বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির টাকার জন্য কামলা দিচ্ছেন রাজু - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির টাকার জন্য কামলা দিচ্ছেন রাজু

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: এপ্রিল ২, ২০২৬

কুমারখালী প্রতিনিধি ॥ স্বামী কিডনি নষ্ট হয়া ১৪ বছর আগেই মারা গেছে। ইনকামের (আয়) লোক নাই। ছেলে পড়াশোনা করতে চাই, কিন্তু আমি পারতিছি নে। এই ঘরটুক মানুষ সাহায্য মাহায্য করে তুলে দিছে। এহন ছেলে চাচ্ছে পড়াশোনা করতি। আমি মানা (নিষেধ) করছি সে শোনতেছেনা। আমি টাকা পাবো কোনে। মঙ্গলবার ( ৩১ মার্চ) সকালে ছলছল চোখে আক্ষেপ করে কথা গুলো বলছিলেন কুষ্টিয়ার কুমারখালীর মধ্যবয়সী নারী ফাতেমা খাতুন। তিনি উপজেলার সদকী ইউনিয়নের মহিষাখোলা গ্রামের মৃত খবির উদ্দিনের স্ত্রী। সংসারে তার ওমর ওসমান রাজু ও রাফিউল নামে দুই ছেলে আছে। তারমধ্যে রাজু ২০২৫ – ২৬ শিক্ষাবর্ষে গুচ্ছ, জাহাঙ্গীরনগর ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। ফাতেমার ভাষ্য, রাজু পড়াশোনায় ভালো। সেজন্য বিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষক এবং এলাকাবাসীর সাহায্য – সহযোগীতায় বিনা খরচে এইচএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা চালিয়ে এসেছে।

এখন সরকারি খরচে ছেলের বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনা শেষ করতে চান। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় রাজুর বাবা কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এরপর থেকে তাঁর মা অন্যের বাসাবাড়িতে কাজ করে কোনোমতে দুই সন্তানসহ তিনজনের সংসার চালিয়ে নিচ্ছেন। রাজু উপজেলার জিডি শামছুদ্দিন আহমেদ কলেজিয়েট স্কুল থেকে ২০২৩ সালে বাণিজ্য বিভাগের কৃতি শিক্ষার্থী হিসেবে জিপিএ -৫ পেয়ে এসএসসি এবং ২০২৫ সালে ৪ দশমিক ৯২ পয়েন্ট পেয়ে এইচএসসি পরীক্ষায় বিনা খরচে উত্তীর্ণ হন। এরপর কুষ্টিয়ার একটি কোচিং সেন্টারে এক শিক্ষককের সহযোগীতায় বিনামূল্যে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি শেষ করেন। এবং বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির গুচ্ছ পরীক্ষায় ৯০ তম, জাহাঙ্গীরনগরে ২৫১ তম এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৪৩ তম মেধাস্থান অর্জন করেছেন রাজু।

তবে সংসারের অর্থনৈতিক দৈন্যদশায় অর্থাভাবে রাজুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়া সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। মঙ্গলবার সকালে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, মহিষাখোলা গ্রামের একটি মেঠো পথের ধারে অদম্য মেধাবী রাজুর টিনশেডের দুই কক্ষ বিশিষ্ট ঘর। ঘরটিতে ভাঙা কাঠের দরজা থাকলেও জানালায় রয়েছে কয়েক টুকরো কাঠ ও ছেঁড়া কাপড়ের অংশ। বাড়ির পাশের একটি মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে পেঁয়াজ তোলার শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন রাজু। তার চোখে মুখে হতাশার ছাপ। এ সময় ওমর ওসমান রাজু বলেন, ‘ ক্লাশ টু’তে পড়ার সময় বাবা মারা যায়। প্রত্যেকটা স্কুল, কলেজ ও কোচিংয়ের শিক্ষকদের সহযোগীতায় আজ পর্যন্ত আমার লেখাপড়া। তাড়া পরিবারের সামর্থ্য নাই যে, আমাকে একটা বই – খাতা কিনে দেবে। তিনি আরও বলেন, ‘২০২৫ – ২৬ শিক্ষাবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির গুচ্ছ পরীক্ষায় সারাদেশের মধ্যে ৯০ তম স্থান অর্জন করেছি।

এছাড়াও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫১ তম এবং রাজশাহীতে ৭৪৩ তম স্থান পেয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছি। কিন্তু টাকার অভাবে ভর্তি ও পড়াশোনা অনিশ্চিত। আপাতত ভর্তির টাকার জন্য আজকে থেকে মাঠ জন দিচ্ছি ৫০০ টাকা চুক্তিতে। তার ভাষ্য, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি বা সরকারিভাবে সহযোগীতা পেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে পরিবার ও নিজের স্বপ্ন পূরণ করে দেশের কল্যাণে কাজ করতে চান। সহযোগীতার জন্য – ০১৬০৮৫০৯৭৪৩ ( রাজুর বিকাশ নম্বর)। রাজুর বন্ধু ইমরান হোসেন বলেন, রাজু অদম্য মেধাবী হলেও আর্থিকভাবে অত্যন্ত গরিব।

সেজন্য তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েও পড়াশোনা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও সরকারি লোকদের এগিয়ে আসার আহবান জানান তিনি। জিডি শামছুদ্দিন আহমেদ কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক সরোয়ার হোসেন বলেন, রাজুর বাবা নেই। আর্থিক অবস্থাও নাজুক। বিনা খরচে আমার প্রতিষ্ঠান থেকে সুনামের সহিত এসএসসি ও এইচএসসি পাশ করে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। আমরা সাধ্যমতো সহযোগীতা করবো। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার বলেন, অদম্য মেধাবী কৃতি শিক্ষার্থী রাজুর বিষয়টি ইতিমধ্যে জানতে পেরেছি। তার ভর্তির জন্য সহযোগীতা করা হবে। সমাজের বিভিন্ন বিত্তবান ব্যক্তি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে এগিয়ে আসার আহবান জানান তিনি।