কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

কুমারখালীর তাঁতবোর্ডে আলো জ্বালাতে পরিদর্শনে জাকির সরকার 

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে তাঁতশিল্পের আধুনিকায়নে প্রায় ৫৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা ব্যয়ে নেওয়া প্রকল্পের সুফল মিলছে না। প্রকল্পের আওতায় স্থাপন করা চার ধাপের যন্ত্রপাতির মধ্যে তিন ধাপের যন্ত্র অচল পড়ে আছে। এ ছাড়া প্রায় ৩০ কোটি টাকা মূল্যের ৩০টি যন্ত্রপাতি এখনো স্থাপন করা হয়নি। এতে আধুনিক উৎপাদনসুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন উপজেলার কয়েক হাজার তাঁতি ও ব্যবসায়ী। অন্যদিকে, প্রকল্পটি চালু না হওয়ায় সরকারও রাজস্ব হারাচ্ছে।

 

এ অবস্থায় শনিবার (১০ অক্টোবর) সকালে জেলার কুমারখালী তাঁতবোর্ড এলাকা পরিদর্শন করেছেন জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ইঞ্জিনিয়ার জাকির হোসেন সরকার। পরিদর্শন শেষে তিনি যন্ত্রপাতি সচল করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন। এ সময় উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক লুৎফর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক রাসেল উদ্দিন বাবুসহ অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।

 

এদিকে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ২০২১-২০২২ অর্থবছরে কুমারখালীর তাঁতশিল্প আধুনিকায়নে সাইজিং, উইন্ডিং, ডাইং ও ক্যালেন্ডারিং—এই চার ধাপে ৮৯টি আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৫৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা। যন্ত্রপাতি কেনা ও স্থাপনের দায়িত্ব পায় খুলনা শিপইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ।

 

চুক্তি অনুযায়ী, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া কাজ ওই বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে পুরোনো যন্ত্রপাতি অপসারণ না করা, নতুন যন্ত্র স্থাপনের উপযোগী অবকাঠামোর অভাব এবং পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় প্রকল্পের কাজ বাধাগ্রস্ত হয়। একপর্যায়ে কেনা যন্ত্রপাতির একটি অংশ প্রায় এক বছর খোলা আকাশের নিচে পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় পড়ে থাকে।

 

পরে কয়েক দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫৯টি যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়। সেগুলো তাঁতবোর্ডের কাছে হস্তান্তরও করা হয়। তবে পর্যাপ্ত জায়গা ও অর্থের অভাবে বাকি ৩০টি যন্ত্রপাতি স্থাপন ও হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি। এসব যন্ত্রপাতির বাজারমূল্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা।

 

স্থাপিত যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রেও রয়েছে জটিলতা। চারটি ধাপের মধ্যে শুধু ক্যালেন্ডারিং যন্ত্রের ট্রায়াল সম্পন্ন হয়েছে। বাকি তিন ধাপের যন্ত্রপাতির ট্রায়াল না হওয়ায় সেগুলো চালু করা যায়নি। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নেওয়া প্রকল্পটি কার্যত অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে।

 

এবিষয়ে কুমারখালী তাঁতবোর্ডের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মেহেদী হাসান বলেন, “যন্ত্রপাতি স্থাপনের কাজ এক বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও খুলনা শিপইয়ার্ডের প্রায় তিন বছর লেগেছে। চারটি ধাপের মধ্যে তিনটির যন্ত্রপাতির ট্রায়াল না দিয়েই ঠিকাদার চলে গেছেন। ফলে তাঁতি ও ব্যবসায়ীরা আধুনিকায়ন প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন না।

 

তিনি আরও বলেন, যন্ত্রপাতিগুলো চালু করা গেলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কাপড়ের মান ও দাম বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং সরকার প্রতি মাসে আনুমানিক পাঁচ থেকে ১০ লাখ টাকা রাজস্ব পাবে। যন্ত্রপাতি সচল করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।

 

এছাড়া প্রকল্পের বিষয়ে পরিদর্শন শেষে জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ইঞ্জিনিয়ার জাকির হোসেন সরকার বলেন, “তাঁতবোর্ডের যন্ত্রপাতি পরিদর্শন করেছি। প্রায় ৮০ শতাংশ যন্ত্রপাতি রয়েছে। ছোটখাটো কিছু যন্ত্রপাতির অভাবে পুরো কার্যক্রম চালু করা যাচ্ছে না বলে জানতে পেরেছি। বিষয়গুলো নোট করা হয়েছে। দ্রুত সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

 

এব্যাপারে স্থানীয় তাঁতি ও ব্যবসায়ীরা জানান, আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্রিন্টিং সুবিধা না থাকায় তাঁদের উৎপাদিত কাপড় আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা ও মানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারছে না। এ কারণে কাপড় প্রিন্টিং ও প্রসেসিংয়ের জন্য ঢাকায় পাঠাতে হয়। এতে উৎপাদন ব্যয়, সময় ও শ্রম, সবই বাড়ছে। তাঁদের দাবি, দ্রুত যন্ত্রপাতিগুলো সচল করে তাঁতশিল্পের আধুনিকায়ন প্রকল্পের সুফল নিশ্চিত করা হোক। 

 

তাঁতবোর্ড ও খুলনা শিপইয়ার্ড সূত্রে জানা গেছে, পদ্মা ও গড়াই নদীবেষ্টিত কুমারখালী উপজেলায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার তাঁতি পরিবার রয়েছে। দেড় শতাধিক বছরের ঐতিহ্যবাহী এ অঞ্চলের তাঁতশিল্প স্থানীয় অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। সম্প্রতি এখানকার উৎপাদিত বেডশিট ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। উপজেলায় প্রতি মাসে প্রায় আড়াই থেকে তিন লাখ পিস বেডশিট ও তোয়ালে উৎপাদিত হয়। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এসব পণ্য দেশের বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ এবং বিদেশে রপ্তানি করা হয়।

 

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রকল্পের অবশিষ্ট যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং অচল যন্ত্রগুলো সচল করা গেলে কুমারখালীর তাঁতশিল্পে উৎপাদন ও পণ্যের মান বাড়বে। তৈরি হবে নতুন কর্মসংস্থান, বাড়বে সরকারি রাজস্ব। তবে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কবে পুরোপুরি চালু হবে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো সময়সীমা জানা যায়নি।

Tags :

কুষ্টিয়া জেলা নিউজ ডেক্স, কুষ্টিয়া জিলাইভ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর