কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে মাদক প্রবেশের পথ বন্ধ করতে হবে: বক্তরা 

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ায় বিভিন্ন বালুমহালকে কেন্দ্র করে আধিপত্য বিস্তার, অস্ত্রের মহড়া ও গোলাগুলির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটি। একই সঙ্গে জেলার ভেতরে মাদকবিরোধী অভিযান জোরদারের পাশাপাশি সীমান্ত দিয়ে মাদকের প্রবেশ বন্ধে বিজিবি, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। গতকাল রবিবার (১২ জুলাই) সকাল ১০টায় কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভা অনুষ্ঠিত হয়

সভায় সভাপতিত্ব করেন স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক (উপসচিব) আহমেদ মাহবুব-উল-ইসলাম। সভার শুরুতে জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তুলে ধরেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি জেলার সাম্প্রতিক অপরাধ পরিস্থিতি, প্রশাসনের গৃহীত পদক্ষেপ এবং বিভিন্ন উপজেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত উপস্থাপন করেন। সভায় বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতারা জেলার বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মতামত তুলে ধরেন। আলোচনায় বিশেষভাবে উঠে আসে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার নান্দিয়ার বিল ইজারা দেওয়ার পর সৃষ্ট পরিস্থিতি।

বক্তারা জানান, গত ৫ জুলাই নান্দিয়ার বিল ইজারা দেওয়ার পর থেকে ইজারা বৈধতা নিয়ে নানা গুঞ্জন শুরু হয়েছে। অপরদিকে বালুমহাল দখলকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা বেড়েছে। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অস্ত্রের মহড়া ও গোলাগুলির মতো ঘটনা ঘটছে, যা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। বক্তারা বলেন, বালুমহালকেন্দ্রিক সংঘাত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাই অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দমন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তারা। সভায় মাদক সমস্যা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

বক্তারা বলেন, শুধু জেলার অভ্যন্তরে অভিযান চালিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে মাদক প্রবেশের পথ বন্ধ করতে হবে। এজন্য সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধি, গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার এবং বিজিবি, পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত অভিযান পরিচালনার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। সভায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) শিকদার মো. হাসান ইমাম আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের চলমান কার্যক্রম তুলে ধরেন।

এছাড়া বক্তব্য রাখেন, কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) আব্দুল হাই সিদ্দিকী, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. কুতুব উদ্দিন আহমেদ, সদস্য সচিব ইঞ্জিনিয়ার জাকির হোসেন সরকার, পিপি অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আসলাম হোসেন, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক নুরে সফুরা খাতুন, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) আবু তৈয়ব মো. ইউনুছ আলী, জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আব্দুল লতিফ সেখ, কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু মনি জুবায়েদ রিপন, বিজিবির সিও রাশেদ কামাল রনি এবং কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতারসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা।

সভায় অংশগ্রহণকারীরা জেলার সার্বিক শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সাধারণ জনগণের সমন্বিত ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি অপরাধ দমন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, বালুমহালকেন্দ্রিক সহিংসতা প্রতিরোধ এবং সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশ বন্ধে আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।

সভায় জেলা বিএনপির আহবায়ক কুতুব উদ্দিন আহমেদ বলেন, মানুষ এখন সচেতন, কিভাবে চলতে হয় সেটা তারা জানে। তবে জেলায় সংঘটিত অপরাধ সমূহ নিরসনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর অবস্থানে যেতে হবে। তিনি আরো বলেন, স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে আমাদের সচেতন থাকা উচিৎ। যে বাচ্চাটা পৃথিবীর আলোর মুখ চোখে দেখলো সে যাতে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়। মাতৃত্বকালীন সময়ে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে যেনো তারা সাপোর্ট পায় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। তিনি বলেন, অনেক সময় আমরা সম্পদের হিসাবও করি। আমাদের যাই আছে সেটা নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা দরকার। বর্তমান গনতান্ত্রিক সরকার সেই ধারার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে প্রশাসনকে বিগত সরকারের ধ্যান ধারনা থেকে বেরিয়ে আসার আহব্বান জানান তিনি।

এছাড়া জেলা বিএনপির সদস্য সচিব প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার বলেন, একটি মহল জেলা যুবদলের সাবেক প্রধান সমন্বয়ক আব্দুল মাজেদকে নিয়ে চক্রান্ত করা হচ্ছে। যা আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনকে প্রশ্ন বিদ্ধ করছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল গনতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। জনগণের ভালো মন্দ নিয়ে আমাদের পথ চলা। তিনি বলেন, কিছুদিন আগে বিল দখল বিষয়ে যে সংবাদ প্রকাশ হয়েছিলো তার কোন সত্যতা নেই। তিনি বলেন একজন সাংবাদিক জাতির বিবেক। সাংবাদিকদের লেখনিতে সমাজের ভালো খারাপ প্রকাশ পাবে। তবে কাউকে হয়রানি করতে সংবাদ প্রচার করা উচিৎ নয়। সঠিক বিষয় তুলে ধরার আহব্বান জানান করেন। তিনি আরো বলেন, বিলের ইজারা সরকারি নিয়ম মেনেই হয়েছে। প্রকৌশলী জাকির সরকার বলেন, আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক মাসিক সভা নিয়মিত অনুষ্ঠিত হলেও এর অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবে কার্যকর হতে দেখা যায় না।

সভায় বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়, সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, কিন্তু পরবর্তী মাসে দেখা যায় সেগুলোর অধিকাংশই বাস্তবায়নের অগ্রগতি নেই। তিনি আরো বলেন, জনগণ আশা করে এই সভার মাধ্যমে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। কিন্তু বাস্তবায়নের অভাবে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না। প্রতিনিয়ত মাসিক মিটিং হচ্ছে এর সুফল জনগণ পাচ্ছে না। এর কার্যকারিতা না হওয়ায় আইনশৃঙ্খলার অবনতি হচ্ছে। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত কর বাস্তবায়ন হয়নি।

এই মাসিক সভাকে শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে এর সিদ্ধান্তসমূহ দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করুন। তবেই এই সভার প্রকৃত উদ্দেশ্য সফল হবে এবং জনগণ এর সুফল পাবে। এসময় অনুষ্ঠানের সভাপতি উপসচিব আহমেদ মাহবুব-উল ইসলাম বলেন, “কুষ্টিয়াকে একটি নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত প্রচেষ্টা জরুরি। এদিকে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ছুড়ে দেওয়া প্রশ্নের জবাবে প্রশাসনের কোন সদত্তর পাওয়া যায়নি।

তবে জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, “জেলায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সর্বদা তৎপর রয়েছে। মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।”সভায় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, কিশোর গ্যাং প্রতিরোধ, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ এবং চুরি-ডাকাতি প্রতিরোধে বিশেষ নজরদারি করা হবে বলে জানান তিনি।

Tags :

কুষ্টিয়া জেলা নিউজ ডেক্স, কুষ্টিয়া জিলাইভ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর