কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

বীরনিবাসের আশায় মুক্তিযোদ্ধার ঠাঁই বারান্দায়

দুই মাসের কাজ আড়াই বছরেও শেষ হয়নি

 

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ দেশ স্বাধীন করতে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলেন তাঁরা। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে স্বপ্ন দেখেছিলেন, একটি পাকা ঘরে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে নিশ্চিন্তে দিন কাটাবেন। সেই স্বপ্ন পূরণের আশায় সরকারি বীরনিবাস নির্মাণের জন্য ভেঙে দিয়েছিলেন নিজেদের জরাজীর্ণ টিনের ঘর। কথা ছিল, দুই মাসের মধ্যে তৈরি হবে নতুন ঘর। কিন্তু আড়াই বছর পেরিয়ে গেলেও সেই ঘর আর তৈরি হয়নি। উল্টো নতুন আশ্রয়ের অপেক্ষায় কেউ ঠাঁই নিয়েছেন প্রতিবেশীর বারান্দায়, কেউ বাধ্য হয়ে ধারদেনা ও ব্যাংকঋণ নিয়ে নিজেদের থাকার ব্যবস্থা করেছেন। প্যারালাইসিসে আক্রান্ত এক বীর মুক্তিযোদ্ধা স্ত্রীকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন অন্যের বাড়িতে। ৮৪ বছর বয়সী আরেক মুক্তিযোদ্ধার আকুতি—মৃত্যুর আগে অন্তত কয়েক দিন যেন নিজের ঘরে থাকতে পারেন।

 

কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায় অসচ্ছল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নির্মাণাধীন ছয়টি বীরনিবাসের এমন বেহাল দশা দেখা গেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ১ কোটি ৪ লাখ ৫৫ হাজার টাকা ব্যয়ে ছয়টি বীরনিবাস নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২১ এপ্রিল কাজ শুরু করে ওই বছরের ১৯ জুনের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের অক্টোবরেও একটি ঘরের কাজ হয়েছে মাত্র ৫ শতাংশ, আরেকটির ১০ শতাংশ। বাকি চারটির ছাদ ঢালাই পর্যন্ত কাজ হলেও এরপর নির্মাণকাজ থেমে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে থাকায় কয়েকটি ঘরের দেয়াল ও ছাদে শ্যাওলা জমেছে, চারপাশে জন্মেছে আগাছা।

 

সরকারি এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল অসচ্ছল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা। অথচ ঘরের আশায় পুরোনো আশ্রয় ছেড়ে এখন তাঁদেরই কেউ অন্যের বাড়িতে, কেউ নিজেদের অর্থ খরচ করে নির্মিত ঘরে দিন কাটাচ্ছেন। ঠিকাদারের অবহেলা, প্রশাসনের তদারকি এবং নির্মাণকাজের মান নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের অভিযোগের মধ্যে প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

 

যদুবয়রা ইউনিয়নের বল্লভপুর গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. কিয়ামউদ্দিন সরদার পাকা ঘরে স্ত্রীকে নিয়ে জীবনের শেষ দিনগুলো কাটানোর আশায় নিজের পুরোনো টিনের ঘর ভেঙে দিয়েছিলেন। কিন্তু আড়াই বছর পেরিয়ে গেলেও নতুন ঘরের কাজ মেঝের ভিত্তি পর্যন্ত এগিয়েছে। সেখানে আগাছা জন্মেছে, জমেছে শ্যাওলা। প্যারালাইসিসে আক্রান্ত কিয়ামউদ্দিন এখন স্ত্রী আছিয়া খাতুনকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন প্রতিবেশীর বাড়িতে।

 

আছিয়া খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “একটা ভাঙা টিনের ঘর ছিল। এই ঘর পাকা হবে বলে সেই ঘর ভেঙে ফেলেছি। কিন্তু ঠিকাদার কবে চলে গেছে, আর আসেনি। এখন কষ্ট করে পরের বাড়িতে আছি। জলদি ঘরটা করে দিলে একটু বাঁচতাম।”

 

সরকারি ঘরের আশায় নিজেদের একমাত্র আশ্রয় ছেড়ে দেওয়ার পর এমন দুর্ভোগে পড়বেন, তা কল্পনাও করেননি তাঁরা। অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে অন্যের বাড়িতে থাকতে হচ্ছে, কবে নিজেদের ঘরে ফিরতে পারবেন, তারও নিশ্চয়তা নেই।

 

কুমারখালী পৌরসভার খয়েরচারা এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মকবুল হোসেনের বীরনিবাস নির্মাণের কাজ শুরু হয় ২০২৪ সালের ২১ এপ্রিল। প্রায় ১৭ লাখ ৪২ হাজার টাকা ব্যয়ে ওই বছরের ১৯ জুনের মধ্যে ঘরটি নির্মাণ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি মাত্র ৫ শতাংশ। ঘরের মেঝে পর্যন্ত নির্মাণ হয়েছে। সেখানে জমেছে শ্যাওলা, চারপাশে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ।

 

সরেজমিনে দেখা যায়, সরকারি ঘর না পেয়ে নিজের তৈরি টিনশেড ঘরের বারান্দায় বসে আছেন মকবুল হোসেন। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, “সরকার একটা ঘর দিছিল। কিন্তু ঠিকাদার করে দেয়নি। ইউএনওর কাছে বহুবার গেছি, তাতেও কাজ হয়নি। পরে ছোট ছেলের সঙ্গে মিলে একটা ঘর করে নিয়েছি।”

 

তিনি জানান, সময়মতো সরকারি ঘর পেলে নিজেদের অর্থ খরচ করে নতুন ঘর নির্মাণ করতে হতো না। ঠিকাদার কয়েক দিন কাজ করে চলে যাওয়ার পর আর ফিরে আসেননি বলে তাঁর অভিযোগ। বাধ্য হয়ে ধারদেনা ও ব্যাংকঋণ নিয়ে প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নিজেদের থাকার ঘর তৈরি করেছেন তাঁরা।

 

মকবুল হোসেনের ছোট ছেলে মুদিদোকানি জাকিদুল হোসেন বলেন, “যেটুকু কাজ হয়েছে, তাতেও নানা অনিয়ম। কবে ভেঙে পড়বে, সেই ভয় আছে। আমরা আর ঘর চাই না। সরকার যদি মালামাল ফেরত নিত, সবচেয়ে ভালো হতো।”

 

চাপড়া ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. সামসুদ্দিন শেখও বীরনিবাস নির্মাণের জন্য নিজের জরাজীর্ণ ঘর ভেঙে জায়গা ছেড়ে দিয়েছিলেন। নির্মাণকাজ শুরু হলেও ছাদ ঢালাইয়ের পর ঠিকাদার চলে যান। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কাজ আর এগোয়নি। এখন স্ত্রীকে নিয়ে প্রতিবেশীর বাড়ির বারান্দায় থাকতে হচ্ছে তাঁকে।

 

ক্ষোভ প্রকাশ করে সামসুদ্দিন শেখ বলেন, “বছর দেড়েক আগে ছাদ ঢালাই দিয়ে ঠিকাদার চলে গেছে। বাঁশ-খুঁটি এখনো রয়ে গেছে। আর কাজ করছে না। ঘরের অভাবে পরের বাড়ির বারান্দায় থাকি। এত কষ্ট করা যায়?”

 

বৃদ্ধ স্ত্রী আলেয়া খাতুন চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, “ঘর নেই বলেই তো এত কষ্ট। না থাকলে কোথায় থাকা যায়? সরকার করে দিচ্ছে না, তাই হচ্ছে না। স্বামী অসুস্থ মানুষ। বাইরে যেতে গেলে পড়ে যায়। তাড়াতাড়ি করে দিলে ভালো হয়।”

 

কুমারখালী পৌরসভার সাঁওতা গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. নুরুদ্দিন শেখের বয়স ৮৪ বছর। বীরনিবাস নির্মাণের আশায় নিজের ভাঙা টিনের ঘর ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু দুই বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ঘরটি সম্পূর্ণ হয়নি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁর চাওয়া আর বড় কিছু নয়—নিজের ঘরে অন্তত কয়েক দিন কাটানো।

 

নুরুদ্দিন শেখ বলেন, “আমার ভাঙা ঘর ছিল। সরকার বলল ঘর দেবে, তাই ভেঙেছি। কিন্তু দুই বছরের বেশি হয়ে গেল, এখনো সেই ঘর সম্পূর্ণ হয়নি। আমার বয়স ৮৪ বছর। আর বাঁচব কয় দিন? মরার আগে এই ঘরে একটু শুয়ে যেতে চাই।”

 

তাঁর স্ত্রী আতরী খাতুন জানান, ঠিকাদারের কথায় পুরোনো টিনের ঘর ভেঙে দিয়েছিলেন তাঁরা। এখন অন্যের জায়গায় আর কত দিন থাকতে হবে, সেই চিন্তায় দিন কাটছে।

 

একই প্রকল্পের আওতায় বাটিকামারা এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ফজলুর রহমান এবং বাগুলাট ইউনিয়নের মো. সাদ আলীর জন্যও বীরনিবাস নির্মাণের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের ঘরসহ চারটি বাড়ির ছাদ ঢালাই পর্যন্ত কাজ হয়েছে। কিন্তু এরপর নির্মাণকাজ থেমে থাকায় ঘরগুলো দীর্ঘদিন ধরে অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। নির্মাণকাজের বাঁশ-খুঁটিও সরানো হয়নি বলে জানা গেছে।

 

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, অসচ্ছল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আবাসন নির্মাণ প্রকল্প-৩ এর আওতায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কুমারখালীতে ছয়টি বীরনিবাস নির্মাণের বরাদ্দ দেয় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। মোট বরাদ্দ প্রায় ১ কোটি ৪ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। কাজ পায় কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার মেসার্স অনু ট্রেডার্স। চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২১ এপ্রিল কাজ শুরু করে ১৯ জুনের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল।

 

কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পটি দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে। বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের স্বজনদের অভিযোগ, প্রশাসনের যথাযথ তদারকি না থাকায় নির্মাণকাজ শেষ হচ্ছে না। বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের জামাতা মো. মনিরুল ইসলাম জানান, নির্মাণকাজের মান নিয়ে তাঁদের অভিযোগ রয়েছে। ঠিকাদার ও প্রশাসনকে বারবার জানিয়েও সমাধান পাননি। এ বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

 

নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মেসার্স অনু ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী শফিকুল ইসলাম। তাঁর দাবি, অন্য এক ঠিকাদারকে কাজের দায়িত্ব দেওয়ায় বিলম্ব হয়েছে। বর্তমানে তিনি নিজেই কাজ করছেন। আগামী দুই-এক মাসের মধ্যে কাজ শেষ হবে বলেও জানান তিনি।

 

প্রকল্প বাস্তবায়ন অধিদপ্তরের কুষ্টিয়া অঞ্চলের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী বিপ্লব হোসেনের তথ্য অনুযায়ী, ঠিকাদারের অবহেলায় একটি ঘরের কাজ ৫ শতাংশ, আরেকটির ১০ শতাংশ এবং বাকি চারটির কাজ প্রায় ৫০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে।

 

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. দোস্তদার হোসেন জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ঠিকাদারের অবহেলার কারণে কাজ শেষ হয়নি। ঠিকাদারকে কয়েকবার চিঠি দিয়েও কাজ শেষ করানো যায়নি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তবে নির্মাণকাজে কোনো অনিয়ম হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

 

কুমারখালীর সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাভিদ সারওয়ার এবং সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসান রিফাত জানান, ঠিকাদারকে তিনটি তাগিদপত্র দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

 

Tags :

কুষ্টিয়া জেলা নিউজ ডেক্স, কুষ্টিয়া জিলাইভ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর