কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

বস্তায় আদা চাষে বদলে যাচ্ছে কৃষকের ভাবনা

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ মাটিতে জায়গা কম, কিন্তু কৃষিতে সম্ভাবনা কম নয়। প্রচলিত জমিভিত্তিক চাষের বাইরে গিয়ে বস্তায় আদা চাষ করে সেই সম্ভাবনাকেই বাস্তবে রূপ দিচ্ছেন কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার খাঁড়ারা গ্রামের কৃষক বিজয়। যশোর অঞ্চলে টেকসই কৃষি সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় বস্তায় আদা চাষ প্রদর্শনীতে তাঁর খেত এখন স্থানীয় কৃষকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। খাঁড়ারা ব্লকের এ প্রদর্শনীতে মোট ৩৫০টি বস্তায় আদা চাষ করা হয়েছে। ব্যবহার করা হয়েছে বারি আদা-২ জাতের আদা।

পরিচর্যা ও কৃষি বিভাগের পরামর্শ মেনে এগিয়ে চলায় গাছগুলো এখন বেশ সবল। কোনো কোনো গাছের উচ্চতা প্রায় ৫ ফুট পর্যন্ত হয়েছে। প্রতিটি গাছের গোড়ায় দেখা মিলছে একাধিক নতুন চারা। অনেক গাছের গোড়ায় ২০ থেকে ২৫টি পর্যন্ত চারা গজিয়েছে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে সারি সারি সবুজ গাছের ছোট্ট বাগান। কিন্তু একটু কাছে গেলেই বোঝা যায়, জমিতে নয়, বস্তার ভেতরেই তৈরি হয়েছে এই সম্ভাবনাময় আদা ক্ষেত। কৃষক বিজয় বলেন, প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে বস্তায় আদা চাষ তাঁর কাছে প্রথমে কিছুটা নতুন মনে হলেও কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও নিয়মিত পরিচর্যায় গাছের বৃদ্ধি দেখে তিনি আশাবাদী।

বস্তায় চাষ হওয়ায় গাছের পরিচর্যা, রোগবালাই পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা করাও তুলনামূলক সহজ বলে মনে করছেন তিনি। প্রদর্শনীটি নিয়মিতভাবে দেখভাল করছেন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মায়নুল ইসলাম রাজীব। তিনি মাঠে গিয়ে গাছের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন এবং কৃষককে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মায়নুল ইসলাম রাজীব বলেন, “বস্তায় আদা চাষ একটি সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি। সঠিক জাত নির্বাচন, বস্তায় উপযুক্ত মাটি ও জৈব উপাদানের ব্যবহার, পানি নিষ্কাশন এবং নিয়মিত পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে এ পদ্ধতিতে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব।

বিজয়ের প্রদর্শনীর গাছগুলো বর্তমানে বেশ ভালো অবস্থায় রয়েছে। গাছের বৃদ্ধি ও গোড়ায় চারা উৎপাদনের বিষয়টি আশাব্যঞ্জক। আমরা নিয়মিত মাঠ পরিদর্শনের মাধ্যমে কৃষককে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছি।” কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বস্তায় আদা চাষের অন্যতম সুবিধা হলো অল্প জায়গায় চাষের সুযোগ। বসতবাড়ির আঙিনা, বাড়ির পাশের খালি জায়গা কিংবা অনাবাদি ছোট জায়গাকেও উৎপাদনের আওতায় আনা যায়। পাশাপাশি জমিতে প্রচলিত চাষের তুলনায় বস্তাভিত্তিক উৎপাদনে ব্যবস্থাপনা ও পরিচর্যার সুযোগও আলাদা। বিশেষজ্ঞদের মতে, আদা বাংলাদেশের রান্নাঘরের নিত্যপ্রয়োজনীয় মসলা।

ফলে বাজারে এর চাহিদা রয়েছে সারা বছর। স্থানীয় পর্যায়ে মানসম্মত আদার উৎপাদন বাড়াতে আধুনিক ও টেকসই প্রযুক্তির ব্যবহার কৃষকের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। মিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মতিয়র রহমান বলেন, “কৃষি ও কৃষকের পাশে থাকাই কৃষি বিভাগের মূল লক্ষ্য। কৃষক যেন আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ করে কম জায়গায়, সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে লাভজনক ফসল উৎপাদন করতে পারেন, সে জন্য মাঠপর্যায়ে আমরা নিয়মিত পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছি। বস্তায় আদা চাষের মতো টেকসই প্রযুক্তি কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে প্রদর্শনীর মাধ্যমে বাস্তব ফলাফল তুলে ধরা হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, কৃষকের আগ্রহ ও সফলতার অভিজ্ঞতা অন্য কৃষকদের মধ্যেও নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে উৎসাহ সৃষ্টি করবে। খাঁড়ারা গ্রামের বিজয়ের ৩৫০ বস্তা আদা তাই শুধু একটি কৃষি প্রদর্শনী নয়; এটি প্রচলিত কৃষি ভাবনার বাইরে গিয়ে কম জায়গায় উৎপাদন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কৃষকের নতুন সম্ভাবনার একটি বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠেছে। সবুজ পাতায় ভরে ওঠা প্রতিটি বস্তা যেন বলছে, কৃষির সম্ভাবনা শুধু বিস্তীর্ণ জমিতে সীমাবদ্ধ নয়। সঠিক প্রযুক্তি, পরামর্শ ও যত্ন থাকলে একটি বস্তার ভেতরেও জন্ম নিতে পারে কৃষকের নতুন স্বপ্ন।

Tags :

কুষ্টিয়া জেলা নিউজ ডেক্স, কুষ্টিয়া জিলাইভ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর