বিশেষ প্রতিনিধি ॥ জনগণের স্বার্থ বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি আবেদন করেছে কুষ্টিয়া জেলা বিএনপি। কুষ্টিয়া চিনিকলকে অর্থনৈতিক অঞ্চলে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ পুনর্বিবেচনা করে প্রতিষ্ঠানটির মাড়াই কার্যক্রম পুনরায় চালুর দাবি জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রী বরাবর আবেদন করেছে দলটির জেলা শাখার সদস্য সচিব ইঞ্জিনিয়ার জাকির হোসেন সরকার।
আবেদনে চিনিকলটির বিদ্যমান অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি আধুনিকায়নের মাধ্যমে উৎপাদন কার্যক্রম পুনরায় চালু করে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ইঞ্জিনিয়ার জাকির হোসেন সরকারের স্বাক্ষরিত দলীয় প্যাডে আবেদনে বলা হয়, ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত কুষ্টিয়া চিনিকল এ অঞ্চলের একটি ঐতিহ্যবাহী সরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় কৃষক, শ্রমিক-কর্মচারী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। তবে ২০১৯-২০ মাড়াই মৌসুমের পর থেকে চিনিকলটির মাড়াই কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন-জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আবেদনে উল্লেখ করা হয়, কুষ্টিয়া চিনিকলের বার্ষিক আখ মাড়াই সক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন। এ সক্ষমতা অনুযায়ী বছরে প্রায় ১৫ হাজার ২৪০ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। চিনিকলটিতে একসময় ১ হাজার ৮৮ জন শ্রমিক-কর্মচারী সরাসরি কর্মরত ছিলেন। এ ছাড়া কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ ও রাজবাড়ী জেলার প্রায় ১৮ হাজার একর জমিতে আখচাষ এবং প্রায় ৭ হাজার আখচাষি ও তাঁদের পরিবার প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। সব মিলিয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় দেড় লাখ মানুষ চিনিকলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে আবেদনে দাবি করা হয়েছে।
চিনিকলটি বন্ধ থাকায় আখচাষে কৃষকদের আগ্রহ কমছে এবং কিছু এলাকায় তামাক চাষ বাড়ছে বলে আবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এতে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও তুলে ধরা হয়েছে। জেলা বিএনপির মতে, চিনিকলটি পুনরায় চালু করা গেলে আখচাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়বে, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি সচল হবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
চিনিকলটি পুনরুজ্জীবিত করার প্রস্তাবে বলা হয়েছে, নতুন করে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার পরিবর্তে বিদ্যমান স্থাপনা, যন্ত্রপাতি ও জনবল আধুনিকায়নের মাধ্যমে উৎপাদন শুরু করা হলে সরকারি সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব। এ জন্য বিএমআরই (আধুনিকায়ন, পুনর্বাসন ও সম্প্রসারণ) কার্যক্রম বাস্তবায়ন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, মানসম্মত আখ সরবরাহ এবং উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আবেদনে চিনির পাশাপাশি আখের রস, লাল চিনি ও গুড় উৎপাদন, আখের ছোবড়া থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, চিটাগুড় থেকে ইথানল ও শিল্পে ব্যবহৃত অ্যালকোহল উৎপাদন, আধুনিক ডিস্টিলারি ও কোজেনারেশন পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপন এবং প্রেসমাড থেকে জৈব সার উৎপাদনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে চিনিকলের উপজাত বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করে অতিরিক্ত রাজস্ব আয় এবং কৃষিভিত্তিক শিল্প সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আবেদনে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলায় ৩১২ একর জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের উদ্যোগের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। জেলা বিএনপির দাবি, ওই অর্থনৈতিক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ থাকলেও এখনো দৃশ্যমান কার্যক্রম দেখা যায়নি। এ অবস্থায় কুষ্টিয়া চিনিকলের জমি ও অবকাঠামো নতুন করে অর্থনৈতিক অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত করা হলে বিদ্যমান উদ্যোগের সঙ্গে কার্যক্রমের পুনরাবৃত্তি এবং সরকারি সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।
জেলা বিএনপি মনে করে, কুষ্টিয়া চিনিকলের জমি ও অবকাঠামো চিনিশিল্পের পুনরুজ্জীবন, কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃষি উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং স্থানীয় জনগণের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষেত্রে আখচাষি, শ্রমিক-কর্মচারী ও স্থানীয় জনগণের স্বার্থ বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
এ পরিপ্রেক্ষিতে কুষ্টিয়া চিনিকলকে অর্থনৈতিক অঞ্চলে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব পুনর্বিবেচনা করে এ উদ্যোগ থেকে বিরত থাকা এবং বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) তত্ত্বাবধানে চিনিকলটির মাড়াই কার্যক্রম পুনরায় চালুর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছে কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতা জাকির হোসেন সরকার।









