মহাশ্মশানে পিকনিক ও পবিত্রতা নষ্ট
বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার সদর উপজেলার হরিনারায়ণপুর মহাশ্মশানে মাংস রান্না করে পিকনিক এবং চিতা ও সমাধির ওপর জুতা পায়ে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ঘটনায় নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার কথা বলে স্থানীয়ভাবে মৌখিক মীমাংসার পর লিখিত মীমাংসাপত্রে স্বাক্ষরকে কেন্দ্র করে বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। একপর্যায়ে মহাশ্মশান কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিপুল কুমার সাহাকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে হরিনারায়ণপুরের লক্ষণ জুট মিল সংলগ্ন জাহাঙ্গীরের গোডাউনের সামনে এ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেন বিপুল কুমার সাহা।
এর আগে মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) হরিনারায়ণপুর বাজার মহাশ্মশানে একদল যুবকের মাংস রান্না করে পিকনিক করার অভিযোগ ওঠে। একই সঙ্গে শ্মশানের চিতা ও একটি সমাধির ওপর জুতা পায়ে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার অভিযোগও পাওয়া যায়। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, পরিস্থিতি যাতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার দিকে না যায় এবং সামাজিক সম্প্রীতি বজায় থাকে, সে বিবেচনায় মঙ্গলবার রাতে স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সূত্রের দাবি, স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার মধ্যস্থতায় অনেকটা চাপের মুখে মৌখিকভাবে বিষয়টি মীমাংসা করা হয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হওয়া এবং মহাশ্মশানটি দেখভালের দায়িত্ব নেওয়ার কথাও বলা হয়।
তবে পরদিন লিখিতভাবে মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়ার সময় পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয় বলে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য। আগের রাতে দায়িত্ব নেওয়া ব্যক্তিদের কেউ কেউ লিখিত মীমাংসাপত্রে স্বাক্ষর করতে অনাগ্রহী হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে বিরোধ তৈরি হয়। এ অবস্থায় হরিনারায়ণপুর ইউনিয়নের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মতামত না নিয়ে বিষয়টি চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করা নিয়েও আপত্তি ওঠে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকালে ইবি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম মামুনুর রশীদ মহাশ্মশান কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং অভিযুক্তদের পরিবারের সদস্যদের থানায় আসতে বলেন। তারা থানায় উপস্থিত হলেও ওই সময় ওসি থানায় ছিলেন না বলে জানা গেছে। পরে থানা থেকে একটি মীমাংসাপত্র তৈরি করে সংশ্লিষ্ট সবার স্বাক্ষর নিয়ে সন্ধ্যার মধ্যে থানায় জমা দিতে বলা হয়।
এরপর অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে একটি মীমাংসাপত্র তৈরি করা হয়। দুপুরে ওই পত্রে শুধু মহাশ্মশান কমিটির সভাপতি সুবাস কর্মকারের স্বাক্ষর নেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। কিন্তু মঙ্গলবার রাতে মৌখিক মীমাংসার সময় মহাশ্মশান দেখভাল এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটার বিষয়ে যারা দায়িত্ব নিয়েছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি, তাদের স্বাক্ষর ওই পত্রে ছিল না।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, দায়িত্ব নেওয়া রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে একজন মীমাংসাপত্রে স্বাক্ষর করতে রাজি হননি। এ কারণে শ্মশান কমিটির সাধারণ সম্পাদকসহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে লিখিত মীমাংসাপত্রে স্বাক্ষরের বিষয়টি নিয়ে আপত্তি তৈরি হয়। তবে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এরই মধ্যে মীমাংসাপত্রটি নিয়ে বুধবার সন্ধ্যায় শ্মশান কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিপুল কুমার সাহার কাছে যান ঘটনার সঙ্গে জড়িত এক অভিযুক্ত যুবকের বাবা বক্কর। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তার বাড়ি হরিনারায়ণপুর ইউনিয়নের আব্দালপুর গ্রামে।
সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে লক্ষণ জুট মিল সংলগ্ন জাহাঙ্গীরের গোডাউনের সামনে বিপুল কুমার সাহার সঙ্গে তার দেখা হয়। সেখানে মীমাংসাপত্রে স্বাক্ষরের বিষয়টি নিয়ে কথা-কাটাকাটি হয়।
বিপুল কুমার সাহার অভিযোগ, মীমাংসাপত্রে আগের রাতে দায়িত্ব নেওয়া ব্যক্তিদের স্বাক্ষর না থাকায় তিনি ওই পত্রে স্বাক্ষর করতে রাজি হননি। সংশ্লিষ্টরা আগে স্বাক্ষর করলে তিনিও স্বাক্ষর করবেন বলে জানান। কিন্তু বক্কর তাকে আগে স্বাক্ষর করার জন্য চাপ দিতে থাকেন। একপর্যায়ে কথা-কাটাকাটির মধ্যে ছাতা দিয়ে তাকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেন বিপুল।
বিপুল কুমার সাহা বলেন, “আমি বলেছিলাম, অন্যরা আগে স্বাক্ষর করুক, এরপর আমি স্বাক্ষর করব। এ কথা বলার পরই আমার ওপর হামলা করা হয়। বক্কর আমাকে মেরেছে।”
তার দাবি, মীমাংসাপত্রে স্বাক্ষর করানোর জন্য তার ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয় এবং একপর্যায়ে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টাও করা হয়।
অভিযোগের বিষয়ে বক্কর বা তার পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ইবি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম মামুনুর রশীদ বলেন, শ্মশানের ঘটনাটি আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখেছি। বিষয়টি জানার পর শ্মশান কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে ডেকে মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তারা তখন সামাজিকভাবে বিষয়টি মীমাংসার কথা জানান।
বিপুল কুমার সাহাকে মারধরের বিষয়ে থানায় এখনো কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি জানিয়ে ওসি বলেন, অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিতে হরিনারায়ণপুর মহাশ্মশান এলাকায় কয়েকজন যুবকের মাংস রান্না ও খাওয়ার দৃশ্য দেখা যায় বলে স্থানীয়দের দাবি। একই সঙ্গে শ্মশানের চিতা ও একটি সমাধির ওপর জুতা পায়ে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার অভিযোগও ওঠে। স্থানীয়দের দাবি, ছবি ও ভিডিওতে থাকা কয়েকজনকে তারা শনাক্ত করেছেন। তাদের বাড়ি হরিনারায়ণপুর ইউনিয়নের আব্দালপুর ও শান্তিডাঙ্গা এলাকায় বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। তবে অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, মঙ্গলবার রাতে বিষয়টি সামাজিকভাবে মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল পরিস্থিতি শান্ত রাখা এবং কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি না হতে দেওয়া। তবে পরদিন মীমাংসাপত্রে স্বাক্ষরকে কেন্দ্র করে নতুন বিরোধের সৃষ্টি হওয়ায় বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, হরিনারায়ণপুর মহাশ্মশানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি যাতে কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হলেও কোনো পক্ষের ওপর চাপ প্রয়োগ, ভয়ভীতি বা হামলার অভিযোগ উঠলে সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।
তাদের ভাষ্য, ধর্মীয় স্থান ও ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখানো যেমন প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব, তেমনি কোনো অভিযোগের নিষ্পত্তিতেও সংশ্লিষ্ট পক্ষের মতামত ও আইনগত প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মান থাকা জরুরি। হরিনারায়ণপুরের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুণ্ন রাখতে প্রকৃত ঘটনা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
এদিকে, শ্মশানের পবিত্রতা নষ্ট করার অভিযোগ এবং মহাশ্মশান কমিটির সাধারণ সম্পাদকের ওপর হামলার অভিযোগের ঘটনায় স্থানীয় ধর্মীয় সংগঠনগুলোর ব্যানারে কর্মসূচি দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। সূত্রগুলোর দাবি, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্থানের সুরক্ষার দাবি জানানো হতে পারে। তবে কর্মসূচির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বিষয়টি নিয়ে কোনো পক্ষ যাতে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডে না জড়ায় এবং ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করবে। একই সঙ্গে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।









