বিশেষ প্রতিনিধি ॥ সংসারের কাজের পাশাপাশি আঙিনায় কেঁচো-গোবরের সার বানিয়ে ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়েছেন কুষ্টিয়ার সাত হাজারেরও বেশি নারী। সদর উপজেলার ঘরে ঘরে গড়ে ওঠা সাত হাজারেরও বেশি প্ল্যান্ট থেকে প্রতিবছর মিলছে ৬৮ লাখ ৮৬ হাজার কেজি জৈবসার। রাসায়নিক সারের সংকট মেটানোর পাশাপাশি বাড়তি আয় আর পরিবেশবান্ধব কৃষির এই মডেল জেলাজুড়ে বেশ সাড়া ফেলেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিকল্পিত উদ্যোগ ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা মিললে এ সার উৎপাদন যেমন বাড়বে, তেমনি রাসায়নিক সারের ওপর কৃষকদের নির্ভরতাও অনেকাংশে কমে আসবে।
দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম কৃষিপ্রধান জেলা কুষ্টিয়ায় দিন দিন রাসায়নিক সারের ব্যবহার বাড়ছে। এ অঞ্চলে বেশিরভাগই দুই ও তিন ফসলি জমি। অতিরিক্ত দাম ও সার সংকটে দিশেহারা এ অঞ্চলের কৃষকরা। ঠিক সেই মুহূর্তে রাসায়নিক সারের বিকল্প হিসেবে নিজ নিজ বাড়িতে জৈবসার উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছেন কৃষকরা।
কেঁচো আর বাড়িতে পালন করা গরুর গোবর দিয়ে ছোট ছোট প্ল্যান্টে তৈরি করা হচ্ছে জৈবসার। রাসায়সিক সারের বিকল্প হিসেবে জমিতে জৈবসার প্রয়োগ করে ভালো ফলন পাওয়ায় দিন দিন এই সার উৎপাদনে আগ্রহী হয়ে উঠছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা।
সদর উপজেলার বিত্তিপাড়া গ্রামের জৈবসার উৎপাদনকারী নারী উদ্যোক্তা মনিরা খাতুন জানান, রাসায়নিক সারের চাইতে জৈবসার ব্যবহারে ফসল উৎপাদন বেশি হয়। ঘরে ঘরে জৈবসার উৎপাদনের পর থেকে গ্রামের মানুষ আগের তুলনায় কম রাসায়নিক সার ব্যবহার করছেন। জৈবসার ব্যবহার করে তারা বাড়ির আঙিনায় মরিচ, বেগুনসহ নানা সবজি ফলাচ্ছেন। মাঠে ধান, ভুট্টা, শসা, মরিচ, বেগুনের ক্ষেতেও তাদের বাড়িতে উৎপাদিত সার ব্যবহার হচ্ছে।
সদর উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, গোবর, কেঁচো, ফসলের অবশিষ্টাংশ, খড়কুটা, পচনশীল উদ্ভিদজাত বর্জ্যসহ বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করে গ্রামের প্রায় প্রতিটি ঘরে তৈরি হচ্ছে জৈবসার। বাড়িতে বাড়িতে কৃষকরা নিজ উদ্যোগে তৈরি করে নিয়েছেন সার তৈরির ছোট ছোট এসব কারখানা। প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় ১০টি চাকের মধ্যে উৎপাদন করা হচ্ছে জৈবসার।
কৃষকরা জানান, এসব চাক থেকে প্রতিমাসে ১০-১২ মণ সার উৎপাদন হচ্ছে। কিছু কিছু বাড়িতে সরকারি উদ্যোগে ভার্মি কম্পোস্ট ও ট্রাইকো কম্পোস্ট সারের প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে। সরকারি এই প্ল্যান্ট দেখে কৃষকরা নিজ উদ্যোগে নিজ নিজ বাড়ির আঙিনায় শুরু করেছেন জৈবসারের উৎপাদন।
সদর উপজেলার উজানগ্রাম, আব্দালপুর ও কাঞ্চনপুর ইউনিয়নের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে কেঁচো ও গোবর থেকে সার তৈরির তথ্য উঠে এসেছে। আর এসব জৈবসার উৎপাদনের উদ্যোক্তাদের বেশিরভাগই হচ্ছেন নারী। প্রায় সাত হাজারেরও বেশি নারী এই সার উৎপাদনের কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। নারীদের কাছে আয়ের একটি বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে সার উৎপাদন।
উদ্যোক্তা এসব নারীরা বলছেন, বাড়ির কাজের পাশাপাশি তারা জৈবসার তৈরির কাজ করছেন। নিজেদের জমিতে এই সার ব্যবহার করে ভালো ফলন পাচ্ছেন। আর বাড়তি সার বিক্রি করছেন ১৫ টাকা কেজি দরে। এতে বাড়তি আয় হচ্ছে তাদের।
নারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সার বিক্রি করে প্রায় প্রতিটি পরিবারের গৃহবধূরা ৩-৫ হাজার টাকা আয় করছেন। আবার কেউ কেউ ১৫-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন। এ অর্থ নিজেদের মতো খরচ করছেন নারীরা। বিশেষ করে সন্তানদের লেখাপড়া, স্কুলড্রেস তৈরিসহ নিজেদের পরিবারের নানান কাজে ব্যয় করছেন। শখের অনেক জিনিসও কিনছেন নারীরা। সার তৈরিতে তেমন কষ্ট ও পরিশ্রম না থাকায় দিন দিন নারীরা এগিয়ে আসছেন এই কাজে।
সদর উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় কৃষকের বাড়িতে সাত হাজার ৫১টি প্লান্টে উৎপাদন হচ্ছে জৈবসার। এর মধ্যে সরকারিভাবে ৪৬২ এবং কৃষকের নিজস্ব উদ্যোগে ছয় হাজার ৫৮৯টি প্ল্যান্টে এসব সার উৎপাদন হচ্ছে। প্রতিবছর এসব প্ল্যান্ট থেকে উৎপাদন হচ্ছে ৬৮ লাখ ৮৬ হাজার কেজি জৈবসার।
কৃষি বিভাগ বলছে, রাসায়নিক সারের বিকল্প হিসেবে জেলার প্রায় ৩ শতাংশ চাহিদা মেটাচ্ছে কৃষকের বাড়িতে উৎপাদিত এই জৈবসার।
জাহানারার জৈবসার উৎপাদনের শুরুটা সহজ ছিল না। কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বিত্তিপাড়া গ্রামের দরিদ্র এই গৃহবধূ কৃষি বিভাগের পরামর্শ এবং প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে দুটি চাক দিয়ে প্রথম কেঁচো ও গোবর থেকে জৈবসার উৎপাদন শুরু করেন। সদর উপজেলা কৃষি অফিস থেকে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহযোগিতার মাধ্যমে তার এ পথচলা শুরু হয়। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। জাহানারা খাতুন এখন নিজেই জৈবসার তৈরির একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়িয়েছেন। বাড়ির পেছনে টিনের শেডে ৪০টি চাকে (সিমেন্টের তৈরি) উৎপাদন করছেন জৈবসার। নিজের গরুর গোবর ছাড়াও গ্রামের অনেক বাড়ি থেকে তিনি বাড়তি গোবর সংগ্রহ করেন। সেই গোবর থেকে প্রতি মাসে ৪০ মণের ওপর জৈবসার উৎপাদন করছেন তিনি।
জাহানারার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের সড়কের সঙ্গে তার বসতবাড়ি। দালানবাড়ি তুলেছেন বেশ কয়েক বছর আগে। বাড়ির সামনে ও পেছনে তার জৈবসার তৈরির প্ল্যান্ট।
জাহানারা জানান, বেশ কয়েক বছর আগে কৃষি অফিসারের পরামর্শে ছোট পরিসরে শুরু করেন সার উৎপাদন। এখন তার রয়েছে বড় প্ল্যান্ট। প্রতি মাসে সার তৈরি হচ্ছে কমপক্ষে ৪০ মণ। যার বাজারমূল্য প্রায় ২৪ হাজার টাকা। নিজের জমিতে ব্যবহার করা ছাড়াও বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা তার কাছ থেকে সার কিনে নেন।
শুধু জাহানারা খাতুনই নন; সদর উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শে ও সহযোগিতা নিয়ে বিত্তিপাড়া গ্রামের শত শত নারী এখন উদ্যোক্তা বনে গেছেন।
কুষ্টিয়া সদর উপজেলার উজানগ্রাম ইউনিয়নের বিত্তিপাড়া গ্রামে প্রবেশ করলে প্রায় প্রতিটি বাড়ির সামনে চোখে পড়বে ভার্মি কম্পোস্ট তৈরির নানান সরঞ্জাম। কেঁচো আর গরুর গোবর দিয়ে নারীরা জৈবসার তৈরি করছেন ছোট ছোট প্ল্যান্টে। জৈবসার তৈরি করে নিজেদের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিক্রি করে বাড়তি অর্থ আয় করে পরিবারের জন্য ভূমিকা রাখছেন তারা। কৃষি বিভাগ থেকে এসব নারীদের সরঞ্জাম সরবরাহসহ বিভিন্ন কারিগরি সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।
মহাসড়ক থেকে নেমে গ্রামের মধ্যে সড়কে প্রবেশ করতেই চোখে পড়বে কৃষি বিভাগের বড় সাইনবোর্ড। সেখানে ভার্মি কম্পোস্টের নানা উপকারিতা ও উৎপাদন প্রক্রিয়ার তথ্য রয়েছে।
কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ১৩ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় শুরু হয়েছে জৈবসার উৎপাদন কার্যক্রম। কৃষকের বাড়িতে সাত হাজার ৫১টি প্ল্যান্টে উৎপাদন হচ্ছে জৈবসার। এরমধ্যে হাটশ হরিপুর ইউনিয়নে সরকারিভাবে ২৮টি এবং কৃষকের নিজ উদ্যোগে ২৮০টি প্ল্যান্টে তৈরি হচ্ছে জৈবসার। বটতৈল ইউনিয়নে সরকারিভাবে ৩৯টি এবং কৃষকের নিজ উদ্যোগে ৪২০টি, আলামপুর ইউনিয়নে সরকারিভাবে ১৪টি এবং কৃষকের নিজ উদ্যোগে ৫৩০টি, জিয়ারখি ইউনিয়নে সরকারিভাবে ১৩টি এবং কৃষকের নিজ উদ্যোগে ৪৬৫টি, কাঞ্চনপুর ইউনিয়নে সরকারিভাবে ১৯টি এবং কৃষকের নিজ উদ্যোগে ৪৩২টি, উজানগ্রাম ইউনিয়নে সরকারিভাবে ১৯৪ এবং কৃষকের নিজ উদ্যোগে ৫২২টি, হরিনারায়ণপুর ইউনিয়নে সরকারিভাবে ১৭ এবং কৃষকের নিজ উদ্যোগে ৪৬২টি, আব্দালপুর ইউনিয়নে সরকারিভাবে ৩৮টি এবং কৃষকের নিজ উদ্যোগে ৫৭৩টি, ঝাউদিয়া ইউনিয়নে সরকারিভাবে ১৪টি, এবং কৃষকের নিজ উদ্যোগে ৪৯৫টি, মনোহরদিয়া ইউনিয়নে সরকারিভাবে ৯টি এবং কৃষকের নিজ উদ্যোগে ৩৫৬টি, গোস্বামী দুর্গাপুর ইউনিয়নে সরকারিভাবে ১৭টি এবং কৃষকের নিজ উদ্যোগে ৫৬২টি, পাটিকাবাড়ি ইউনিয়নে সরকারিভাবে ১৬টি এবং কৃষকের নিজ উদ্যোগে ৪৮৬টি, আইলচারা ইউনিয়নে সরকারিভাবে ৩৩টি এবং
দিন দিন এ উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়ায় স্থানীয় পর্যায়ে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আগে যেসব জৈব উপাদান অব্যবহৃত থাকত, সেগুলো কাজে লাগিয়ে সার তৈরির সুযোগ পাচ্ছেন কৃষকরা। ফলে নিজেদের জমিতে ব্যবহারের পাশাপাশি ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে জৈবসার উৎপাদন ও বাজারজাত করার সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে।
কুষ্টিয়া সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুপালী খাতুন বলেন, ‘কৃষকের ঘরে ঘরে জৈবসার উৎপাদনে কৃষি বিভাগ সাহায্য করছে। প্রায় প্রতি সপ্তাহে আমি ও আমার টিমের সদস্যরা উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করছি। পাশাপাশি তাদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।’
চলমান ছয় হাজার ৫৮৯টি প্ল্যান্টে প্রতিবছর উৎপাদন হচ্ছে ৬৮ লাখ ৮৬ হাজার কেজি জৈবসার। উদ্যোগটির প্রাথমিক পর্যায়ে উৎপাদিত সার এলাকার মোট চাহিদার প্রায় পাঁচ শতাংশ পূরণ করছে বলে জানায় কৃষি বিভাগ। পরিকল্পনা ছাড়াই প্রাথমিক পর্যায়ে চাহিদার পাঁচ শতাংশ সার উৎপাদনে আশার আলো দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় বর্তমানে প্রতিবছর ইউরিয়া সারের চাহিদা ১৩ হাজার মেট্রিক টন এবং নন-ইউরিয়া সারের চাহিদা ১৭ হাজার মেট্রিক টন। বিশাল চাহিদার এই রাসায়নিক সারের বিপরীতে প্রতিবছর উৎপাদন করা হচ্ছে ৬৮ লাখ ৮৬ হাজার কেজি জৈবসার। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ব্যাপক পরিসরে উৎপাদনের সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
গবেষক, উদ্ভাবক ও পরিবেশ বিজ্ঞানী গৌতম কুমার রায় বলেন, ‘কৃষকদের মধ্যে জৈবসার উৎপাদন ও ব্যবহারের আগ্রহ বাড়ানো সত্যিকার অর্থেই একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে এ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ, উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি, মান নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারজাতকরণের সুযোগ নিশ্চিত করাটাও জরুরি।’
কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. শওকত হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘কৃষকদের উৎপাদিত জৈবসার একটি সম্ভাবনা তৈরি করেছে। দিন দিন এ অঞ্চলের কৃষকদের এ সার উৎপাদনে আগ্রহ বাড়ছে। বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেও জৈবসার উৎপাদনে কৃষকদের উৎসাহিত করতে কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।’









