কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

হদিস মিলছে না ৭১ হাজার গাছের

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া-মেহেরপুর সড়ক প্রশস্তকরণের পর সড়কের দুপাশে লাগানো ৭১ হাজার ২৭৫টি গাছের কোনো অস্তিত্ব নেই। আবার পরিবেশ রক্ষায় সড়কের পাশে বৃক্ষরোপণ বাবদ মেহেরপুর সড়ক বিভাগ থেকে বরাদ্দকৃত ৪৫ লাখ ৬১ হাজার ৬০০ টাকার এখন কোনো হদিস মিলছে না। সড়ক বিভাগ বলছে গাছ লাগানো হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু পরিচর্যার অভাবে সব গাছ উধাও হয়ে গেছে। ২০২৪ সালে কুষ্টিয়া-মেহেরপুর সড়ককে ওয়ানওয়ে সড়ক থেকে ফোরলেনে উন্নীত করতে ৩০ ফুট চওড়া পুরনো সড়ককে ১০০ ফিট চওড়া করে প্রশস্তকরণ করা হয়।

এর আগে কুষ্টিয়া-মেহেরপুর এই সড়কে ব্রিটিশ আমলের পুরনো শত শত গাছ ছিল। সড়ক প্রশস্তকরণের স্বার্থে সেই সময় শতবর্ষী ও ৩০-৪০ বছরের পুরনো দুই হাজার ৭৮৬টি বনজ, ফলদ ও ঔষধি গাছ কেটে ফেলা হয়। এতে এলাকা শ্মশানে পরিণত হয়। শতকোটি টাকা মূল্যের সেই সমস্ত গাছ মাত্র ২ কোটি টাকায় নিলামে বিক্রি করা হয়। সড়ক বিভাগ এবং বন বিভাগের রশি টানাটানির কারণে সেই টাকার মাত্র ২৮ লাখ ১২ হাজার টাকা সওজের কোষাগারে জমা পড়ে। তখন সাবেক জনপ্রশাসনমন্ত্রী মেহেরপুর-১ আসনের এমপি ফরহাদ হোসেনের দাপটে কারও ক্ষমতা হয়নি এসব নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করার।

তখন কর্তার ইচ্ছায় কর্ম হয়েছে সব কিছুর। ফলে, এক সময়ের শতবর্ষী বৃক্ষরাজির সুশোভিত ছায়াতল ঘেরা কুষ্টিয়া-মেহেরপুর সড়ক এক মহা বিরানভূমিতে পরিণত হয়। তখনই সিদ্ধান্ত হয় ২০২৫ সালে কাজ শেষ হলে পরিবেশ রক্ষায় ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ঐতিহাসিক সড়কে অর্থাৎ মেহেরপুর কলেজ মোড় থেকে গাংনী বামুন্দী হয়ে কুষ্টিয়া খলিষাকুন্ডি পর্যন্ত সড়কের দুপাশে ৭২ হাজার বড় চারাগাছ লাগানো হবে।

মেহেরপুর সড়ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে ব্রিটিশ আমলের তৈরি মেহেরপুর-কুষ্টিয়া সড়কের দুপাশে শতবর্ষী গাছগুলো কাটার পর পরিবেশ হয়ে ওঠে রুক্ষ। বেড়ে যায় তাপমাত্রা। তাই জরুরি ভিত্তিতে এই সড়কের পাশে নতুন গাছ লাগিয়ে দ্রুত পরিবেশ রক্ষায় বৃক্ষরোপণের দরপত্র আহ্বান করা হয়। ১৩ আগস্ট ২০২৫ সালে ৪৬ লাখ টাকার চুক্তিতে কাজটি পান কুষ্টিয়ার মিলন নামে এক ঠিকাদার। তিনি রাজশাহীর বিসমিল্লাহ বর্ষণ অ্যান্ড কোম্পানির লাইসেন্সে কাজটি পান।

চুক্তিপত্র অনুযায়ী প্রতিটি গাছ রোপণ এবং ৮ মাস পরিচর্যার জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র ৬৪ টাকা। সেই মোতাবেক গাছ লাগানো হয়। কিন্তু পরিচর্যা না হওয়ায় সব গাছ গবাদিপশুর পেটে চলে গেছে এমন অকাট্য জবাব মেহেরপুর সওজ বিভাগের। কিন্তু সড়ক পাশের মানুষজন বলছেন একবারেই ভিন্ন কথা। সরেজমিন গেলে মেহেরপুর-কুষ্টিয়া সড়কের বাঁশবাড়িয়া গ্রামে ‘গাছদাদা’ বলে পরিচিত পরিবারের সন্তান বৃক্ষপ্রেমী সোহরাব হোসেন বলেন, এই সড়কে তাদের হাতেই লাগানো ছিল প্রায় এক হাজার ফলদ গাছ।

মানুষ ও পশুপক্ষী সেই গাছের ফল খেত। সেই ফলের বিচি থেকে নতুন চারা হতো। শতবর্ষী সেই সমস্ত গাছ সড়ককে সুশীতল ছায়ায় আচ্ছাদিত করে রাখত। ক্লান্ত পথচারীরা সেই গাছের নিচে একটু স্বস্তির বিশ্রাম নিত। অনেক পথচারী বিশাল আকৃতির এই সমস্ত গাছের নিচে গ্রামবাসীর তৈরি মাচায় ঘুমিয়ে পড়ত। এখন বৃক্ষরাজি ঘেরা সেই সড়কের বিরানভূমির দৃশ্য দেখলে বুকটা দুমড়ে-মুচড়ে যায়। সড়ক প্রশস্তকরণের সময় কথা ছিল সড়কের গাছ কাটার বিপরীতে ১০ গুণ বেশি গাছ লাগিয়ে পরিবেশের ক্ষতি দ্রুতই পুষিয়ে ফেলা হবে। কিন্তু সড়কে কোনো গাছই লাগানো হয়নি।

নতুন গাছ লাগানোর নামে সরকারের কোটি টাকা পকেটস্থ হয়েছে। মেহেরপুরের পপি নার্সারির সিহাব সিদ্দীক জানান পরিবেশ রক্ষায় এই সড়কে বড় চারাগাছ লাগানো উচিত। তাছাড়া একটি চারার দাম, পরিবহন, রোপণ, নিয়মিত সেচ, আগাছা পরিষ্কার, বাঁশের খুঁটি, বেড়া এবং ৮ মাসের শ্রমিক খরচ মিলিয়ে ৬৪ টাকায় নতুন ছোট চারাগাছ লাগানোর কাজ সম্পন্ন করা একেবারেই অসম্ভব। তাদের হিসাবে ৩০ কিমি এই সড়কে এই কাজের জন্য অন্তত কোটি টাকার প্রয়োজন। সেখানে অর্ধেক টাকায় কাজ সম্পাদন চুক্তিটি আসলে প্রকল্পের মান রক্ষার বদলে ভাগবাটোয়ারার প্রকল্পের নামে অর্থ লুটপাট হয়েছে। এই কারণে ৭১ হাজার গাছ উধাও ঘটনা সম্ভব হয়েছে।

Tags :

কুষ্টিয়া জেলা নিউজ ডেক্স, কুষ্টিয়া জিলাইভ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর