায় সেই যাত্রা আর হয়ে ওঠেনি। অনেকের কাছে এটি হয়তো হতাশার কারণ হতে পারত। কিন্তু আলামিন ব্যর্থতাকে নিজের শেষ পরিচয় হতে দেননি। বরং ফিরে এসেছেন সেই কৃষিতেই।
তার বাগানে দাঁড়িয়ে আলামিনের চোখে এখন বিদেশের স্বপ্নের চেয়ে নিজের মাটিতে কিছু করার স্বপ্নটাই বড়। ছোট পরিসরে শুরু করা বাগানটিকে ধীরে ধীরে বড় কৃষি খামারে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন তিনি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মতিয়র রহমান বলেন, আলামিন একজন শিক্ষিত তরুণ। কৃষির প্রতি তার আগ্রহ এবং নতুন কিছু করার চেষ্টা আমাদের আশাবাদী করে। তার বাগানে প্রায় ১৭০টি মাল্টা ও কমলা গাছ রয়েছে। নিয়মিত পরিচর্যা, সঠিক সার ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই দমন এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি অনুসরণ করতে পারলে এখান থেকে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। কৃষি বিভাগ থেকে তাকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হবে।” তিনি আরও বলেন, “শিক্ষিত তরুণরা যদি কৃষিতে এগিয়ে আসে, তাহলে কৃষিতে নতুন পরিবর্তন আসবে। শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা তৈরি করা জরুরি। আলামিনের মতো তরুণদের উদ্যোগ অন্যদেরও কৃষিতে আগ্রহী করবে।
আলামিনের গল্পটি শুধু একটি বাগানের গল্প নয়। এটি একজন তরুণের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। বিদেশে যাওয়ার সুযোগ হয়নি, কিন্তু নিজের দেশে কিছু করার সুযোগকে তিনি হাতছাড়া করেননি।
কৃষিতে উদ্যোক্তা হওয়ার পথ অবশ্য সহজ নয়। কখনো আবহাওয়ার বিরূপতা, কখনো রোগবালাই, কখনো বাজারদরের ওঠানামা, আবার কখনো পুঁজির সংকট উদ্যোক্তাদের সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তারপরও যারা মাটির সঙ্গে থেকে কাজ করে যেতে পারেন, তাদের হাত ধরেই বদলাতে পারে দেশের কৃষির চিত্র। আলামিনও জানেন, সামনে হয়তো আরও অনেক ধাক্কা আসবে। কিন্তু সেই ধাক্কা সামলে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় তার রয়েছে।
তার স্বপ্ন এখন শুধু ১৭০টি গাছের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ধীরে ধীরে বাগানের পরিধি বাড়ানো, নতুন জাতের ফলের গাছ লাগানো এবং একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি খামার গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে তার। একসময় বিদেশের মাটিতে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন আলামিন। আজ সেই স্বপ্নের ঠিকানা নিজের গ্রামের মাঠে। এই মাঠ, এই গাছ আর এই মাটিই এখন তার নতুন সম্ভাবনার ঠিকানা।
বাংলাদেশের কৃষিতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে আলামিনের মতো শিক্ষিত ও স্বপ্নবান তরুণ উদ্যোক্তাদের আরও বেশি প্রয়োজন। তাদের কেউ হয়তো বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখবেন, কেউ চাকরির পেছনে ছুটবেন। কিন্তু কেউ যদি নিজের মাটিতে দাঁড়িয়ে কৃষিকে পেশা ও ব্যবসা হিসেবে বেছে নেন, তাহলে তার হাত ধরেই তৈরি হতে পারে নতুন কর্মসংস্থান, নতুন কৃষি উদ্যোগ এবং নতুন সম্ভাবনা।
হয়তো পথের মাঝে ধাক্কা আসবে। কখনো স্বপ্ন থমকে দাঁড়াবে। কিন্তু থেমে না গিয়ে যারা আবার শুরু করতে জানেন, শেষ পর্যন্ত তারাই নিজেদের গল্পটা নতুন করে লিখতে পারেন। আলামিনের নতুন শুরুটাও তেমনই এক গল্প।









