বিশেষ প্রতিনিধি ॥ একসময় কুষ্টিয়ার শিল্প ও অর্থনীতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ছিল কুষ্টিয়া সুগার মিল। আখের মাঠ থেকে আসা কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাত করে চিনি উৎপাদন, হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সেই প্রাচীন প্রতিষ্ঠানটিই এবার ইতিহাস হতে চলেছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কুষ্টিয়া সুগার মিলের প্রায় ২২০ একর জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
এরই মধ্যে মিলের জমি ও যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। গত ১৯ আগস্ট বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে কুষ্টিয়া সুগার মিলের জমি ও সম্পদ বেজার কাছে হস্তান্তরের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনকে (বিএসএফআইসি) অনুরোধ করা হয়েছে।
বেজার চিঠি অনুযায়ী, গত ৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী ও বেজা গভর্নিং বোর্ডের ১০ম সভায় কুষ্টিয়া সুগার মিলের জমিতে নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত প্রস্তাব উপস্থাপনের কথা রয়েছে। এ উদ্দেশ্যে মিলটির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, মোট জমির পরিমাণ, সীমানা ম্যাপ, খতিয়ান, সর্বশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদন, সম্পদ ও ঋণের বিবরণ এবং চলমান আইনি মামলার হালনাগাদ তথ্য চেয়েছে বেজা।
কুষ্টিয়ার জগতি এলাকায় প্রায় ২২০ একর জমির ওপর ১৯৬১ সালে কুষ্টিয়া সুগার মিলের নির্মাণকাজ শুরু হয়। ১৯৬৫-৬৬ মৌসুমে আনুষ্ঠানিকভাবে চিনি উৎপাদন শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে মিলটি জাতীয়করণ করে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের অধীনে নেওয়া হয়। একসময় এই মিলকে ঘিরে কুষ্টিয়ার অর্থনীতিতে এক বড় কর্মচাঞ্চল্য তৈরি হয়েছিল। আখচাষি, শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, পরিবহনশ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এর সাথে যুক্ত ছিলেন।
তবে সময়ের সাথে লোকসান, অব্যবস্থাপনা ও নানা সংকটে প্রতিষ্ঠানটি মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রায় ৬০৬ কোটি টাকা পুঞ্জীভূত লোকসানের বোঝা নিয়ে ২০২০ সালে এর আখ মাড়াই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে মিল পুনরায় চালুর দাবিতে শ্রমিক-কর্মচারী ও আখচাষিরা বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন, বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছেন। তবে এবার সেই মিলের জমিতেই অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মিল বন্ধের পর সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তায় পড়েছেন এর শ্রমিক-কর্মচারীরা। অনুমোদিত জনবল কাঠামো অনুযায়ী মিলটিতে ১ হাজার ১৩৯টি কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ ছিল। উৎপাদন বন্ধের পর তাদের অধিকাংশই কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। বর্তমানে সীমিতসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলের বিভিন্ন রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছেন। মিলের জমি বেজার কাছে হস্তান্তর করে অর্থনৈতিক অঞ্চল করা হলে এসব শ্রমিক-কর্মচারীর বকেয়া পাওনা কীভাবে পরিশোধ করা হবে, কিংবা তাদের পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থানের কোনো ব্যবস্থা করা হবে কিনা সে প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
মিলের শ্রমিক শাহিন বলেন, মিল বন্ধ হওয়ার পর থেকেই আমরা ঘোর অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি। দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে সংসার চালিয়েছি। এখন যদি মিলের জমিতে নতুন প্রকল্প হয়, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ কী হবে, সেটাই সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয়। সরকারের কাছে আমাদের দাবি, বকেয়া পাওনা পরিশোধের পাশাপাশি আমাদের কর্মসংস্থানের বিষয়টিও বিবেচনা করা হোক। শুধু মিলের শ্রমিক-কর্মচারী নন; আখচাষি, পরিবহনশ্রমিক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীসহ মিলকেন্দ্রিক অর্থনীতির সাথে যুক্ত সর্বস্তরের মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়েও তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আখচাষি সাগর হোসেন বলেন, সুগার মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমরা আখচাষিরাও বড় সমস্যায় পড়েছি। মিল চালু থাকলে আমাদের আখ বিক্রির নিশ্চিত বাজার ছিল। এখন মিলের জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল করার কথা শুনছি। আমরা উন্নয়নের বিপক্ষে নই, তবে আখচাষিদের স্বার্থও দেখতে হবে। সম্ভব হলে মিলটি আধুনিকায়ন করে আবার চালু করা হোক। এতে কৃষক, শ্রমিক এবং কুষ্টিয়ার অর্থনীতি সবাই উপকৃত হবে।
কুষ্টিয়া সুগার মিলের জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় শ্রমিক নেতারা। তাদের দাবি, মিলটি পুরোপুরি বন্ধ করে দিলে এর সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত হাজার হাজার মানুষ স্থায়ীভাবে কর্মসংস্থান হারাবেন। তাই পুরোনো এই প্রতিষ্ঠানকে পুরোপুরি বিলুপ্ত না করে আধুনিকায়নের মাধ্যমে পুনরায় চালু করা উচিত।
এক শ্রমিক নেতা বলেন, এভাবে সুগার মিল বন্ধ করে দিলে হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে যাবে। আমরা চাই, মিলটিকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে আবার চালু করা হোক। কুষ্টিয়া সুগার মিলের পুরোনো যৌবন আবার ফিরিয়ে আনা হোক। এই মিল শুধু একটি কারখানা নয়; এর সাথে কুষ্টিয়ার মানুষের দীর্ঘদিনের আবেগ ও জীবিকা জড়িয়ে আছে। শ্রমিক নেতাদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের মাধ্যমে কুষ্টিয়া সুগার মিলকে আবারও একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সম্ভব।
কুষ্টিয়া সুগার মিলের জমি হস্তান্তর ও অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিষয়ে মিল কর্তৃপক্ষের অবস্থান জানতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমানের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটাই হবে। এর বাইরে আমি আর কিছু বলতে পারি না।
বেজার চিঠি পাওয়ার বিষয়ে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন হাসান বলেন, আমরা একটি চিঠি পেয়েছি। আমাদেরকে সরাসরি বেশি যুক্ত করা হয়নি, যার ফলে বিস্তারিত কিছু জানি না। এটি মন্ত্রণালয় থেকে মন্ত্রণালয় পর্যায়ে কাজ হচ্ছে। জেলা প্রশাসকের বক্তব্য অনুযায়ী, অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিষয়ে মূল প্রক্রিয়াটি বর্তমানে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোর মধ্যেই এগোচ্ছে। ফলে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে এখনো বিস্তারিত পরিকল্পনা বা বাস্তবায়ন কাঠামো পৌঁছায়নি। সরকারের এই নতুন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন কুষ্টিয়ার ব্যবসায়ী মহলের কেউ কেউ।
দি কুষ্টিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক ফুহাদ রেজা ফাহিম বলেন, কুষ্টিয়া অঞ্চলকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার জন্য সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটাকে সাধুবাদ জানাই। নতুন শিল্পাঞ্চল তৈরি হলে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে কুষ্টিয়াবাসীর। তবে মিলের জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল করার তীব্র বিরোধিতা করছেন শ্রমিক ও মিল রক্ষার আন্দোলনের সাথে যুক্ত ব্যক্তিরা।
কুষ্টিয়া সুগার মিল আধুনিকায়ন ও রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবু মনি সাকলাইন এলিন বলেন, কুষ্টিয়া সুগার মিল বাদ দিয়ে অর্থনৈতিক অঞ্চল করার সিদ্ধান্ত একটি সম্পূর্ণ আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। তার দাবি, সুগার মিলকে কেন্দ্র করেই কুষ্টিয়ার শিল্পায়নের বড় একটি ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। আধুনিকায়নের মাধ্যমে মিলটি পুনরায় চালু করে পাশে নতুন শিল্প গড়ে তোলা হলে সরকার আরও বেশি লাভবান হতে পারে।
কুষ্টিয়ার সচেতন নাগরিক মজিবুল শেখ বলেন, সুগার মিলের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানকে ধরে রাখার আবেগ যেমন আছে, তেমনি কুষ্টিয়ায় নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থান তৈরির প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। সরকার যদি মনে করে অর্থনৈতিক অঞ্চল হলে কুষ্টিয়ার অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে, তাহলে সেটি অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে এই উন্নয়ন যেন পুরোনো শ্রমিক-কর্মচারী, আখচাষি ও স্থানীয় মানুষের স্বার্থকে উপেক্ষা করে না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
সম্ভব হলে মিলের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে নতুন শিল্পের সুযোগ তৈরি করা উচিত। এতে উন্নয়নও হবে, আবার কুষ্টিয়ার পুরোনো শিল্পের স্মৃতিও মুছে যাবে না। কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্যসচিব প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকারও মিলটি আধুনিকায়নের মাধ্যমে পুনরায় চালুর পক্ষে মত দেন। তিনি বলেন, পুরোনো এই কারখানাটি চিরতরে বন্ধ না করে আধুনিক প্রযুক্তি ও সুব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এটিকে পুনরায় লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সম্ভব।









