খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই জুলাই ২০২৬, ২:৫৫ এএম

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া কর অঞ্চল কার্যালয়ের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি জালিয়াতির ঘটনায় একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। চাকরিপ্রার্থী মুন্না ইসলামের হয়ে লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ১ লাখ টাকার বিনিময়ে উত্তীর্ণ করানোর অভিযোগ স্বীকার করেছেন সবুজ হোসেন নামে এক যুবক। গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা তার বক্তব্যে উঠে এসেছে প্রক্সি পরীক্ষার একটি সংঘবদ্ধ চক্রের কার্যক্রম, যেখানে ঢাকাকেন্দ্রিক কয়েকজন সদস্য দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সরকারি চাকরির পরীক্ষায় অন্যের হয়ে অংশ নিয়ে বিপুল অর্থের বিনিময়ে জালিয়াতি করে আসছেন বলে দাবি করেন তিনি।
এ ঘটনায় ইতোমধ্যে কুষ্টিয়া কর অঞ্চল কার্যালয়ের মৌখিক পরীক্ষার সময় চারজনকে আটক করেছে কুষ্টিয়া মডেল থানা পুলিশ।পরে তাদের বিরুদ্ধে কুষ্টিয়া মডেল থানায় মামলা দায়ের করা হয়। মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। জানা যায়, গত ২৩ জুন রাতে কুষ্টিয়া কর অঞ্চল কার্যালয়ে অফিস সহায়ক পদে মৌখিক পরীক্ষা চলাকালে কয়েকজন পরীক্ষার্থীর আচরণ সন্দেহজনক মনে হলে নিয়োগ বোর্ড তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে। পরে প্রবেশপত্র, কাগজপত্র এবং লিখিত পরীক্ষার খাতার হাতের লেখা মিলিয়ে অসঙ্গতি ধরা পড়ে। একপর্যায়ে তারা অন্য ব্যক্তিদের দিয়ে লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন।
আটক ব্যক্তিরা হলেন— খালিদ বিন ওয়ালিদ (২৫), মুন্না ইসলাম (২৩), সাগর হোসেন (২৪) ও নাজমুল হোসেন (২৮)। তাদের বিরুদ্ধে পরদিন কুষ্টিয়া মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন কুষ্টিয়া কর কমিশনারের কার্যালয়ের কর্মরত এবং বিভাগীয় নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব কাজী মো. সুলতান শাহরিয়া। মামলা নম্বর-৫৩, তারিখ ২৪ জুন ২০২৬। অনুসন্ধানে জানা যায়, আটক চারজনের মধ্যে মুন্না ইসলামের হয়ে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন দৌলতপুর উপজেলার রিফায়েতপুর ইউনিয়নের লক্ষিকোলা গ্রামের বাসিন্দা সবুজ হোসেন।
তার পিতা মো. আব্বাস আলী। অনুসন্ধানকালে গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা বক্তব্যে সবুজ নিজেই এ তথ্য স্বীকার করেন। সবুজ বলেন, মুন্নার বড়ভাই আমার বন্ধু। একই এলাকার মানুষ আমরা। ওর বড়ভাই আমাকে বলেছিল, তাই আমি পরীক্ষা দিতে রাজি হই। এজন্য আমি ১ লাখ টাকা পেয়েছি। নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে তিনি বলেন, আমি কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে অনার্সে দুই বছর পড়েছি। পরে ট্রান্সফার নিয়ে সরকারি তিতুমীর কলেজে অ্যাকাউন্টিং বিষয়ে পড়াশোনা করি। অনার্স-মাস্টার্স শেষ করেছি। পাশাপাশি চাকরির কোচিং করি। তিনি আরও দাবি করেন, আমি এর আগে তিনটা প্রক্সি পরীক্ষা দিয়েছি।
একটা চাকরিও হয়েছে। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই আমাকে ১ লাখ টাকা দেওয়া হয়। ছবি না মিললে আমি যাই না। প্রক্সি সিন্ডিকেটের বিষয়ে জানতে চাইলে সবুজ বলেন, ঢাকায় আমরা চারজন একসঙ্গে রুমে থাকতাম। এই চারজনই প্রক্সি পরীক্ষা দিই। আবুল হোসেন ভাই, মিলন ভাই ও আরিফ ভাইকে চিনি। আরও অনেকে আছে, তবে সবাইকে চিনি না। একজনের মাধ্যমে এই লাইনে আসা। এদিকে বিশ্বস্ত একটি সূত্রের দাবি, সবুজ দীর্ঘদিন ধরে প্রক্সি পরীক্ষার সঙ্গে জড়িত এবং এ অবৈধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিপুল অর্থের মালিক হয়েছেন।
এদিকে নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া কয়েকজন পরীক্ষার্থী অভিযোগ করেন, প্রক্সি জালিয়াতির ঘটনায় প্রকৃত মেধাবীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের দাবি, পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া পুনর্মূল্যায়ন অথবা প্রয়োজনে লিখিত পরীক্ষা বাতিল করে নতুন করে পরীক্ষা নেওয়া হোক। এছাড়া গভীর রাত পর্যন্ত মৌখিক পরীক্ষা চলায় অনেক পরীক্ষার্থী ভোগান্তির শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তারা। কর অঞ্চল কুষ্টিয়ার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ মে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর জেলার স্থায়ী বাসিন্দাদের মধ্য থেকে ছয়টি পদে ১২২ জন নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।
১৯ জুন লিখিত পরীক্ষা এবং ২৩ জুন মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। মৌখিক পরীক্ষাতেই প্রক্সি জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ে। কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবির হোসেন মাতুব্বর বলেন, ঘটনার তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া চারজন দাবি করছে, পরীক্ষায় তারাই অংশগ্রহণ করেছে। বিষয়টি যাচাই করতে রাইটিং এক্সপার্টের সহায়তা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে অন্যান্য বিষয়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয়। তবে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত যেই থাকুক না কেন, সবার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য