কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

কুষ্টিয়ায় কোটি টাকার মাদক জব্দ হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে মূল হোতারা

নিজস্ব প্রতিবেদক: কুষ্টিয়া দিন দিন মাদক পাচারকারীদের এক ‘নিরাপদ রুটে’ পরিণত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে প্রায়ই উদ্ধার হচ্ছে কোটি কোটি টাকার মাদকের বড় চালান। কিন্তু আড়ালেই থেকে যাচ্ছেন এসব চালানের মূল হোতা ও মাদক কারবারিরা। অরক্ষিত সীমান্ত দিয়ে আসা এসব মাদক সহজেই রেল কিংবা সড়কপথে পৌঁছে যাচ্ছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
অরক্ষিত সীমান্ত ও পাচারের রুট:
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় ভারতের সঙ্গে ৪৬ কিলোমিটার সীমানা রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১৮ কিলোমিটার অংশে কাঁটাতারের বেড়া থাকলেও, বাকি ২৮ কিলোমিটার সীমান্ত পুরোপুরি অরক্ষিত ও উন্মুক্ত। স্থানীয়দের দাবি, এই অরক্ষিত সীমান্ত দিয়েই প্রতিদিন দেশে ঢুকছে বিপুল পরিমাণ মাদক। সীমান্ত পার হওয়ার পর খুব সহজেই তা ট্রেন ও বিভিন্ন যানবাহনে করে দেশের অন্যান্য স্থানে পাচার করা হচ্ছে।
বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ, কিন্তু আসামি নেই:
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) দেওয়া তথ্যানুযায়ী, গত বছরের শেষ ৬ মাসেই কুষ্টিয়ায় প্রায় ৫০ কোটি টাকা মূল্যের মাদকের চালান জব্দ করা হয়েছে।
  • গত ১৫ ডিসেম্বর কুষ্টিয়ার পোড়াদহ স্টেশনে ‘বেনাপোল এক্সপ্রেস’ ট্রেনে অভিযান চালিয়ে ৬ কোটি টাকার এলএসডি (LSD) মাদক জব্দ করে বিজিবি।
  • এর ঠিক দেড় মাস আগে একই ট্রেন থেকে আরও ১১ কোটি টাকার এলএসডি উদ্ধার করা হয়।
  • এছাড়া প্রতিনিয়তই সড়কপথে ইয়াবাসহ অন্যান্য ভয়ংকর মাদকের চালান জব্দ করা হচ্ছে।
বিজিবির তথ্যমতে, গত তিন মাসে পরিচালিত অভিযানে প্রায় ২০ কোটি টাকার মাদক জব্দ হয়েছে। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো, এত বড় বড় চালান ধরা পড়লেও এসব ঘটনায় পুলিশ কাউকেই আটক করতে পারেনি বা মূল কারবারিদের আইনের আওতায় আনতে পারেনি।
উদ্বিগ্ন স্থানীয় ও সচেতন মহল:
মাদকের এই অবাধ আগ্রাসনে চরম উদ্বিগ্ন স্থানীয় বাসিন্দারা। এক স্থানীয় যুবক হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “আশপাশের সীমান্ত দিয়ে অবাধে মাদক আসায় আমাদের যুবসমাজ ধ্বংসের মুখে পতিত হচ্ছে।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বিশাল সব চালান ধরা পড়ছে, অথচ যারা এর সাথে জড়িত তারা কেন গ্রেপ্তার হচ্ছে না? প্রশাসনের যে অসাধু অংশটা মাদক কারবারিদের এই সুযোগ করে দিচ্ছে, আমরা তাদেরও আইনের আওতায় দেখতে চাই।”
কুষ্টিয়ার সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সদস্য মিজানুর রহমান লাকি বলেন, “মাদকের এই ওপেন বিক্রি যদি প্রশাসন বন্ধ করতে না পারে, তাহলে শুধু অভিভাবকরা সচেতন হয়ে কী করবেন? মাদকের এই ব্যাপ্তি যদি এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে আগামী দিনে এটি আরও ভয়াবহ ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।”
প্রশাসনের ভাষ্য:
মাদক কারবারিদের ধরতে না পারার বিষয়ে পুলিশের দাবি, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগ’ না থাকায় কাউকে আটক করা সম্ভব হচ্ছে না।
অন্যদিকে, মাদক পাচার রোধে বিজিবির অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। বিজিবি-৪৭ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহবুব মুর্শেদ রহমান বলেন, “সীমান্তবর্তী এলাকা এবং অন্যান্য অঞ্চলে বসবাসকারী সাধারণ মানুষকে নিয়ে যদি আমরা সম্মিলিতভাবে একটি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারি, তবেই এ ধরনের বেআইনি ও অন্যায় প্রচেষ্টাকে আমরা পুরোপুরি নস্যাৎ করতে সক্ষম হবো।”
মাদকের বড় চালান ধরা পড়লেও আসামিদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকার এই বিষয়টি নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষ ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। দ্রুত মূল হোতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা না গেলে মাদকের এই ভয়াবহ আগ্রাসন থামানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
Tags :

Desk Reporter

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর