কর্তৃপক্ষের চোখে কাঠের চশমা!
বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার জগতি এলাকায় সরকারি সম্পত্তি নিয়ে দখল-বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। ফুড গোডাউনের দেয়াল ঘেঁষে বাংলাদেশ রেলওয়ের দুই কাঠা জমি তিন লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। জমিটি কিনেছেন শফিকুল নামের এক ব্যক্তি। অথচ জমিটি ব্যক্তিমালিকানাধীন নয়, রেলওয়ের সম্পত্তি। কৃষিজমি হিসেবে অন্য ব্যক্তির নামে লিজ দেওয়া রয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সরকারি সম্পত্তি কীভাবে ব্যক্তির হাত ঘুরে বিক্রির পর্যায়ে পৌঁছাল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও প্রভাবশালী মহলের দাপটে এলাকায় সরকারি জমি দখলের প্রবণতা বাড়ছে। তাঁদের দাবি, সর্বশেষ দখল হওয়া জমিটির আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় এক কোটি টাকা।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন জানে আলম নামের এক ব্যক্তি। অভিযোগ রয়েছে, তিনি রেলওয়ের জমি দখলে নিয়ে দুই কাঠা তিন লাখ টাকায় বিক্রি করছেন। তবে কীসের ভিত্তিতে তিনি সরকারি সম্পত্তি বিক্রি করছেন, তাঁর নামে কোনো বৈধ লিজ রয়েছে কি না কিংবা জমি হস্তান্তরের জন্য রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর মেলেনি। জমিটির প্রকৃত মালিকানা, লিজের শর্ত এবং কথিত লেনদেনের বৈধতা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন।
জমি কেনার বিষয়ে শফিকুলের বক্তব্যে উঠে এসেছে কয়েকজনের মাধ্যমে জমিটি তাঁর কাছে আসার তথ্য। তিনি বলেন, শহীদ পাটোয়ারীর কাছ থেকে তাঁর জামাই, জামাইয়ের কাছ থেকে রশিদ, এরপর আমি কিনেছি। এখন রেলওয়ের কাছ থেকে ডিসিআর কেটে খাজনা দিলে জমিটি তখন আমার নামে হবে।
শফিকুলের এই বক্তব্যে জমিটি কেনার দাবি উঠে এলেও জমির বৈধ মালিকানা কিংবা হস্তান্তরের অনুমোদনের বিষয়টি স্পষ্ট হয়নি। রেলওয়ের জমি হলে কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থের বিনিময়ে তা কিনলেই ক্রেতা মালিক হয়ে যান না। জমিটি লিজ দেওয়া থাকলে সেই লিজের শর্ত, হস্তান্তরের অনুমতি এবং রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট নথিপত্রই হবে গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে, ডিসিআর কেটে রাজস্ব পরিশোধের সুযোগ থাকলেও তা নিজে থেকে জমির মালিকানা প্রতিষ্ঠা করে না।
প্রশ্ন উঠেছে, জমিটি যদি কৃষিজমি হিসেবে লিজ দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে কীভাবে তা একাধিক ব্যক্তির হাত ঘুরে বিক্রির পর্যায়ে পৌঁছাল? আর ক্রেতাকে যদি রেলওয়ের কাছ থেকে নতুন করে কাগজপত্র নিতে হয়, তাহলে বিক্রেতার বিক্রির অধিকার ছিল কি না?
রেলওয়ের পোড়াদহের কানুনগো মনিরুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি আমরা জানতে পেরেছি। শফিকুল নামের ওই ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি বলেছেন, তাঁর নামে কৃষিজমি হিসেবে লিজ নেওয়া রয়েছে। আমি তাঁকে কাগজপত্র দেখাতে বলেছি।
তিনি আরও বলেন, জমিটি কৃষিজমি হিসেবে লিজ নেওয়া থাকলে সেখানে বাণিজ্যিক কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না। বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারলে তাঁকে উচ্ছেদ করা হবে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাবে জগতি এলাকায় একের পর এক সরকারি জমি দখল হয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত প্রভাবের কারণে দখল-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অনেকে প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পান না বলেও তাঁদের দাবি। তাঁদের অভিযোগ, সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় যেসব কর্মকর্তার তদারকি ও দায়িত্ব পালনের কথা, তাঁদের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাদের একাংশের দাবি, সর্বশেষ দখল করা জমিটির আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় এক কোটি টাকা। এছাড়া অসাধু কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভূমি দখলকারীদের যোগসাজশের অভিযোগও তুলেছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ।
রেলওয়ের জমি রাষ্ট্রের সম্পদ। এসব জমি লিজ দেওয়া হলে তা নির্ধারিত শর্তে ব্যবহার করতে হয়, অনুমোদনহীন হস্তান্তর কিংবা শর্তবহির্ভূত ব্যবহার হলে সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। জগতি এলাকায় ওঠা অভিযোগের ক্ষেত্রে শুধু ক্রেতার কাছে কাগজপত্র চাওয়াই যথেষ্ট কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জমির মূল লিজগ্রহীতা, কথিত বিক্রেতা এবং লেনদেনে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখাও জরুরি।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, সরকারি জমি দখলের অভিযোগের যথাযথ প্রতিকার না হলে ভবিষ্যতে আরও সম্পত্তি বেদখল হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। তাঁদের দাবি, রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উচিত জমিটির সীমানা ও মালিকানা-সংক্রান্ত নথি যাচাই, লিজের শর্ত পরীক্ষা এবং অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা অনুসন্ধান করা।









