বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার কবুরহাট এলাকায় অষ্টমবারের মতো শুরু হয়েছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা উৎসব। সংবাদভিত্তিক জনপ্রিয় ফেসবুক পেজ ‘আপডেট কুষ্টিয়া’র আয়োজনে গতকাল শনিবার (২৪ অক্টোবর) তিন দিনব্যাপী এ উৎসবের উদ্বোধন করা হয়। এতে বিভিন্ন বয়সী প্রায় দেড় শতাধিক লাঠিয়াল অংশ নিচ্ছেন। বাদ্যের তালে তালে লাঠিয়ালদের নান্দনিক কসরত, আক্রমণ ও আত্মরক্ষার কৌশল দেখতে প্রথম দিন থেকেই এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
উৎসবের মিডিয়া পার্টনার হিসেবে রয়েছে কুষ্টিয়ার জনপ্রিয় গণমাধ্যম দৈনিক খবরওয়ালা, আন্দোলনের বাজার অনলাইন ও সাপ্তাহিক পথিকৃৎ। পাশাপাশি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন পলিন ফাউন্ডেশন আয়োজনটিতে সহযোগিতা করছে।
শনিবার প্রথম দিনের খেলার উদ্বোধন করেন ‘আপডেট কুষ্টিয়া’র অ্যাডমিন ও সাংবাদিক অর্পণ মাহমুদ, কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু মনি জুবায়েদ রিপন, সাপ্তাহিক পথিকৃৎ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক শাহারিয়া ইমন রুবেল, পলিন ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক আবু মনি সাকলায়েন এলিন, বাংলাদেশ লাঠিয়াল বাহিনীর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আলাউদ্দিন, সাংগঠনিক সম্পাদক শাহিনা সুলতানা ডিজু, অর্থ সম্পাদক সাব্বির হাসান চৌধুরী রাতুল, কবুরহাটের সমাজপ্রধান সাইদুল ইসলাম বিশ্বাস, আবুল হোসেনসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
দৈনিক আন্দোলনের বাজার পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টার ও ‘আপডেট কুষ্টিয়া’ পেজের হেড অব অ্যাডমিন অর্পণ মাহমুদের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এবং ওস্তাদ জানার আলীর পরিচালনায় এবারের আয়োজন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে তিনজন বাদ্যযন্ত্রশিল্পীর পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সী প্রায় দেড় শতাধিক লাঠিয়াল অংশ নিচ্ছেন।
আয়োজক অর্পণ মাহমুদ বলেন, সুস্থ ধারার সামাজিক বিনোদন নিশ্চিত করা এবং মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে প্রতিবছর হেমন্তে ধান পাকার আগে এ লাঠিখেলা উৎসবের আয়োজন করা হয়। কুষ্টিয়ার বিভিন্ন এলাকায় আবহমানকাল ধরে লাঠিখেলা মানুষের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে পরিচিত। নতুন প্রজন্মকে মাদক ও সন্ত্রাস থেকে দূরে রাখতে এবং মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত আসক্তি কমাতে ঐতিহ্যবাহী এ খেলাকে টিকিয়ে রাখা জরুরি।
তিন দিনের এ উৎসবে বাদ্যের তালে তালে লাঠিয়ালদের নাচ, লাঠি চালানোর কৌশল এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণ প্রতিহত করার নানা কসরত দর্শকদের মুগ্ধ করছে। লাঠিয়ালরা দলবদ্ধভাবে ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে খোলা মাঠে তাঁদের নৈপুণ্য প্রদর্শন করবেন। এ খেলা দেখতে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও মানুষ ছুটে আসছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, লাঠিখেলার প্রতিটি পরিবেশনায় রয়েছে আক্রমণ ও আত্মরক্ষার সমন্বিত কৌশল। এক পক্ষ প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করার ভঙ্গিতে লাঠি চালাচ্ছে, অন্য পক্ষ দক্ষতার সঙ্গে তা প্রতিহত করছে। বাদ্যের তালে তালে লাঠিয়ালদের ছন্দময় পদচারণা ও ক্ষিপ্র কসরতে তৈরি হচ্ছে প্রতীকী যুদ্ধের আবহ। দর্শকেরা করতালি দিয়ে তাঁদের উৎসাহিত করছেন।
একসময় গ্রামবাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল লাঠিখেলা। বিভিন্ন অঞ্চলে জমিদার ও সামন্তপ্রভুদের আমলে নিরাপত্তা রক্ষা এবং খাজনা আদায়ের কাজে লাঠিয়ালদের ব্যবহার করা হতো। সময়ের পরিবর্তনে সেই লাঠি এখন ঐতিহ্যবাহী খেলায় রূপ নিয়েছে। তবে আধুনিক বিনোদনের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামীণ জনপদে এ খেলার চর্চা কমে আসায় অনেক লাঠিয়াল দল বিলুপ্তির মুখে পড়েছে।
লাঠিয়াল সাদেক আলী বলেন, “পারিবারিকভাবেই আমরা লাঠিখেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত। বাপ-দাদার কাছ থেকে এ খেলার শিক্ষা পেয়েছি। এ ঐতিহ্যবাহী খেলা দেখে দর্শকেরা যেমন আনন্দ পান, তেমনি এর মাধ্যমে আত্মরক্ষার নানা কৌশলও শেখা যায়। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও আমরা খেলাটি টিকিয়ে রেখেছি। এ ঐতিহ্য ধরে রাখতে সরকারি সহযোগিতা জরুরি।”
লাঠিখেলা দেখতে আসা এক দর্শক সাদেক আলী বলেন, “শুনেছি, একসময় আউশ ধান কাটার মৌসুম শেষ হলে গ্রামের মানুষ লাঠিখেলায় মেতে উঠতেন। বাড়ির উঠান কিংবা ধানের খলায় বসত এ খেলার আসর। আগে কুষ্টিয়াসহ আশপাশের জেলাগুলোর প্রায় প্রতিটি গ্রামেই অন্তত একটি লাঠিয়াল দল ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খেলাটি প্রায় বিলুপ্তির পথে। তাই কুষ্টিয়ায় তিন দিনব্যাপী লাঠিখেলা উৎসবের খবর শুনে খেলা দেখতে এসেছি।”
কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু মনি জুবায়েদ রিপন বলেন, “লাঠিখেলা দেখে আমি মুগ্ধ। বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা মাদক ও মোবাইল ফোনে আসক্ত হয়ে পড়ছে। যুবসমাজকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে হলে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলো টিকিয়ে রাখতে হবে। এমন সুন্দর আয়োজনের জন্য আয়োজক অর্পণ মাহমুদকে ধন্যবাদ জানাই। খেলাটি টিকিয়ে রাখতে সবাইকে পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি।”
খেলা আয়োজক কমিটির সদস্য, রাশিদা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও সাপ্তাহিক পথিকৃৎ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক শাহারিয়া ইমন রুবেল বলেন, “কালের বিবর্তনে বিলুপ্তপ্রায় এ লাঠিখেলা টিকিয়ে রাখতে হলে লাঠিয়ালদের পাশে দাঁড়ানো জরুরি। প্রতিবছর এ উৎসবের আয়োজনের মাধ্যমে একদিকে লাঠিয়ালদের উৎসাহিত করা হয়, অন্যদিকে গ্রামবাসীর বিনোদনের ব্যবস্থা করা হয়। নতুন প্রজন্ম যেন এ খেলা সম্পর্কে জানতে পারে, সে জন্য এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করব।”
খেলার পরিচালক জানার আলী সর্দারসহ প্রবীণ লাঠিয়ালরা জানান, তাঁরা প্রায় দুই যুগ ধরে বিভিন্ন এলাকায় লাঠিখেলা প্রদর্শন করে আসছেন। তবে এ খেলার সঙ্গে যুক্ত অধিকাংশ লাঠিয়ালই দরিদ্র। নানা প্রতিকূলতার মধ্যে তাঁদের জীবনযাপন করতে হয়। তাঁদের জন্য সরকারি বা বেসরকারিভাবে তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই। নিয়মিত চর্চা, প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে এ খেলাকে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব বলে মনে করেন তাঁরা।
আয়োজকদের মতে, লাঠিখেলা কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি গ্রামবাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যেরও অংশ। নতুন প্রজন্মের কাছে এ ঐতিহ্য তুলে ধরা এবং লাঠিয়ালদের উৎসাহিত করার লক্ষ্যেই প্রতিবছর এ আয়োজন করা হচ্ছে।
খেলার বিরতিতে অংশগ্রহণকারী লাঠিয়াল ও অতিথিদের জন্য কলাপাড়ায় ভোজের আয়োজন করা হয়। তিন দিনব্যাপী এ উৎসবের মধ্য দিয়ে গ্রামীণ ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ এবং লাঠিখেলার চর্চা ধরে রাখার প্রত্যাশা করছেন আয়োজক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।









