বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ায় ডিবি পুলিশ যখন দুই যুবককে আটক করে, তখন তাদের কারও কাছেই কোনো অস্ত্রই ছিল না বলে দাবি করেছে আটককৃত যুবকদের পরিবার। ওই সময়ের ভিডিও ফুটেজেই এর প্রমাণ রয়েছে বলে জানান তারা। পরে তাদের কাছ থেকে অস্ত্র ও গুলি উদ্ধারের দাবি করে মামলা দিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন স্বজনেরা।
গতকাল বুধবার (৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন গ্রেপ্তারকৃত আব্দুল্লাহর স্ত্রী মিথিলা খাতুন। আর মিথিলা খাতুনের স্বাক্ষরিত লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন গ্রেপ্তারকৃত আরেক যুবক আরিফুলের ভাগনি ইতি খাতুন।
গ্রেপ্তার দুই যুবক হলেন-কুমারখালী উপজেলার শালঘর মধুয়া গ্রামের হাসেন আলী গোপালের ছেলে আরিফুল ইসলাম আরিফ (২৮) এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার দুর্বাচারা গ্রামের রাহাদ আলীর ছেলে আব্দুল্লাহ (২৮)।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে মিথিলা খাতুন বলেন, গত ৬ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন গণমাধ্যমে কুষ্টিয়ায় দুটি পিস্তল ও ১৮ রাউন্ড গুলিসহ আটক ২ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। সেখানে আরিফুল ও আব্দুল্লাহকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু গ্রেপ্তারের সময় দুইজনের কারও কাছেই কোনো অস্ত্রই ছিল না।
মিথিলা বলেন, ডিবি পুলিশের এসআই জনি আরিফুল ও আব্দুল্লাহকে যখন আটক করেন, তখন তাদের কাছে কোনো ধরনের অস্ত্র ছিল না। এর প্রমাণ গ্রেপ্তারের সময়কার ভিডিও ফুটেজে রয়েছে। সেই ফুটেজ আমাদের কাছে সংরক্ষিত আছে।
মিথিলা খাতুনের অভিযোগ, তাদের পরিবারের সঙ্গে দুর্বাচারা গ্রামের জাহাঙ্গীর কবির লিপটনের দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। সেই বিরোধের জের ধরে লিপটন ও টাইগার মামুন ডিবি পুলিশকে ব্যবহার করে তার স্বামীকে আটক করিয়েছেন।
তার দাবি, প্রথমে আরিফুল ইসলামকে বংশীতলা মোড় থেকে আটক করা হয়। পরে ডিবি পুলিশের সদস্যরা দুর্বাচারা বাজারে গিয়ে আব্দুল্লাহকে জনসম্মুখে আটক করেন। এ সময় স্থানীয় লোকজন বাধা দিলে পুলিশ কোনো অস্ত্র দেখাতে পারেনি এবং কেন তাকে আটক করা হচ্ছে, তারও কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি। ওই সময়কার ভিডিও ফুটেজ আমাদের কাছে সংরক্ষিত আছে।
মিথিলা খাতুন বলেন, আমার স্বামীর নামে কোনো মামলা নেই। তাহলে তাকে কেন তুলে এনে অস্ত্র দিয়ে চালান দেওয়া হলো? প্রশাসনের কাছে আপনাদের মাধ্যমে আমরা এই প্রশ্নের উত্তর চাই।
সংবাদ সম্মেলনে মিথিলা খাতুন দাবি করে বলেন, জাহাঙ্গীর কবির লিপটন ও টাইগার মামুন-এর বিরুদ্ধেও একাধিক গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অপহরণ, চাঁদাবাজি, অস্ত্র দিয়ে ফাঁসানোসহ সাধারণ মানুষকে হয়রানি করার অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তাদের বক্তব্য সংবাদ সম্মেলনে পাওয়া যায়নি।
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, ২০২৫ সালের ৬ জুন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হাতে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রসহ আটক হওয়ার পর লিপ্টন জামিনে বের হয়ে আত্মগোপনে যান। আত্মগোপনে থেকেই প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগসাজশ করে আমার স্বামীসহ আরিফুলকে গ্রেপ্তার করায়।
টাইগার মামুন ১৭টি মামলার আসামি বলেও সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়। তার বিরুদ্ধেও প্রশাসনকে ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তিকে হয়রানি ও অর্থ আদায়ের অভিযোগ তোলা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, আরিফুল ইসলামকে ২০২৩ সালের দিকে ঢাকায় র্যাব একাধিক অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করেছিল। পরে এলাকাবাসীর মানববন্ধনের পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। শুধু ১০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধারের মামলায় তাকে চালান দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন স্বজনেরা। এ সংক্রান্ত সকল কাগজপত্র তাদের কাছে রয়েছে বলেও জানান তারা।
সংবাদ সম্মেলনে মিথিলা খাতুন বলেন, আমরা প্রকৃত সত্যটা জনসম্মুখে তুলে ধরার দাবি জানাচ্ছি। বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের অনুরোধ, যারা টাকা দিয়ে প্রশাসনকে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
তিনি আরও বলেন, আমার স্বামী কোনো মামলার আসামি নন। এরপরও তাকে গ্রেপ্তার করে অস্ত্র মামলায় চালান দেওয়া হয়েছে। আমরা এর সুষ্ঠু তদন্ত চাই।
এ সময় গ্রেপ্তার দুই যুবককে দ্রুত আইনি সহায়তা দিয়ে মুক্তির ব্যবস্থা, ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং গ্রেপ্তারকারী ডিবি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফারুকুল ইসলাম বলেন, এখন কি আর সেই যুগ আছে? অন্য কারোর মনে চাইলো তারা আমাদের অর্থ দিল আর আমরা তার কথা শুনে অস্ত্র দিয়ে যাকে তাকে চালান দিয়ে দিলাম? অস্ত্র কি একটা খেলনা? এর দাম অনেক। আমরা কীভাবে তুলে নিয়ে এসে অস্ত্র দিয়ে চালান দিয়ে দেব। এ গুলো সব ভুয়া কথা। তারা জেলা গোয়েন্দা পুলিশকে হেও প্রতিপন্ন করার জন্য এই ধরনের কথা বলছেন। তারা ভ্রান্ত তথ্য দিচ্ছেন আপনাদের।
তাদের আটককালে ভিডিও ফুটেজ পরিবারের কাছে সংরক্ষিত আছে বলে জানালে তিনি বলেন, কে, কখন কোথায়, কীভাবে ভিডিও করেছে তা আমরা বলতে পারবো না। আমরা আমরা কাউকে ভিডিও করতে কখনো মানা করি না। আমরা তাদের কাছ থেকে অস্ত্র পেয়েছি তাদের গ্রেপ্তার করেছি। আদালতে পাঠিয়েছি।
সংবাদ সম্মেলন আরিফুলের স্ত্রী বেবি, বড় ভাবি মিনারা বেগম, আরিফুলের মা রাবেয়া খাতুন, বড় বোন নাছিমা খাতুন, রূপসী খাতুনসহ দুই পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।









