মীর মোশাররফ হোসেন মাধ্যমিক বিদ্যালয়
বিশেষ প্রতিনিধি॥ ১৩ জন শিক্ষক কর্মরত, শিক্ষার্থী ৩০০-এর বেশি। কাগজে-কলমে এমন চিত্র থাকলেও শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি অত্যন্ত কম। কুষ্টিয়া শহরের কোর্টপাড়ায় অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী সাহিত্যিক মীর মোশাররফ হোসেন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সরেজমিনে নবম শ্রেণিতে ৩৬ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে উপস্থিত পাওয়া গেছে মাত্র দুজনকে। দশম শ্রেণির ২৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে সেদিন শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত ছিল না একজনও। শিক্ষার্থীদের এমন অনুপস্থিতি, পড়াশোনার মান এবং শিক্ষকদের নিয়মিত পাঠদান নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী থাকলেও নিয়মিত পাঠদান ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না। ফলে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসার আগ্রহ কমে যাওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।
১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি একসময় সুনামের সঙ্গে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করলেও বর্তমানে শ্রেণিকক্ষের এমন চিত্র অভিভাবক ও স্থানীয় শিক্ষানুরাগীদের ভাবিয়ে তুলেছে। তাঁদের প্রশ্ন, পর্যাপ্ত শিক্ষক থাকার পরও কেন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি এত কম? শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির পেছনে পারিবারিক আর্থিক সংকট, আসন্ন পূজার ছুটি কিংবা একই এলাকায় একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতার ভূমিকা থাকলেও পাঠদানের পরিবেশ ও শিক্ষার মান নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগ উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়াতে মাঝেমধ্যে অভিভাবকদের ফোন করা এবং মাসে দুবার অভিভাবক সভার আয়োজন করা হয় বলে জানিয়েছেন প্রধান শিক্ষক। তবে অভিভাবকদের প্রত্যাশা, উপস্থিতি বাড়ানোর উদ্যোগের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় আগ্রহী করে তোলার বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বিদ্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ষষ্ঠ শ্রেণিতে মোট ১১২ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এর মধ্যে হরিপুরের সূর্য নিকেতন নামের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৯৩ জন শিক্ষার্থী অন্তর্ভুক্ত বলে জানানো হয়েছে। তারা ওই প্রতিষ্ঠানেই ক্লাস করে, শুধু চূড়ান্ত পরীক্ষা দেয় মীর মোশাররফ হোসেন মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে। ফলে বিদ্যালয়টির নিজস্ব ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ১৯ জন। তাদের মধ্যে প্রতিদিন ছয় থেকে সাতজন উপস্থিত থাকে বলে জানা গেছে।
সপ্তম শ্রেণিতে ২৬ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে সরেজমিনে উপস্থিত পাওয়া গেছে ১৩ জনকে। অষ্টম শ্রেণিতে ৩৬ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে নিয়মিত ১২ থেকে ১৭ জন উপস্থিত থাকে বলে জানা গেছে। নবম শ্রেণিতে ৩৬ জনের বিপরীতে উপস্থিত ছিল মাত্র দুজন। আর দশম শ্রেণির ২৮ জন শিক্ষার্থীর কাউকেই সেদিন শ্রেণিকক্ষে পাওয়া যায়নি।
এই হিসাব অনুযায়ী, ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৩৮ জন। অন্যদিকে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মীর ফিরোজা বুলবুল জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটিতে মোট শিক্ষার্থী ৩০০ এর বেশি। শ্রেণিভিত্তিক এই হিসাব এবং প্রধান শিক্ষকের দেওয়া মোট শিক্ষার্থীসংখ্যার মধ্যে পার্থক্যও আলোচনায় এসেছে।
অভিভাবকদের মতে, শুধু ভর্তি রেজিস্টারে শিক্ষার্থীর সংখ্যা থাকলেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাফল্য নিশ্চিত হয় না। শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাস করছে কি না, পাঠ বুঝতে পারছে কি না এবং পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল করছে কি না এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের এমন কম উপস্থিতি প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রমের বাস্তব চিত্র নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আবিরা জানায়, সামনে পূজার ছুটি থাকায় অনেকে বিদ্যালয়ে আসছে না। তার ভাষ্য, ছুটির সময় হওয়ায় সবাই আসছে না। সাধারণ সময়েও তাদের শ্রেণিতে মোটামুটি ছয় থেকে সাতজন শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকে।
ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী নোমান জানায়, তাদের শ্রেণিতে বিদ্যালয়ের নিজস্ব শিক্ষার্থী ১৯ জন। এর মধ্যে প্রতিদিন ছয় থেকে সাতজন উপস্থিত থাকে।
শিক্ষার্থীদের বক্তব্যে ছুটির প্রভাবের বিষয়টি উঠে এলেও সাধারণ সময়েও নবম শ্রেণিতে ছয়-সাতজনের উপস্থিতির তথ্য নিয়মিত অনুপস্থিতির প্রশ্নকে সামনে এনেছে। অভিভাবকদের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যাওয়ার বিষয়টি কেবল ছুটির কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না, পড়াশোনার পরিবেশ ও বিদ্যালয়ের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
বিদ্যালয়ের সহকারী ইংরেজি শিক্ষক সুচিত্রা বলেন, শিক্ষার্থী বেশি থাকলে শিক্ষকদের ভালো লাগে। কিন্তু একই এলাকায় অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকায় তাঁদের প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। একই গলিতে এতগুলো স্কুল থাকায় বিদ্যমান শিক্ষার্থী নিয়েই তাঁরা এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা মীর মোশাররফ হোসেন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি থাকলেও সেখানে ক্লাস না করে শুধু পরীক্ষা দেয়—এমন প্রশ্নের জবাবে সুচিত্রা বলেন, এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষক প্রতিনিধিরা ভালো বলতে পারবেন।
বিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানের শিক্ষিকা শিউলী খাতুন বলেন, তাঁদের বিদ্যালয়ে দরিদ্র পরিবারের অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। কেউ কেউ আর্থিক সমস্যার কারণে নিয়মিত আসতে পারে না। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়াতে মাঝেমধ্যে অভিভাবকদের ফোন দেওয়া হয়। তারপরও অনেকে বিদ্যালয়ে আসে না।
শিক্ষকদের বক্তব্যে স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা এবং শিক্ষার্থীদের পারিবারিক আর্থিক সংকটের বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে অভিভাবকদের দাবি, শিক্ষার্থীদের আর্থিক ও পারিবারিক সমস্যার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের পাঠদানের পরিবেশও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, মানসম্মত শিক্ষা ও নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসার আগ্রহ বাড়তে পারে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মীর ফিরোজা বুলবুল বলেন, তাঁদের বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ৩০০ এর বেশি। কিন্তু শিক্ষার্থীরা ক্লাসে আসতে চায় না। উপস্থিতি বাড়াতে মাঝেমধ্যে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ফোন করা হয়। পাশাপাশি অভিভাবকদের নিয়ে মাসে দুবার সভা করা হয়।
প্রধান শিক্ষকের বক্তব্যে শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে অভিভাবকদের অভিযোগ, শুধু ফোন করা কিংবা সভা আয়োজনের মধ্যেই উদ্যোগ সীমাবদ্ধ থাকলে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসবে না। তাঁরা চান, শিক্ষার্থীরা কেন নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসছে না, কোন বিষয়ে তাদের দুর্বলতা রয়েছে এবং পাঠদানের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়ার কারণ কী—এসব বিষয় নিয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আরও কার্যকর ভূমিকা নিক।
অভিভাবকদের মতে, একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নির্ভর করে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে পাঠদান আকর্ষণীয় করা, দুর্বল শিক্ষার্থীদের বাড়তি সহযোগিতা দেওয়া এবং নিয়মিত পড়াশোনার অগ্রগতি মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির হিসাব অনুযায়ী শিক্ষার্থীসংখ্যা ২৩৮ জন। তবে প্রধান শিক্ষক জানিয়েছেন, বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ৩০০-এর বেশি। এদিকে ষষ্ঠ শ্রেণির ১১২ জনের মধ্যে ৯৩ জন অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে ক্লাস করে বলে বিদ্যালয় থেকে জানানো হয়েছে।
এ নিয়ে অভিভাবকদের প্রশ্ন, অন্য প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ক্লাস করা শিক্ষার্থীদের ভর্তি ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ব্যবস্থাটি কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং বিদ্যালয়ের প্রকৃত শিক্ষার্থীসংখ্যার সঙ্গে শ্রেণিভিত্তিক হিসাবের পার্থক্য কেন রয়েছে। তাঁদের দাবি, শিক্ষার্থীসংক্রান্ত তথ্যের স্বচ্ছতা থাকা জরুরি, যাতে বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে অভিভাবকদের আস্থা বজায় থাকে।
অভিভাবকদের প্রত্যাশা, বিদ্যালয়ের ভর্তি রেজিস্টার, শ্রেণিভিত্তিক শিক্ষার্থীসংখ্যা, শিক্ষক উপস্থিতি ও পাঠদানের বাস্তব চিত্রের মধ্যে যেন সামঞ্জস্য থাকে। এতে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম সম্পর্কে অভিভাবকদের আস্থা বাড়বে এবং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করার উদ্যোগও ফলপ্রসূ হবে।
অন্যদিকে, বিদ্যালয়ের খেলার মাঠজুড়ে কাশবন জন্মানোর দৃশ্যও প্রতিষ্ঠানটির পরিচর্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, শরীরচর্চা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অথচ মাঠের এমন অবস্থা বিদ্যালয়ের সামগ্রিক পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে।
অভিভাবকদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু পাঠদানের জায়গা নয়। শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশেরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, খেলাধুলার সুযোগ এবং শিক্ষকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা সব মিলিয়েই একটি কার্যকর শিক্ষার পরিবেশ গড়ে ওঠে। তাই বিদ্যালয়ের মাঠের পরিচর্যা ও সার্বিক পরিবেশ উন্নয়নেও কর্তৃপক্ষের মনোযোগ প্রত্যাশা করছেন তাঁরা।
১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত মীর মোশাররফ হোসেন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ১৩ জন শিক্ষক কর্মরত থাকার পরও নবম শ্রেণিতে মাত্র দুজন এবং দশম শ্রেণিতে কোনো শিক্ষার্থী উপস্থিত না থাকার ঘটনা অভিভাবকদের উদ্বিগ্ন করেছে। তাঁদের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং মানসম্মত পাঠদানের পরিবেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
অভিভাবকদের দাবি, বিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্লাস নেওয়া, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং শ্রেণিকক্ষ ও মাঠের পরিবেশ উন্নয়নে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীসংক্রান্ত তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তাঁরা।
অন্যদিকে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, শিক্ষার্থীরা ক্লাসে আসতে চায় না এবং উপস্থিতি বাড়াতে অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সভা করা হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থী উপস্থিতির সংকট মোকাবিলায় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ এবং অভিভাবকদের প্রত্যাশার মধ্যে সমন্বয় এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।









