কুমারখালী প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে ‘ খ’ তফশিল ভুক্ত সরকারি জমিতে নির্মিত হচ্ছে এক জামায়াত নেতার বহুতল পাকা বাড়ি। এ নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। ইতিমধ্যে একতলার ছাদ ঢালাইয়ের কাজও সম্পন্ন করে ফেলেছেন। উপজেলার চরসাদিপুর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর মৌজায় প্রায় ৬ কোটি টাকার জমিতে বাড়ি নির্মাণ করছেন চরসাদিপুর ইউনিয়ন জামায়াতের আমির মো. আবু তালেব হোসাইন। তিনি আসন্ন নির্বাচনে চরসাদিপুর ইউনিয়ন পরিষদের সম্ভাব্য চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী ও গোবিন্দপুর গ্রামের মৃত আফিল উদ্দিনের ছেলে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আবু তালেব জামায়াতের প্রভাবশালী নেতা। ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে জাল কাগজপত্রাদি তৈরি করে সরকারি জমিতে পাকা বাড়ি নির্মাণ করছেন। কয়েকমাস ধরে প্রকাশ্যে নির্মিণ কাজ চললেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন। এতে ক্ষুব্ধ তারা।
এলাকাবাসী ও স্থানীয় প্রশাসন সুত্রে জানা গেছে, পদ্মানদীর কুলঘেষে কুমারখালীর চরসাদিপুর ইউনিয়ন। ইউনিয়নের গোবিন্দপুর মৌজায় ১ নম্বর খতিয়ানের আরএস ৬৮ নম্বর দাগে সরকারের ‘ খ’ তফশিল ভুক্ত প্রায় দুই একর ৮২ শতাংশ জমি রয়েছে। যার বাজার মূল্য প্রায় ৬ কোটি টাকা। জাল কাগজপত্রাদি তৈরি করে উক্ত জমি নিজের দাবি করে ২০১৮ সালে কুষ্টিয়ার কুমারখালী সহকারী জজ আদালতে রেকোর্ড সংশোধণী মামলা করেন চরসাদিপুর ইউনিয়ন জামায়াতের আমির মো. আবু তালেব হোসাইন। দেওয়ানী মামলা নম্বর ১৯৮/২০১৮। বৈধ কাগজপত্রাদি না থাকায় ২০২৪ সালের ৫ মে বিনা খরচায় মামলাটি খারিজ করেন বিজ্ঞ সহকারী জজ আদালত। সহকারী জজ মো. মেহেদী হাসান স্বাক্ষরিত এক আদেশ নামা এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। মামলাটি খারিজ হলে জামায়াত নেতা ফের মামলা করেন। আপিল মামলা নম্বর ১১৭/২৪।
আরো জানা গেছে, আদালতে আপিল মামলা চলমান থাকলেও প্রভাব খাটিয়ে চলতি বছরের মে মাসের দিকে তিনতলা ফাউন্ডেশন দিয়ে পাকা বাড়ি নির্মাণ কাজ করেন ওই জামায়াত নেতা। ইতিমধ্যে একতলা পর্যন্ত ছাদ ঢালাইয়ের কাজ সম্পন্ন করে ফেলেছেন তিনি।
শনিবার ( ৩ অক্টোবর) বিকেলে সরেজমিন দেখা গেছে, চরসাদিপুর খেয়াঘাট – পাবনার কোমড়পুর সড়কের গোবিন্দপুর এলাকায় বেশখানেক নিচু জমি। সেখানে বালু ভরাটের পর নির্মিত হচ্ছে পাকা বাড়ি। একতলার ছাদ ঢালাইয়ের কাজ শেষ। পড়ে আছে নির্মাণ সামগ্রী।
এদিকে, জামায়াত নেতা প্রভাবশালী হওয়ায় ভয়ে প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি স্থানীয় বাসিন্দারা। এমনকি চেয়ারম্যান – মেম্বররাও।
তবে ওই নেতার প্রতিবেশী হাফিজুল ইসলাম বলেন, ‘ একবার মামলায় রায় পাওয়া হয়ছিল। আবারও শুনতিছি খাস হয়ছে। সেই খাস হিসেবে মৃত আফিল উদ্দিনের অংশীদাররা বাড়ি করছে। বৈধ – অবৈধ ভালো জানিনা।’ তার ভাষ্য, সাদিপুরের প্রায় সব জমিই খাস।
শহিদুল ইসলাম নামের আরেকজন বলেন, ‘ বাড়িটা অল্পদিন হলো হচ্ছে। এখানকার জামায়াত নেতা আবু তালেব চাচা করছে। বিস্তারিত ভালো জানিনা।’
নাম প্রকাশ না করা শর্তে এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‘ পাবনা শহরের খুব কাছাকাছি হওয়ার প্রায় এক কোটি টাকা বিঘা জমির মূল্য এখানে। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে আবু তালেব ভূয়া কাগজপত্রাদি তৈরি করে আদালতে মামলা করেছিল ২০১৮ সালে। কিন্তু বৈধ কাগজ না থাকায় ২৪ সালে মামলাটি খারিজ হয়। পরে তিনি (তালেব) আপিল করে অবৈধভাবে পাকা বাড়ি করতছে। সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তিনি।’
এ বিষয়ে প্রথমে ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি অভিযুক্ত জামায়াত নেতা আবু তালেব হোসাইন। পরে তিনি বলেন, ‘ আরএস রেকোর্ড ভুল আছে। ২০১৮ সালের মামলা ২৪ সালে খারিজ হলে ফের আপিল করেছি। আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। রায়ের আগে কিছু বলা যাচ্ছেনা। ‘ তারও ভাষ্য, সাদিপুরের প্রায় সব জমিই খাস।
বিচারাধীন জমিতে নির্মাণ কাজ করা যায় কি না? এমন প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি তিনি।
জানা গেছে, চরসাদিপুর ইউনিয়নে কোনো ভূমি কার্যালয় নেই। পদ্মার এপারে (দক্ষিণপাশ) শিলাইদহ ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ে চলে সাদিপুরের কাজ।
জানতে চাইলে শিলাইদহ ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান বলেন, সম্প্রতি সরেজমিন পরিদর্শন করে নির্মাণ কাজ বন্ধ করা হয়েছে। ৬৮ নম্বর দাগ সরকারি হলেও ৬৯ দাগ মালিকানাধীন। মাপঝোকের পর বলা যাবে বিস্তারিত। তার ভাষ্য, প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে সরকারি জমিতে বাড়ি নির্মিণ হচ্ছে।
খাস জমিতে বাড়ি নির্মাণের কোনো সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আখতার। তিনি বলেন, জনবল সংকটের কারণে মাপঝোকের কাজ কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। খুব দ্রুতই ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।









