খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ই জানুয়ারি ২০১৫, ৩:১০ পিএম

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এক গৌরবোজ্জ্বল ও ঐতিহাসিক জনপদ হলো কুষ্টিয়া জেলা। পদ্মা, গড়াই, কালীগঙ্গা এবং মাথাভাঙা নদীর পলিমাধুর্যপূর্ণ অববাহিকায় গড়ে ওঠা এই অঞ্চলটি প্রাচীনকাল থেকেই মানব সভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। কুষ্টিয়া কোনো প্রাগৈতিহাসিক বা প্রাচীন নগরী না হলেও, ব্রিটিশ আমলের ঔপনিবেশিক বাণিজ্য, নদীবন্দর কেন্দ্রিক নগরায়ন, রেল যোগাযোগের সূচনা এবং পরবর্তীতে শিল্প বিপ্লবের কল্যাণে এটি দ্রুত একটি প্রধান অঞ্চলে রূপ নেয়। অবিভক্ত ভারতের নদীয়া জেলার অংশ থেকে শুরু করে বর্তমান স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ পর্যন্ত কুষ্টিয়ার ইতিহাসের রয়েছে এক সুদীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য পটভূমি।

কুষ্টিয়া অঞ্চলের আদি ইতিহাস মূলত নদীবন্দরের বিকাশ এবং নদীকেন্দ্রিক মানববসতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রাচীনকালে এই অঞ্চলটি গঙ্গা ও তার শাখা নদীগুলোর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে বারবার রূপান্তরিত হয়েছে। সেন আমল, পাল আমল এবং পরবর্তীতে সুলতানি ও মুঘল আমলে এই অঞ্চলটি নদীয়া এবং পাবনা অঞ্চলের বৃহত্তর প্রশাসনিক কাঠামোর সাথে যুক্ত ছিল।
কুষ্টিয়া শহরের গোড়াপত্তন বা সুনির্দিষ্ট নগরায়নের প্রাচীন কোনো সুদীর্ঘ ইতিহাস না থাকলেও, মুঘল সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালে এই অঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর স্থাপিত হয়। সম্রাট শাহজাহানের আমলেই গঙ্গার অববাহিকায় নৌপথের নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে এই বন্দরটি গড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থে এই নদীবন্দরটিকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করতে শুরু করে। নদীপথের এই সুগম যোগাযোগের কারণে ব্রিটিশ ও দেশীয় বণিকদের নজর কাড়ে এই জনপদ।
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন আমলে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে কুষ্টিয়া অঞ্চলটি প্রথমে যশোর জেলার অধীনে ন্যস্ত করা হয়। সে সময় বর্তমান কুষ্টিয়া ও এর আশেপাশের এলাকা প্রশাসনিকভাবে যশোর কালেক্টরেটের আওতাধীন ছিল।
হ্যামিলটন’স গেজেট (Hamilton’s Gazetteer)-এ প্রথম কুষ্টিয়া শহরের সুনির্দিষ্ট বিবরণ ও উল্লেখ পাওয়া যায়। গেজেটের বিবরণ অনুযায়ী, তৎকালীন সময়ে কুষ্টিয়া একটি উঠতি নদীভিত্তিক জনপদ হিসেবে পরিচিতি লাভ করছিল। তবে এই অঞ্চলের প্রকৃত নগরায়ন প্রক্রিয়া শুরু হয় ব্রিটিশ নীলকরদের আগমনের মধ্য দিয়ে। উনবিংশ শতাব্দীতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পৃষ্ঠপোষকতায় কুষ্টিয়ার উর্বর মাটিতে নীলচাষ শুরু হয়। কুষ্টিয়া ও এর আশপাশের অঞ্চলে একাধিক নীলকুঠি স্থাপিত হয় এবং নীলকরদের বাণিজ্যিক তৎপরতা ও শোষণের বিরুদ্ধে এ অঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ দানা বাঁধতে শুরু করে। নীলচাষ ও নীলকরদের এই বাণিজ্যিক বসতি স্থাপনই মূলত কুষ্টিয়াকে একটি গ্রাম থেকে মফস্বল শহরে রূপান্তরিত করার প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করেছিল।
কুষ্টিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট বা মোড় পরিবর্তন ঘটে যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নয়নের মাধ্যমে। ১৮৬০ সালে কলকাতার (তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী) সাথে কুষ্টিয়ার সরাসরি রেললাইন স্থাপিত হয়। এই রেল যোগাযোগ চালুর ফলে কুষ্টিয়া রাতারাতি ব্রিটিশ বাংলার অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক ও শিল্প ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়।
রেলপথ চালুর ফলে কাঁচামাল সংগ্রহ এবং উৎপাদিত পণ্য রাজধানী ও সমুদ্রবন্দরে পাঠানো অত্যন্ত সহজ হয়ে যায়। তৎকালীন ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ ও উদ্যোক্তারা এই অঞ্চলটিকে শিল্প-কারখানা স্থাপনের জন্য একটি আদর্শ ও কৌশলগত স্থান হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেন। এর ফলশ্রুতিতে কুষ্টিয়ায় একের পর এক ভারী ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে থাকে, যা সমগ্র পূর্ব বাংলার অর্থনৈতিক দৃশ্যপটকে পাল্টে দেয়।
শিল্পায়ন ও বাণিজ্যের দ্রুত প্রসারের ফলে কুষ্টিয়ায় জনবহুল এলাকা গড়ে ওঠে এবং স্থানীয় প্রশাসনের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। ফলশ্রুতিতে ১৮৬৯ সালে কুষ্টিয়ায় একটি পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়, যা এই অঞ্চলের আধুনিক স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার প্রথম সোপান।
দীর্ঘকাল ধরে কুষ্টিয়া অবিভক্ত ভারতের নদীয়া জেলার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পরিচালিত হতো। তবে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন এবং পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়ায় কুষ্টিয়া অঞ্চলটি কখনো নদীয়া জেলার মহকুমা, আবার কখনো পাবনা জেলার মহকুমা ও থানা হিসেবে রাজশাহী বিভাগের অধীনে অন্তর্ভুক্ত ছিল। বিভিন্ন প্রশাসনিক সীমানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে কুষ্টিয়া তার নিজস্ব ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক স্বকীয়তা অর্জন করতে থাকে।
কুষ্টিয়া জেলা কেবল শিল্প বা বাণিজ্যের জন্যই পরিচিত নয়, বরং শিক্ষা, যোগাযোগ এবং সামাজিক অগ্রগতির ক্ষেত্রেও এই জেলাটি বাংলার ইতিহাসে বেশ কিছু গৌরবময় ‘প্রথম’-এর অধিকারী:
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারতের অবসান ঘটে এবং দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত বিভক্ত হয়। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় কুষ্টিয়া তার পূর্বের নদীয়া জেলার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) অন্তর্ভুক্ত হয় এবং একটি স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
স্বাধীনতার প্রাক্কালে এবং দেশভাগের অব্যবহিত পরে কুষ্টিয়া জেলার প্রশাসনিক পরিধি বেশ বিস্তৃত ছিল। নতুন গঠিত কুষ্টিয়া জেলার অধীনে মূলত তিনটি প্রধান মহকুমা ছিল:
পরবর্তীতে প্রশাসনিক decentralization বা বিকেন্দ্রীকরণের প্রক্রিয়ায় চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর আলাদা স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে উন্নীত হলে কুষ্টিয়া জেলার বর্তমান ভৌগোলিক সীমানা নির্ধারিত হয়।
দেশভাগের পর নবগঠিত কুষ্টিয়া শহরের উন্নয়নে বেশ কিছু যুগান্তকারী প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তৎকালীন এস.ডি.ও (Sub-Divisional Officer) মৌলভি আব্দুল বারী বিশ্বাস-কে প্রধান করে এবং তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ১৯৫৪ সালে ঐতিহাসিক গঙ্গা-কপোতাক্ষ প্রকল্প (G-K Project)-এর প্রধান কার্যালয় বা সদর দপ্তর কুষ্টিয়ায় স্থাপন করা হয়।
জি-কে প্রকল্পের মতো বিশাল সেচ ও উন্নয়ন প্রকল্প কুষ্টিয়ায় স্থাপিত হওয়ার ফলে এই অঞ্চলের কৃষিব্যবস্থায় এক অভূতপূর্ব বিপ্লব ঘটে। এর পাশাপাশি কুষ্টিয়ায় আরও বেশ কিছু সরকারি দপ্তর, প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট এবং প্রশাসনিক ভবন স্থাপিত হওয়ার ফলে শহরটিতে পুনরায় অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের নতুন ধারা সূচিত হয়।
কুষ্টিয়ার ইতিহাস কেবল শিল্প ও সংস্কৃতির ইতিহাস নয়, এটি বাঙালি জাতির মুক্তিসংগ্রাম ও বীরত্বের এক রক্তাক্ত অধ্যায়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ঢাকাসহ সারা দেশে অপারেশন সার্চলাইট শুরু করার পর পরই কুষ্টিয়ার মুক্তিকামী মানুষ সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

প্রশ্ন ১: কুষ্টিয়া শহরটি প্রথম কোন ঐতিহাসিক দলিলে বা গেজেটে উল্লেখ করা হয়?
উত্তর: হ্যামিলটন’স গেজেট (Hamilton’s Gazetteer)-এ সর্বপ্রথম কুষ্টিয়া শহরের সুনির্দিষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়।
প্রশ্ন ২: কুষ্টিয়ার প্রথম রেললাইন কবে এবং কার সাথে স্থাপিত হয়?
উত্তর: ১৮৬০ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতার সাথে কুষ্টিয়ার সরাসরি রেললাইন স্থাপিত হয়।
প্রশ্ন ৩: বাংলাদেশের প্রথম রেলওয়ে স্টেশনটি কোথায় অবস্থিত?
উত্তর: বাংলাদেশের প্রথম রেলওয়ে স্টেশন হলো কুষ্টিয়া সদর উপজেলার জগতি রেলওয়ে স্টেশন।
প্রশ্ন ৪: ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর কুষ্টিয়ার প্রাথমিক মহকুমাগুলো কী কী ছিল?
উত্তর: ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর কুষ্টিয়া জেলার অধীনে কুষ্টিয়া সদর, চুয়াডাঙ্গা এবং মেহেরপুর—এই তিনটি প্রধান মহকুমা ছিল।
প্রশ্ন ৫: কুষ্টিয়ায় গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জি-কে) প্রকল্পের সদর দপ্তর কবে স্থাপিত হয়?
উত্তর: এস.ডি.ও মৌলভি আব্দুল বারী বিশ্বাসের নেতৃত্বে ১৯৫৪ সালে কুষ্টিয়ায় গঙ্গা-কপোতাক্ষ প্রকল্পের সদর দপ্তর স্থাপিত হয়।
মন্তব্য