শিশু পরিবার ছাড়ার নির্দেশ
বিশেষ প্রতিনিধি ॥ জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে, যখন একজন শিক্ষার্থীর সামনে উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবন গড়ার স্বপ্ন, ঠিক তখনই মাথার ওপর থেকে নিরাপদ আশ্রয় হারানোর শঙ্কায় দিন কাটছে কুষ্টিয়া সরকারি শিশু পরিবার (বালক)-এ বেড়ে ওঠা ছয় এতিম ও অসহায় শিক্ষার্থীর। ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার কারণ দেখিয়ে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী তাদের প্রতিষ্ঠান ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে তাদের কেউ এইচএসসি পরীক্ষার্থী, আবার কেউ অনার্স প্রথম বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। এমন পরিস্থিতিতে অন্তত পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত শিশু পরিবারে থাকার সুযোগ এবং পড়াশোনা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
জানা গেছে, ভুক্তভোগী ছয় শিক্ষার্থী হলেন মো. আকাশ ইসলাম, মো. আকাশ শেখ, মো. তুষার আহাম্মেদ, মো. আলফাজ হোসেন, মো. অভি হাসান ও পলাশ আহমেদ। ছোটবেলায় বাবাকে হারানো, চরম দারিদ্র্য, স্বজনদের অসহায়ত্ব কিংবা মায়ের দ্বিতীয় বিয়ের মতো নানা পারিবারিক সংকটের কারণে তারা সরকারি শিশু পরিবারে আশ্রয় পান। পাঁচ-ছয় বছর বয়স থেকে দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এই প্রতিষ্ঠানেই বেড়ে উঠেছে তাদের জীবন, শিক্ষা ও স্বপ্ন। বর্তমানে তারা উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন স্তরে অধ্যয়নরত। কিন্তু ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ায় হঠাৎ করেই শিশু পরিবার ছাড়ার নির্দেশ তাদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
আকাশ ইসলাম জানান, মাত্র এক বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর আত্মীয়স্বজনের কাছে বড় হন। পরে ২০০৭ সালে শিশু পরিবারে ভর্তি হন। ২০২১ সালে এসএসসি এবং ২০২৩ সালে এইচএসসি পাস করে বর্তমানে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে অনার্স প্রথম বর্ষে অধ্যয়ন করছেন। তিনি বলেন, “এখন যদি থাকার জায়গা না থাকে, তাহলে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াই কঠিন হয়ে যাবে।” তুষার আহাম্মেদ বলেন, সাত বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর শিশু পরিবারই তার একমাত্র আশ্রয় হয়ে ওঠে। বর্তমানে তিনি এইচএসসি পরীক্ষার্থী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু আশ্রয় হারানোর শঙ্কায় সেই স্বপ্ন এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
আকাশ শেখ জানান, ২০১১ সালে তিনি শিশু পরিবারে ভর্তি হন। এসএসসিতে জিপিএ-৪.৮৯ এবং এইচএসসিতে জিপিএ-৪.০০ অর্জনের পর বর্তমানে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগে অনার্স প্রথম বর্ষে অধ্যয়ন করছেন। আগামী ২৭ জুলাই তার প্রথম বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা শুরু হবে। তিনি বলেন, “পরীক্ষার ঠিক আগে কোথায় থাকব, কীভাবে পড়াশোনা করব—এই চিন্তায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি।” আলফাজ হোসেন বলেন, বাবার মৃত্যুর পর পারিবারিক সংকটের কারণে ২০১২ সালে শিশু পরিবারে আশ্রয় নেন। আর্থিক অভাবে এক বছর কলেজে ভর্তি হতে না পারলেও বর্তমানে অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ছেন।
তিনি বলেন, “আমাকে রাখার মতো স্থায়ী কোনো জায়গা নেই। অন্তত পরীক্ষা শেষ হওয়া পর্যন্ত এখানে থাকতে পারলে পড়াশোনা শেষ করার সুযোগ পেতাম।” অভি হাসানও একই ধরনের সংকটের কথা তুলে ধরে বলেন, নিরাপদ আশ্রয় না থাকলে তার পক্ষে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে। অন্যদিকে, পলাশ আহমেদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, পলাশ পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী। তার বর্তমান বয়স ১৭ বছর ৫ মাস হলেও তাকে ১৮ বছরের বেশি বয়স দেখিয়ে শিশু পরিবার থেকে বের করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, ১৮ বছর পূর্ণ হলেই একজন এতিম বা অসহায় তরুণ স্বাবলম্বী হয়ে যায় না। বরং এ সময়ই উচ্চশিক্ষা গ্রহণ, কর্মজীবনের প্রস্তুতি এবং জীবনের ভিত্তি গড়ে তোলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়।
ঠিক সেই মুহূর্তে আশ্রয় হারালে তাদের শিক্ষা, মানসিক স্থিতি ও ভবিষ্যৎ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাদের দাবি, মানবিক বিবেচনায় অন্তত চলমান এইচএসসি ও অনার্স পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত শিশু পরিবারে থাকার সুযোগ দেওয়া হোক। পাশাপাশি পড়াশোনা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত নিরাপদ আবাসন ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সরকারি শিশু পরিবার (বালক)-এর উপ-তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ আলী বলেন, তারা এখন প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী শিশু পরিবারে রাখার সুযোগ নেই। তবে তারা সহযোগিতা চেয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
কীভাবে তাদের সহায়তা করা যায়, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. আব্দুল লতিফ বলেন, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী ১৮ বছরের বেশি বয়স হলে শিশু পরিবারে থাকার সুযোগ নেই। তাই তাদের প্রতিষ্ঠান ছাড়তে হবে। তবে তারা যদি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চায়, তাহলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে শিক্ষাবৃত্তিসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে। এছাড়া যেকোনো প্রয়োজনে সমাজসেবা কার্যালয় তাদের পাশে থাকবে।
১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার পর এসব তরুণের পুনর্বাসন বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমাদের নীতিমালা অনুযায়ী ১৮ বছর পর্যন্ত তাদের লালন-পালনের দায়িত্ব থাকে। এরপর আমরা চেষ্টা করি তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে। এর বাইরে আমাদের করণীয় খুবই সীমিত। তবে এই ছয়জনের বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছি এবং কীভাবে তাদের আরও সহযোগিতা করা যায়, সে বিষয়েও চিন্তাভাবনা করছি।” স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এতিম ও অসহায় শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে শুধু বয়সকে বিবেচনার একমাত্র মানদণ্ড না করে তাদের শিক্ষা, নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত। অন্যথায় উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখা এসব তরুণের জীবন অনিশ্চয়তার অন্ধকারে হারিয়ে যেতে পারে। তাই বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিবেচনা করে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।









