এক রাতের ঘটনায় দুই রকম বয়ান
নিজ সংবাদ ॥ কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বটতৈল ইউনিয়নের ভাটাপাড়া এলাকায় একটি ডাকাতি ও দস্যুতার মামলার এজাহারকে কেন্দ্র করে নানা প্রশ্ন উঠেছে। মামলার বাদী শামীম শেখের অভিযোগ, তাঁর বাড়িতে ঢুকে ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে স্ত্রীকে জিম্মি করে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা লুট করা হয়েছে। তবে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা ও কারাগারে থাকা একমাত্র এজাহারনামীয় আসামি মো. রাজুর পরিবারের দাবি, ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল ক্যানেল পাড়ের একটি ব্রিজে বসাকে কেন্দ্র করে শামীম ও রাজুর মধ্যে বিরোধ ও মারামারি থেকে। তাঁদের অভিযোগ, ওই বিরোধের ঘটনাকে আড়াল করে পরবর্তী সময়ে ডাকাতির মামলা করা হয়েছে।
মামলার এজাহার, আদালতে আসামি সোপর্দসংক্রান্ত পুলিশের প্রতিবেদন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং স্থানীয়দের অভিযোগ পর্যালোচনায় ঘটনাটির সময়কাল, বিরোধের কারণ ও মামলার তদন্তপ্রক্রিয়া নিয়ে একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। তবে মামলার এজাহারে বর্ণিত ডাকাতির অভিযোগ এবং স্থানীয়দের পাল্টা দাবি—দুটিই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে বটতৈল ইউনিয়নের ভাটাপাড়া এলাকার ক্যানেল পাড়ের একটি ব্রিজে বসাকে কেন্দ্র করে শামীম শেখ (৪৫) ও মো. রাজু (২৬) এর মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তাঁদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে বলে দাবি করা হয়েছে। পরদিন সকালে শামীম কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
এর ছয় দিন পর, ২৪ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ৮টার দিকে রাজুকে তাঁর বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন তাঁর বাবা মো. জহুরুল ইসলাম কালু। তাঁর দাবি, শামীম শেখসহ কয়েকজন রাজুকে বাড়ি থেকে নিয়ে বটতৈল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনে মারধর করেন এবং পরে পুলিশের হাতে তুলে দেন। এ সময় রাজুর শারীরিক প্রতিবন্ধী মা ও বোন বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন বলেও তিনি দাবি করেন।
কুষ্টিয়া মডেল থানায় দায়ের করা মামলার এজাহারে শামীম শেখ অভিযোগ করেন, ১৮ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ১১টার দিকে বটতৈল রুহুল তেল পাম্পের সামনে তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিসমিল্লাহ খাবার হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে তিনি বাড়িতে যান। পরে ঘরের সিলিং ফ্যান নষ্ট থাকায় মশার কয়েল কিনতে বাড়ির বাইরে যান।
এজাহার অনুযায়ী, রাত আনুমানিক ১১টা ১০ মিনিটের দিকে তিনি বাড়ির বাইরে থাকা অবস্থায় রাজু তাঁর বসতঘরে প্রবেশ করেন। এ সময় তাঁর স্ত্রী ফুলমতির গলায় ধারালো অস্ত্র ধরে হত্যার ভয় দেখিয়ে টাকা ও স্বর্ণালংকার দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। একপর্যায়ে তাঁর স্ত্রী ঘরে থাকা ঋণের ৮০ হাজার টাকা এবং ব্যবসার ৪০ হাজার টাকা, মোট ১ লাখ ২০ হাজার টাকা অভিযুক্তকে দিয়ে দেন বলে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
এজাহারে আরও বলা হয়, শামীম বাড়িতে ফিরে ঘটনাটি দেখতে পেয়ে রাজুকে জাপটে ধরেন। তখন রাজুর হাতে থাকা ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁর বাম চোখের ওপর, ঠোঁটের বাম পাশে, বুকে ও মাথার বাম পাশে আঘাত করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে অজ্ঞাতপরিচয় আরও দুই ব্যক্তি ঘটনাস্থলে এসে রাজুকে ছাড়িয়ে নিয়ে নগদ টাকা নিয়ে পালিয়ে যান বলেও এজাহারে দাবি করা হয়েছে।
ঘটনাস্থল থেকে একটি কালো গেঞ্জি ও এক জোড়া স্যান্ডেল ফেলে যাওয়ার কথাও এজাহারে উল্লেখ রয়েছে। পরে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় শামীমকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তাঁর বাম চোখের ওপর ১১টি সেলাই দেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেছেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, চিকিৎসা নেওয়ার পর কিছুটা সুস্থ হয়ে পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে আলোচনা করে মামলা করতে বিলম্ব হয়। তবে স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, একই রাতে ব্রিজে বসাকে কেন্দ্র করে বিরোধের ঘটনা ঘটেছিল। ফলে ওই রাতের প্রকৃত ঘটনাক্রম নির্ধারণে চিকিৎসার নথি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ঘটনাস্থলের তথ্য এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আলামত যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
পুলিশের নথি অনুযায়ী, শামীম শেখের লিখিত এজাহারের ভিত্তিতে ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখ দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটে কুষ্টিয়া মডেল থানায় মামলা রুজু করা হয়। মামলাটির নম্বর ৩৫ এবং দণ্ডবিধির ৩৯৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। এজাহারে রাজুর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি আরও দুই অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।
মামলার একমাত্র নাম উল্লেখ করা আসামি রাজুকে গ্রেপ্তারের পর আদালতে পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয় এবং তিনি বর্তমানে জেলা কারাগারে আটক রয়েছেন বলে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
রাজুকে আদালতে সোপর্দ করার বিষয়ে তৎকালীন তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই হাসানুর রহমানের দাখিল করা প্রতিবেদনে বলা হয়, মামলাটি রুজু হওয়ার পর অফিসার ইনচার্জ তাঁর ওপর তদন্তভার অর্পণ করেন। পরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সঙ্গীয় ফোর্সের সহায়তায় ২৫ সেপ্টেম্বর রাত ১৪টা ১০ মিনিটে কুষ্টিয়া মডেল থানাধীন বটতৈল এলাকা থেকে রাজুকে গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, প্রাথমিক তদন্তে রাজুর সংশ্লিষ্টতার পক্ষে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে বলে তদন্তকারী কর্মকর্তার ধারণা ছিল। ‘আসামি জামিনে মুক্তি পেলে পলাতক হয়ে তদন্তে বিঘ্ন ঘটাতে পারেন’ এমন আশঙ্কার কথা জানিয়ে তাঁকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করা হয়। পাশাপাশি মামলা সংক্রান্ত বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন পাঠানোর কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
মামলাটি রুজুর পর অল্প সময়ের মধ্যেই তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়েছে। প্রথমে জগতি ক্যাম্পের ইনচার্জ এসআই হাসানুর রহমান মামলাটির তদন্তের দায়িত্বে ছিলেন। পরে তাঁর পরিবর্তে কুষ্টিয়া মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (তদন্ত) মোস্তাফিজুর রহমানকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এসআই হাসানুর রহমান বলেন, কাজের অতিরিক্ত চাপের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানোর পর মামলাটির তদন্তভার মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (তদন্ত) কর্মকর্তার কাছে দেওয়া হয়েছে। রাজুকে কোথা থেকে এবং কীভাবে আটক করা হয়েছিল, সে বিষয়ে তিনি বলেন- আদালতে দাখিল করা নথিতে বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।
নতুন তদন্তকারী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তিনি মামলাটির দ্বিতীয় তদন্তকারী কর্মকর্তা। রাজুকে তিনি আটক করেননি। জেলা কারাগার থেকে রিমান্ডে এনেছিলেন।
কুষ্টিয়া মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
কারাগারে থাকা রাজুর বাবা মো. জহুরুল ইসলাম কালু বলেন, ১৭ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ১১টার দিকে ব্রিজে বসাকে কেন্দ্র করে তাঁর ছেলের সঙ্গে বিরোধ ও মারামারির ঘটনা ঘটে। তাঁর দাবি, ওই ব্রিজে সাধারণ মানুষও স্বাভাবিকভাবে বসতে বা চলাচল করতে পারেন না। সেখানে কেউ গেলে তাঁকে মারধরের শিকার হতে হয় বলে এলাকায় অভিযোগ রয়েছে।
কালুর আরও অভিযোগ, শামীম শেখ বিভিন্ন সময়ে মারামারির ঘটনাকে কেন্দ্র করে মানুষের কাছ থেকে জরিমানার নামে টাকা আদায় করেছেন। ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে তাঁর ছেলে রাজুকে বাড়ি থেকে নিয়ে শামীম শেখ, সুইট, জুয়েল, রুবেল ও জীবন মিলে মারধর করেন বলে তিনি দাবি করেন। পরে রাজুকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয় বলেও তাঁর বক্তব্য।
এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা শামীম শেখের বিরুদ্ধে অতীতেও বিভিন্ন বিরোধে জড়ানো, স্থানীয়দের সঙ্গে মারামারি এবং মামলা-মোকদ্দমাকে কেন্দ্র করে হয়রানির অভিযোগ করেছেন। তাঁদের কেউ কেউ দাবি করেন, ৫ আগস্টের আগেও ক্যানেল পাড়ের বাসিন্দাদের সঙ্গে তাঁর পক্ষের লোকজনের বিরোধ ও মারধরের ঘটনা ঘটেছে। নারীদের ওপর হামলার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা।
স্থানীয়দের একাংশের দাবি, শামীমের আত্মীয়দের মধ্যে কেউ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং সেই প্রভাবকে কেন্দ্র করে অতীতে এলাকায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ছিল।
এসব অভিযোগের বিষয়ে মামলার বাদী শামীম শেখ বলেন, তাঁর দায়ের করা মামলার ঘটনা সম্পূর্ণ সত্য এবং এতে কোনো ভুল নেই।
একদিকে শামীম শেখের দায়ের করা দণ্ডবিধির ৩৯৪ ধারার মামলা, অন্যদিকে ব্রিজে বসাকে কেন্দ্র করে বিরোধ, রাজুকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে মারধরের অভিযোগ এবং গ্রেপ্তারসংক্রান্ত নথি নিয়ে উত্থাপিত প্রশ্ন—সব মিলিয়ে ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা প্রভাবের অভিযোগের ঊর্ধ্বে উঠে পুলিশ প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে কাউকে অন্যায়ভাবে হয়রানি করা হবে না। এমন স্বচ্ছ তদন্তই এখন সংশ্লিষ্ট সবার প্রত্যাশা।









