কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

ওস্তাদ আব্দুল জব্বার: কুষ্টিয়ার কৃতি সন্তান এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সুরের জাদুকর

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের ক্ষেত্রটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অবরুদ্ধ বাঙালির মনে মুক্তির আগুন জ্বালিয়ে দিতে যে কজন কণ্ঠসৈনিক জীবন বাজি রেখে কাজ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে ওস্তাদ আব্দুল জব্বার ছিলেন অন্যতম। বৃহত্তর কুষ্টিয়া অঞ্চলের কৃতি সন্তান এই কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী কেবল একজন প্রতিভাবান গায়কই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একাত্তরের রণাঙ্গনে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সুরের জাদুকর। তাঁর কণ্ঠের জাদুকরী তান ও অদম্য দেশপ্রেম কোটি কোটি বাঙালিকে মুক্তিসংগ্রামে উজ্জীবিত করেছিল।

জন্ম, পারিবারিক শেকড় ও সংগীতের হাতেখড়ি

কুষ্টিয়া অঞ্চলে আবহমানকাল ধরেই লোকসংস্কৃতি ও ধ্রুপদী সঙ্গীতের এক সুগভীর চর্চা রয়েছে। এই উর্বর জনপদে জন্মগ্রহণ করা আব্দুল জব্বারের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে সুর ও লয়ের পরিমণ্ডলে। পরিবারের প্রথাগত সংগীতানুরাগ এবং স্থানীয় ওস্তাদদের সান্নিধ্যে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা ও সংগীতের হাতেখড়ি হয়।
শৈশবেই তাঁর কণ্ঠে সুরের যে মূর্ছনা লক্ষ্য করা গিয়েছিল, তা পরবর্তীতে তাঁকে দেশের অন্যতম প্রধান সংগীত ব্যক্তিত্বে পরিণত করে। কুষ্টিয়ার মাটি এবং বাউল-ফকিরের আধ্যাত্মিক আবহ তাঁর কণ্ঠের গায়কী ঢঙে এক বিশেষ গভীরতা যোগ করেছিল, যা তাঁকে সাধারণ গায়কদের থেকে আলাদা করেছিল।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ও মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো

১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চ মাসে যখন সমগ্র বাঙালি জাতি পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে প্রস্তুত হচ্ছিল, ঠিক সেই ক্রান্তিলগ্নে আব্দুল জব্বার কুষ্টিয়া থেকে ঢাকা হয়ে রণাঙ্গনের প্রস্তুতিতে অংশ নেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে পৌঁছান এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দেন।
মুক্তির গান ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ভূমিকা
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত গানগুলো ছিল যুদ্ধকালীন সময়ে মুক্তিকামী মানুষের প্রধান মানসিক শক্তি।
  • হৃদয়ছোঁয়া সুর: শত্রুর কামানের গোলার বিপরীতে তাঁর কণ্ঠের দেশাত্মবোধক গানগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে এবং অবরুদ্ধ দেশের ভেতরে তীব্র আশার সঞ্চার করত।
  • সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ: রেডিওর মাধ্যমে যখন তাঁর কণ্ঠে দেশপ্রেমের গান বাজত, তখন পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়ত। এটি ছিল এক নীরব কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী সাংস্কৃতিক অস্ত্র।

কালজয়ী গান এবং বাংলা সংগীতাঙ্গনে অবদান

ওস্তাদ আব্দুল জব্বারের গাওয়া অসংখ্য গান আজও বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে অম্লান হয়ে আছে। তাঁর কণ্ঠের বৈচিত্র্য এবং সুরের ওপর নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ তাঁকে বাংলা গানের জগতে অনন্য উচ্চতায় আসীন করেছিল।
দেশাত্মবোধক ও আধুনিক গানের মেলবন্ধন
তিনি কেবল দেশাত্মবোধক গানই নয়, আধুনিক বাংলা গান, নজরুল সংগীত এবং লোকগানেও সমান পারদর্শী ছিলেন।
  • চিরস্মরণীয় সৃষ্টি: তাঁর গাওয়া অসংখ্য জনপ্রিয় গান আজ স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
  • কণ্ঠের ব্যঞ্জনা: তাঁর গায়কী শৈলীতে যে দরদ ও আবেগ ছিল, তা সরাসরি শ্রোতার আত্মাকে ছুঁয়ে যেত। গানের প্রতিটি শব্দের অর্থ ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর জুড়ি মেলা ভার ছিল।

রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সম্মাননা

জাতির জন্য অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ওস্তাদ আব্দুল জব্বার জীবনদ্দশায় বহু মর্যাদাপূর্ণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
  • সঙ্গীতের ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের জন্য তাঁকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করা হয়।
  • এছাড়াও তিনি অসংখ্য সাংস্কৃতিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আজীবন সম্মাননা লাভ করেন, যা তাঁর দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য সংগীত সাধনার এক যোগ্য মূল্যায়ন।

শেষ জীবন ও চিরন্তন উত্তরাধিকার

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সংগীত সাধনা এবং দেশের নতুন প্রজন্মের মাঝে সুরের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে নিজেকে যুক্ত রেখেছিলেন। ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে এই মহান কণ্ঠশিল্পী না ফেরার দেশে চলে যান। তবে তাঁর সৃষ্টি করা গান এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সোনালী অধ্যায়ে তাঁর অবদান তাঁকে অমর করে রেখেছে।
কুষ্টিয়ার কৃতি সন্তান হিসেবে ওস্তাদ আব্দুল জব্বার শুধু নিজ জেলারই গৌরব বাড়াননি, বরং সমগ্র বাঙালি জাতির সাংস্কৃতিক মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিল্পীরা যখনই দেশপ্রেম ও সুরের সাধনার কথা ভাববেন, ওস্তাদ আব্দুল জব্বারের জীবন ও কর্ম তাঁদের জন্য চিরকাল পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে।
Tags :

ফিচার ডেস্ক, কুষ্টিয়া জিলাইভ

সর্বশেষ খবর