খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ই জুন ২০২৬, ৩:১৩ এএম

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন কার্যালয়ের নিয়োগে অনিয়ম ও ফলাফল স্থগিতের বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. শাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, দেশের বিভিন্ন জেলায় নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। যেসব নিয়োগে অনিয়ম প্রমাণিত হবে, সেগুলো বাতিল করে নতুন করে পরীক্ষা নেয়া হবে।
গতকাল বুধবার (১৭ জুন) সকাল ১০টার দিকে আকস্মিকভাবে কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন। পরিদর্শনের সময় মন্ত্রী হাসপাতালের বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ, বিভিন্ন ওয়ার্ড, রান্নাঘর, বাথরুম, প্যাথলজি বিভাগ, এক্স-রে কক্ষ, রেবিস ভ্যাকসিন কেন্দ্রসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান ঘুরে দেখেন। তিনি রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে চিকিৎসাসেবার মান এবং কোনো ধরনের ভোগান্তির বিষয়ে খোঁজ নেন। এ ছাড়া উপ-পরিচালকের কার্যালয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
ব্রিফিংয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল পরিদর্শন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পর্যায়ক্রমে দেশের সব জেলা হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বিগত সরকারের সময়ে স্বাস্থ্যখাতে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ লুটপাটের কারণে সেবাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমান সরকার স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। জনগণের প্রয়োজন বিবেচনায় নতুন হাসপাতাল স্থাপন, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহ এবং জনবল নিয়োগের মাধ্যমে স্বাস্থ্যখাতে গতি ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হবে।
মন্ত্রী জানান, পরিদর্শনে হাসপাতালের কিছু ত্রুটি ধরা পড়েছে। কয়েকজন চিকিৎসক নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে উপস্থিত ছিলেন না এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থায়ও কিছু সমস্যা রয়েছে। এসব দ্রুত সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বন্ধ থাকা ওয়ার্ডগুলো দ্রুত চালু করা হবে এবং বর্তমানে বন্ধ থাকা বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ চিকিৎসাসেবাও পর্যায়ক্রমে পুনরায় চালু করা হবে। একই সঙ্গে রোগীদের প্রতি আন্তরিক আচরণ, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং সেবার মান আরও উন্নত করার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী তিন মাসের মধ্যে কলেজটির পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালু এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সচল করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। দুটি হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পরিদর্শনের বিষয়ে প্রশাসন থেকে চিকিৎসা কর্মকর্তারা কেউ-ই অবগত ছিলেন না। সরেজমিন দেখা যায়, ঠিক সকাল ১০টায় মন্ত্রী গাড়ি থেকে নেমে সরাসরি জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের কক্ষে যান। তিনি হাসপাতালে উপস্থিত চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তাদের ডিজিটাল হাজিরা ও রেজিস্ট্রার খাতার হাজিরার তথ্য জানতে চান।
এসব তথ্য থেকে কয়েকজন চিকিৎসক ও নার্সদের অনুপস্থিতি দেখতে পেয়ে সে বিষয়ে জানতে চান। কেউ কেউ মৌখিক ছুটি নিয়েছেন জানালে মন্ত্রী তত্ত্বাবধায়ককে বলেন, ‘মৌখিক ছুটি নেওয়ার কোনো বিধান নাই।’ পরিদর্শনকালে মন্ত্রী মেডিসিন (পুরুষ) ওয়ার্ডে রোগীদের সঙ্গে কথা বলে চিকিৎসাসেবার মান সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। রোগীদের বিছানার কাভার উঁচু করে সেখানে ছারপোকা আছে কি না, তা নিজে দেখেন। পাশে মেডিসিন (নারী) ওয়ার্ডে গিয়ে সরাসরি রোগীদের ব্যবহৃত ওয়াশরুম পরিদর্শন করতে গিয়ে দেখতে পান, সেখানে এক নারী পরিচ্ছন্নতাকর্মী পরিষ্কারের কাজ করছেন। এ সময় মন্ত্রী তাঁকে বলতে থাকেন, ‘এই রাখো আমারে দেইখা শুরু করলা পরিষ্কার, রাখো।’ এ ছাড়া রান্নাঘরে গিয়ে রোগীদের জন্য প্রস্তুত হতে থাকা খাবারের বিষয়ে খোঁজখবর নেন মন্ত্রী। রান্নাঘর অপরিচ্ছন্ন দেখে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
কুকুর বিড়ালে কামড় দেওয়া রোগীদের টিকা দেওয়ার স্থানে গিয়ে রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। পর্যাপ্ত পরিমাণ টিকা আছে এবং বিনা মূল্যে এসব টিকা দেওয়া হয় জানিয়ে উপস্থিত রোগীদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘কেউ টাকা চাইলে জানাবেন।’ পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, এখানে আসা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সারা দেশের জেলা হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো পর্যায়ক্রমে পরিদর্শন করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘গত ১৭ বছরে হাসপাতালের উন্নয়নে কোনো কাজ হয়নি।
কাজ করলে জবাবদিহি আছে, এটা মানুষ ভুলে গিয়েছিল। জনগণের কাছে দায়বদ্ধতার অভাব ছিল বলেই স্বাস্থ্য খাতে নানা সমস্যা তৈরি হয়েছে। যারা ক্ষমতায় ছিল, তারা রাতের অন্ধকারে ভোট নিয়েছে। তাদের ভোটের দরকার পড়ে নাই, জনগণের কাছে যাওয়ার দরকার পড়ে নাই। এ জন্য তারা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ ছিল না।’ জেনারেল হাসপাতালের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘বিচ্ছিন্নভাবে ময়লা পেয়েছি, বাথরুম আমি আসার পর পরিষ্কার করেছে। তাও তো করেছে। বিছানাগুলো দেখলাম, ছারপোকা পাইনি। আগে কী ছিল জানি না। জনগণের চাপ ও চিকিৎসকের সংখ্যা হিসাবে ভালো পেয়েছি। চিকিৎসক ও নার্স উপস্থিতি ভালো। কয়েকজন দেরিতে ছিল, তাদের সতর্ক করা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টার ভেতর হাসপাতালের নালা পরিষ্কারের কথা বলা হয়েছে।’
কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘দৃঢ়তার সঙ্গে বলছি, প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে এসে আগামী তিন মাসের ভেতর কুষ্টিয়া মেডিকেল (মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল) চালু করব। যত যন্ত্রপাতি আছে চালু করব, ফার্নিচার কেনা হচ্ছে, দরপত্র হয়ে গেছে। লোকবল দেওয়া হবে। এটা চালু হলে জেনারেল হাসপাতালের ওপর চাপ কমবে।’ মন্ত্রী জানান, প্রতি হাসপাতালে আধুনিক মানের তিন থেকে পাঁচটা অ্যাম্বুলেন্স থাকবে। চারটা হেলিকপ্টার আনা হচ্ছে, মুমূর্ষু রোগীদের ঢাকাসহ কাছের হাসপাতালে যাতে দ্রুত নেওয়া যায়। চিকিৎসকের সংখ্যা জনগণের চেয়ে কম।
বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে ৫ হাজার নতুন চিকিৎসক নিয়োগ হবে। জুলাই থেকে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দিতে যাচ্ছি, যার মধ্যে ৮০ শতাংশ থাকবেন নারী। আর্থিক লুটপাটের জন্য বিগত সরকারের সময় অনেক হাসপাতালে যেখানে যন্ত্রপাতি দরকার নেই, সেখানে কিনে ফেলে রেখেছে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘সেগুলোতে জং ধরেছে, ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়েছে। টাকা খেয়েছে। জনবল নাই, কিনে ফেলে রেখেছে। আমাদের আমলে এটা হবে না। আমরা ভালো যন্ত্র দিব, জনবল দিব, রক্ষণাবেক্ষণ করব।’ স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, জনসংখ্যা বৃদ্ধির কথা বিবেচনায় নিয়ে দেশের ৩৬২টি ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘চীনের সহায়তায় সারাদেশে ২০টি আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে দুটি হবে দুই হাজার শয্যার, যা শুধু নারী ও শিশুদের জন্য নির্ধারিত থাকবে। বাকি ১৮টি হাসপাতাল হবে এক হাজার শয্যার।’ নতুন হাসপাতালগুলোতে বিশেষায়িত অ্যাম্বুলেন্স সুবিধা থাকবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, রোগীর অবস্থা বিবেচনায় দ্রুত স্থানান্তরের জন্য চারটি হেলিকপ্টারও প্রস্তুত রাখা হবে। চিকিৎসক সংকটের বিষয়টি তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘রোগীর তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা এখনও অনেক কম। তাই বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হবে। পাশাপাশি আগামী জুলাই থেকে স্বাস্থ্যসেবা খাতে এক লাখ জনবল নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হবে।’
এ সময় তিনি আগামী তিন মাসের মধ্যে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর আশ্বাসও দেন। এ সময় জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন-হাসান, পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন, সিভিল সার্জন ডা. এস. এম. কামাল হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য