খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ই জুলাই ২০২৬, ১:৩০ এএম

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হরিনারায়ণপুর ইউনিয়নের পদ্মনগর এলাকায় প্রায় ১ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি সড়কের কাজে নিম্নমানের ইটের খোয়া ব্যবহারের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়কের বেস নির্মাণে তিন নম্বর মানের ইটের খোয়া, পোড়া মাটির ভাঙা অংশ এবং মাটি মিশিয়ে ব্যবহার করা হয়েছে। যা সড়কের স্থায়িত্ব ও গুণগত মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। অভিযোগের সত্যতা প্রাথমিকভাবে পাওয়ার পর নিম্নমানের খোয়া অপসারণের নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।
জানা গেছে, পদ্মনগর ব্রিজ থেকে হাওরের ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৭৬৭ মিটার দীর্ঘ নতুন সড়ক নির্মাণের কাজ চলছে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটির নির্মাণকাজ শুরু হলেও কাজের শুরু থেকেই নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। প্রকল্পটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন সুমন নামের এক ঠিকাদার, যিনি ক্ষমতাসীন দলের একটি অঙ্গসংগঠনের নেতা হিসেবে পরিচিত।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের দুই পাশে ইটের সোল্ডার নির্মাণ করা হয়েছে এবং মাঝখানে বেস তৈরির জন্য ইটের খোয়া ফেলা হচ্ছে। তবে ব্যবহৃত খোয়ার বড় অংশই ধূসর-লাল রঙের, ভাঙা ও নিম্নমানের বলে প্রতীয়মান হয়। অনেক স্থানে খোয়ার সঙ্গে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মাটি মিশে থাকতে দেখা যায়। কয়েকটি অংশে এমন অবস্থাও দেখা যায়, যেখানে খোয়ার চেয়ে মাটির পরিমাণই বেশি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নির্মাণকাজের শুরু থেকেই তারা ঠিকাদারের লোকজনকে বারবার সতর্ক করেছেন। কিন্তু তাদের আপত্তিকে গুরুত্ব না দিয়ে একইভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়া হয়েছে।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, আমরা বারবার বলেছি, ভালো মানের খোয়া ব্যবহার করুন। রাস্তা দেরিতে হলেও সমস্যা নেই, কিন্তু সরকারি টাকায় যেন নিম্নমানের কাজ না হয়। আমাদের কথা কেউ শোনেনি।
আরেকজন বলেন, তিন-চার দিন ধরে শুধু খোয়া ঢালা হচ্ছে। একটু সামনে গেলেই দেখা যাবে খোয়ার সঙ্গে প্রচুর মাটি মেশানো। এভাবে রাস্তা করলে কয়েক বছরের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যাবে।
স্থানীয় একজন প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, আমরা টেকসই উন্নয়ন চাই। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় রাস্তা হবে, আর কয়েক বছরেই যদি ভেঙে যায়, তাহলে সেই ক্ষতির দায় কে নেবে?
এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রকল্পে এলজিইডির তদারকির যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। তাদের দাবি, নিয়মিত ও কার্যকর তদারকি থাকলে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করার সুযোগই তৈরি হতো না। তারা প্রকল্পের সম্পূর্ণ কাজের মান পরীক্ষা করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানান।
এ বিষয়ে স্থানীয় এক সচেতন নাগরিক বলেন, সরকার উন্নয়নের জন্য কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিচ্ছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে যদি ঠিকাদার আর সংশ্লিষ্টদের গাফিলতির কারণে নিম্নমানের কাজ হয়, তাহলে উন্নয়নের সুফল মানুষ পাবে না। শুধু খোয়া সরিয়ে দিলেই হবে না, পুরো কাজের গুণগত মান পরীক্ষা করতে হবে।
তবে অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন ঠিকাদার সুমন। তিনি বলেন, এখানে কোনো অনিয়ম বা দুই নম্বরি কাজ হচ্ছে না। আমরা প্রকল্পের নকশা ও এলজিইডির নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করছি। নিম্নমানের ইট ব্যবহারের অভিযোগ সঠিক নয়।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. হারুন অর রশিদ বলেন, সরকারি উন্নয়নকাজে অনিয়ম বা দুর্নীতির কোনো সুযোগ নেই। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশও দেওয়া হবে।
এদিকে অভিযোগের পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এলজিইডির কুষ্টিয়া নির্বাহী প্রকৌশলী রাজু আহমেদ বলেন, বিষয়টি আমরা সরেজমিনে দেখেছি। ব্যবহৃত নিম্নমানের খোয়াগুলো অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঠিকাদারকে এ বিষয়ে লিখিত চিঠিও দেওয়া হবে। নির্ধারিত মানের বাইরে কোনো সামগ্রী ব্যবহার করার সুযোগ নেই। ভবিষ্যতে এমন অনিয়ম হলে বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের মতে, এলজিইডির অপসারণের নির্দেশ ইতিবাচক হলেও শুধু নিম্নমানের খোয়া সরিয়ে ফেললেই সমস্যার সমাধান হবে না। তারা পুরো প্রকল্পের নির্মাণমান স্বাধীনভাবে যাচাই, ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রীর ল্যাব পরীক্ষার ব্যবস্থা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
সচেতন মহলের অভিমত, সরকারি অর্থে বাস্তবায়িত উন্নয়ন প্রকল্পে সামান্য অনিয়মও ভবিষ্যতে বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই কাজ শেষ হওয়ার আগেই অভিযোগের দ্রুত তদন্ত, মান নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করলে একদিকে যেমন সরকারি অর্থের অপচয় রোধ হবে, অন্যদিকে জনগণও দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই অবকাঠামোর সুফল ভোগ করতে পারবে।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য