ভেড়ামারা প্রতিনিধি ॥ ৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে বন্দি হয়ে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হলেও স্বাধীনতার দীর্ঘ ৫ দশক পরও মেলেনি ‘যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা’র স্বীকৃতি। সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভাতা পেলেও যুদ্ধকালীন ক্ষত ও নির্যাতনের স্থায়ী পঙ্গুত্ব নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ মওলা বক্স।
গতকাল রবিবার (৪ অক্টোবর) বিকেল ৫ টায় নিজ বাসভবনে আয়োজিত এক আবেগঘন সংবাদ সম্মেলনে যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁর পরিবার এই দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি ভারতের উত্তর প্রদেশের তানডুয়া জেলার দেরাদুন সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে বিএলএফ অধীনে উচ্চতর সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে সরাসরি সম্মুখ সমরে অংশ নেন। ১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার খাড়ারা নামক স্থান থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর দালাল ও রাজাকারদের সহায়তায় তিনি ও তাঁর সহযোদ্ধা শরাফ উদ্দীন পাক-বাহিনীর হাতে বন্দি হন। বন্দি অবস্থায় তাঁর ওপর চালানো হয় মধ্যযুগীয় বর্বরতা। পাকিস্তানি হানাদাররা তাঁকে টানা তিন দিন হাত-পা বেঁধে গাছের সাথে ঝুলিয়ে রেখে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে পিঠে ও মাজায় গুরুতর জখম করে। অমানুষিক এই শারীরিক নির্যাতনের ফলে তিনি দীর্ঘ সময় অজ্ঞান ছিলেন এবং পরবর্তীতে তাঁর মাজা ও পিঠে স্থায়ী বিকলাঙ্গতা তৈরি হয়, যা তাঁকে মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত করে তোলে। পরবর্তীতে ভেড়ামারা ও দৌলতপুর সামরিক ক্যাম্প থেকে অলৌকিকভাবে তিনি মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন।
সংবাদ সম্মেলনে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলা হয়, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ মওলা বক্সের নাম জাতীয় তালিকা (নং-৩৩), মুক্তিবার্তা (নং- ০৪১১০৩০১৩২) এবং গেজেট (নং-৮২০) ভুক্ত থাকলেও তিনি কেবল সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেই তালিকাভুক্ত আছেন। অথচ তাঁর শরীরের প্রতিটি ক্ষতচিহ্ন যুদ্ধাহত হওয়ার সাক্ষ্য দেয়।
ইতিপূর্বে তিনি ২০১৭ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবর এবং ২০২৩ সালে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য যথাযথ প্রমাণাদিসহ আবেদন জমা দেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয় ও সমাজসেবা অধিদপ্তর কর্তৃক তাঁর আবেদনপত্রটি গ্রহণ করা হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আজ অবধি তাঁর এই যৌক্তিক ও ন্যায়সঙ্গত দাবিটি পূরণ হয়নি।
বর্তমানে বার্ধক্যজনিত কারণে অত্যন্ত অসুস্থ থাকায় সংবাদ সম্মেলনে তাঁর পক্ষে কান্নাজড়িত কণ্ঠে পরিবারের সদস্যরা বলেন, “জীবনের শেষ সময়ে এসে রাষ্ট্র যেন তাঁর এই আত্মত্যাগের সঠিক মূল্যায়ন করে এবং তাঁকে ‘যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে যথাযথ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সম্মানী প্রদান করা হয়।” সংবাদ সম্মেলনে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী এবং বীর মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।









