কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

কুষ্টিয়ায় ট্রেনে কাটা পড়া মরদেহের তড়িঘড়ি দাফন, তদন্তের দাবিতে মানববন্ধন

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ায় ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত এক তরুণের পরিচয় না জেনেই ৫ ঘণ্টার মধ্যে ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে দাফন করা নিয়ে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে নিহতের বাড়ির দূরত্ব মাত্র কয়েক মিনিটের হলেও পুলিশ কেন পরিচয় বের করতে পারল না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম রহস্য। এ ঘটনায় মরদেহ শনাক্ত ও দাফন প্রক্রিয়ায় গাফিলতির অভিযোগ তুলে তদন্তসহ ৬ দফা দাবিতে জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি প্রদান ও মানববন্ধন করেছেন স্বজন ও এলাকাবাসী। গতকাল সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টায় কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

এতে নিহত আল আমিনের স্বজনসহ স্থানীয় বাসিন্দারা অংশ নেন। মানবববন্ধন শেষে তারা জেলা প্রশাসক বরাবর ৬ দফা দাবিসংবলিত স্মারকলিপি পেশ করেন। নিহত আল আমিন কুষ্টিয়া শহরের হরিশংকরপুর মোল্লা পাড়া এলাকার মিলন মোল্লার ছেলে। গত মঙ্গলবার বিকাল ৪টায় কুষ্টিয়া পৌর গোরস্থানে তার মরদেহটি বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করে রেলওয়ে পুলিশ। নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর অন্যের মোবাইলে থাকা ছবি দেখে রেললাইনে পড়ে থাকা মরদেহটি নিজের ছেলের বলে শনাক্ত করেন বাবা-মা। কিন্তু ততক্ষণে তাকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়ে গেছে। বিষয়টি নিয়ে কুষ্টিয়ায় চরম ক্ষোভ ও প্রশ্ন উঠেছে।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, একজন তরুণ নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবার যখন তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছিল, ঠিক তখনই তার মরদেহ রেললাইনের পাশে পড়ে ছিল। পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে আইনি প্রক্রিয়া শেষে তড়িঘড়ি বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করে। কিন্তু সামান্য চেষ্টা করলেই তার পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হতো। স্বজনদের প্রশ্ন—নিখোঁজ ব্যক্তির বিষয়ে কোনো সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে কি না, আশপাশের এলাকায় কেউ নিখোঁজ রয়েছে কি না, কিংবা স্থানীয়দের ছবি দেখিয়ে পরিচয় নিশ্চিতের চেষ্টা করা হয়েছিল কি না—তা না দেখেই কীভাবে এত দ্রুত দাফন করা হলো?

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টার দিকে পরিবারের ওপর রাগ করে বাড়ি থেকে বের হন আল আমিন। তিনি কিছুটা মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। আগেও রাগ করে বের হয়ে আবার ফিরে আসতেন। তবে ওইদিন বের হওয়ার পর তিনি আর ফেরেননি। স্বজনরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজির পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার নিখোঁজের তথ্য প্রচার করেন। পরিবারের দাবি, একই দিন বেলা ১১টার দিকে কুষ্টিয়ার দবির মোল্লা গেট এলাকায় ট্রেনে কাটা পড়ে এক তরুণের মৃত্যু হয়। কিন্তু সেই মৃত ব্যক্তিই যে নিখোঁজ আল আমিন, তা পরিবার জানতে পারে দুই দিন পর।

বৃহস্পতিবার পরিবারের সদস্যরা এক ভ্যানচালকের মাধ্যমে দবির মোল্লা গেটের দুর্ঘটনার বিষয়টি জানতে পারেন। খবর পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে যান এবং স্থানীয়দের মোবাইলে থাকা ছবি দেখে মরদেহটি আল আমিনের বলে নিশ্চিত হন। পরে রেলওয়ে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জানতে পারেন, মরদেহটি আগেই বেওয়ারিশ দাফন করা হয়ে গেছে। নিহতের বাবা মিলন মোল্লার অভিযোগ, ঘটনাস্থল থেকে তাদের বাড়ি মাত্র কয়েক মিনিটের দূরত্বে। সেদিন যদি আশপাশের এলাকায় পুলিশ সামান্য খোঁজ নিত, তবেই পরিবারের সন্ধান পাওয়া যেত। তিনি প্রশ্ন তোলেন, মানুষ নিখোঁজ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মারা গেল, আর বাড়িও কাছে—তারপরও কেন পরিচয় মিলল না? সাধারণত এমন মরদেহ অন্তত কিছুদিন সংরক্ষণ করে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করা হয়, কিন্তু আমার ছেলের ক্ষেত্রে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সব শেষ করে দেওয়া হলো।

আল আমিনের ফুপাতো ভাই অন্তর বলেন, আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিখোঁজের তথ্য দিয়েছিলাম। রেললাইনে অজ্ঞাত তরুণের মরদেহ উদ্ধারের খবরটি যদি পুলিশ স্থানীয়ভাবে মাইকিং বা প্রচার করত, তবে পরিবার আগে থেকেই জানতে পারত। অভিযোগের বিষয়ে কুষ্টিয়া রেলওয়ে ফাঁড়ির উপ-পরিদর্শক (এসআই) নুরুল ইসলাম জানান, মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। নিহতের পরিচয় শনাক্তের জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা করা হয়েছিল। পরিবারকে না পাওয়া এবং কুষ্টিয়ায় মরদেহ সংরক্ষণের (হিমাগার) ব্যবস্থা না থাকায় আইনি প্রক্রিয়া মেনে ময়নাতদন্ত শেষে দ্রুত দাফন করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের বক্তব্য—ঘটনার পর রেল পুলিশ মাইকিং করেছিল কি না, গণমাধ্যম বা সামাজিক মাধ্যমে ছবি প্রকাশ করেছিল কি না এবং নিখোঁজ তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছিল কি না, তা গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।

স্থানীয় বাসিন্দা শামসুল বলেন, মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মরদেহটি কীভাবে বেওয়ারিশ হয়ে গেল, তার নেপথ্যে কোনো রহস্য আছে কি না তা জানা দরকার। তদন্ত ছাড়া কাউকে দায়ী করা ঠিক নয়, তবে দায়িত্বে গাফিলতি থাকলে তা অবশ্যই সামনে আনা উচিত। পরিবার জানিয়েছে, সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে তারা আরও কঠোর কর্মসূচি দেবেন। এ বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন হাসান জানান, বিষয়টি খতিয়ে দেখে আইনগতভাবে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Tags :

কুষ্টিয়া জেলা নিউজ ডেক্স, কুষ্টিয়া জিলাইভ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর