খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ই জুলাই ২০২৬, ৩:০ এএম

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ায় যথাযোগ্য মর্যাদা ও শ্রদ্ধার মধ্য দিয়ে ‘জুলাই শহিদ দিবস’ পালিত হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে শহিদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনা সভা ও স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের অর্জন কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর একক কৃতিত্ব নয়, এটি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের সম্মিলিত আত্মত্যাগের ফসল। সেই চেতনাকে ধারণ করে বিভাজন নয়, বরং ঐক্য, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সুশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।
গতকাল বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে কুষ্টিয়া শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়াম সংলগ্ন ‘৩৬শে জুলাই শহিদ স্মৃতিসৌধে’ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন এবং অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. তৌহিদ বিন-হাসান। এসময় উপস্থিত ছিলেন জেলা পরিষদের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিন, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন পিপিএম (বার), কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কুতুব উদ্দিন আহমেদ ও সদস্য সচিব ইঞ্জিনিয়ার জাকির হোসেন সরকার, জেলা জামায়াতে ইসলামী আমির অধ্যক্ষ খন্দকার এ কে এম আলী মহসিন, কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের সদ্য সাবেক সভাপতি আল মামুন সাগর, জেলা ছাত্রদলের আহবায়ক মোজাক্কির রহমান রাব্বি, জুলাইযোদ্ধা উল্লাস হোসেন ও তাজমুল ইসলাম, শহিদ পরিবারের সদস্য সুজন মাহমুদ, সীমা খাতুন, সেলিম রেজা ও আশরাফুল আলম, এনসিপি নেতা আব্দুল হালিমসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিবর্গ।
অনুষ্ঠানের শুরুতে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাগন, কুষ্টিয়া জেলা পুলিশ, জুলাই যোদ্ধা, জুলাই শহিদ পরিবার এবং বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জুলাই শহিদদের শ্রদ্ধা জানিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। জুলাই আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীরা অভিযোগ করে বলেন, সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনেক জুলাইযোদ্ধা এখনো যথাযথ স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন পাচ্ছেন না। তারা দ্রুত এই বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে কুষ্টিয়া শহরের পাঁচ রাস্তার মোড়ে ‘জুলাই শহিদ চত্বর’ দ্রুত বাস্তবায়নেরও দাবি উত্থাপন করা হয়। বক্তারা উল্লেখ করেন, জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে কুষ্টিয়া সদরে সাতজন প্রাণ হারিয়েছিলেন।
তাদের স্মৃতি সংরক্ষণে স্থায়ী উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। এসময় জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান বলেন, জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো-ঐক্য। তিনি বলেন, “এখন আমাদের মূল দায়িত্ব দেশ গঠন। জুলাইয়ের অবদান সবার,কাউকে ছোট বা বড় করে দেখার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও উন্নত, সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার প্রশ্নে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।” তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের মানুষের মেধা ও কর্মদক্ষতা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বীকৃত। দেশের তরুণ সমাজকে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি বিনির্মাণে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগেই একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
জেলা পরিষদের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিন বলেন, “হিংসা-বিদ্বেষ পরিহার না করলে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। মতভেদ থাকতে পারে, তবে পারস্পরিক সম্মান ও সহনশীলতা বজায় রেখে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। তিনি আরো বলেন, দেশব্যাপী যথাযোগ্য মর্যাদায় ‘ক’ শ্রেণির জাতীয় দিবস হিসেবে ‘জুলাই শহিদ দিবস’ উদযাপিত হচ্ছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে শহিদদের অবদান ও আত্মত্যাগকে স্মরণ করতেই আজ এই আলোচনা সভা।
আজ আমরা অত্যন্ত ভারাক্রান্ত এবং একইসাথে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে জীবন উৎসর্গ করা সেই বীর শহিদদের, যাদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের এই ঐতিহাসিক ‘জুলাই শহিদ দিবস’। ১৬ জুলাইয়ের সেই ঐতিহাসিক দিনে আবু সাঈদসহ অন্যান্য শহিদদের আত্মত্যাগ শুধু একটি কোটা সংস্কার আন্দোলনকে বিশাল গণঅভ্যুত্থানে পরিণত করেনি, বরং তা স্বৈরাচার, দুর্নীতি ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে এদেশের আপামর জনসাধারণের সম্মিলিত প্রতিরোধ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আজকের এই আলোচনা সভায় দাঁড়িয়ে আমাদের উপলব্ধি করতে হবে, তাদের এই আত্মত্যাগ যেন বৃথা না যায়। শহিদদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে এবং আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে আমাদের শপথ নিতে হবে, তরুণ প্রজন্মের দেখানো সেই বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক এবং জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন তারা বুকে ধারণ করেছিলেন, তা বাস্তবায়নে আমরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করে যাব।
পুলিশ সুপার মো. জসীম উদ্দীন বলেন, দেশের বিরুদ্ধে যেকোনো ষড়যন্ত্র, উসকানি কিংবা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অপচেষ্টা জনগণের ঐক্যের কাছে সফল হবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জনগণের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সর্বদা দায়িত্বশীল থাকবে।
কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কুতুব উদ্দিন আহমেদ বলেন, “ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করেছে। ভবিষ্যতে যেন কোনো স্বৈরাচারী বা ফ্যাসিবাদী শক্তির উত্থান না ঘটে, সে জন্য সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনায় ইতিবাচক সহযোগিতা ও গণতান্ত্রিক চর্চা জোরদার করতে হবে।
জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ইঞ্জিনিয়ার জাকির হোসেন সরকার বলেন, আজকের এই দিনে আমরা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি এবং তাঁদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছি। তাঁদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষায় সততা, দেশপ্রেম এবং পারস্পরিক সম্প্রীতির চেতনায় সকলকে কাজ করতে হবে। সে লক্ষ্যে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ বিনির্মাণে, তথা কুষ্টিয়াকে একটি সুন্দর জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের সদ্য সাবেক সভাপতি আল মামুন সাগর বলেন, একজন সাংবাদিক হিসেবে আমরা বিশ্বাস করি, সত্য প্রকাশ, মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে ধরা এবং ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়াই গণমাধ্যমের মূল দায়িত্ব। জুলাইয়ের শহিদদের আত্মত্যাগ আমাদের সেই দায়িত্ব আরও গভীরভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়। তাঁদের রক্তে অর্জিত চেতনা আমাদের সত্যনিষ্ঠ, দায়িত্বশীল ও স্বাধীন সাংবাদিকতা চর্চায় অনুপ্রাণিত করবে।
এছাড়া জেলা ছাত্রদলের আহবায়ক মোজাক্কির রহমান রাব্বি বলেন, এই দিনে আমরা সেই সব শহীদদের স্মরণ করছি, যাঁরা দেশের মানুষের অধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাঁদের আত্মত্যাগ জাতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি আরো বলেন, ছাত্রসমাজ সব সময় দেশের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। সেই ধারাবাহিকতায় আমাদেরও দায়িত্ব হবে শিক্ষা, সততা, শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম এবং গণতান্ত্রিক চর্চাকে শক্তিশালী করা। মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু সহিংসতা নয়, যুক্তি, সংলাপ এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই আমরা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির চেয়ারম্যান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর নেতৃত্বে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই।
সভায় বক্তারা বলেন, জুলাইয়ের শহিদদের আত্মত্যাগ কেবল একটি আন্দোলনের স্মৃতি নয়, এটি নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রেরণা। এই আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে জুলাইয়ের ইতিহাস তুলে ধরতে হবে। অনুষ্ঠানের শেষে জুলাই শহিদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করা হয় এবং তাদের আত্মত্যাগের চেতনাকে ধারণ করে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, সুশাসন ও উন্নত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য