বাংলাদেশের বিজ্ঞান গবেষণা, তত্ত্বীয় পরমাণু পদার্থবিদ্যা এবং আধুনিক উচ্চশিক্ষার রূপান্তরে অধ্যাপক ড. এম শমশের আলী এক প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশে যে কজন বিজ্ঞানী পরমাণু গবেষণাকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করেছেন এবং বিজ্ঞানের জটিল তত্ত্বকে সাধারণ মানুষের কাছে প্রাঞ্জল ভাষায় পৌঁছে দিয়েছেন, তাঁর মধ্যে তিনি শীর্ষস্থানীয়। একইসাথে বাংলাদেশের প্রথম দূরশিক্ষণভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়’ (বউবি)-এর প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য হিসেবে তিনি দেশের গণশিক্ষার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটিয়েছেন।
কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারার পলিমাটি থেকে উঠে আসা এই প্রথিতযশা বিজ্ঞানী তত্ত্বীয় নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে বিশ্বমানের গবেষণা পরিচালনা করেছেন। নোবেলজয়ী পদার্থবিদ আবদুস সালামের সাথে আন্তর্জাতিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান কেন্দ্রে (ICTP) যৌথ গবেষণা থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা—প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি মেধা ও সুনামের স্বাক্ষর রেখেছেন।
Table of Contents
Toggle- শৈশব, প্রাথমিক শিক্ষা ও শিক্ষাজীবনে মেধার স্বাক্ষর
- পারমাণবিক গবেষণা ও তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানে অবদান
- বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা: দূরশিক্ষণের নতুন দিগন্ত
- বিজ্ঞান ও ধর্মের সমন্বয়সাধন: চিন্তাবিদ হিসেবে প্রভার বিস্তার
- প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব ও বাংলাদেশ একাডেমি অফ সায়েন্সেস
- পুরস্কার, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও অর্জিত সম্মাননা
- কুষ্টিয়ার বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য ও ড. শমশের আলীর স্থায়ী উত্তরাধিকার
- সাধারণ জিজ্ঞাসা (Frequently Asked Questions)
শৈশব, প্রাথমিক শিক্ষা ও শিক্ষাজীবনে মেধার স্বাক্ষর
এম শমশের আলী ১৯৩৭ সালের ১ই নভেম্বর কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারায় এক সম্ভ্রান্ত ও শিক্ষানুরাগী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। গড়াই ও পদ্মার কোলঘেঁষা এই জনপদের মেধা ও মননশীল পরিবেশ তাঁর শৈশবের কৌতূহলী মানসিকতা গঠনে বড় ভূমিকা রেখেছিল। স্থানীয় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর তিনি ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন।
পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৫৯ সালে স্নাতক (সম্মান) এবং ১৯৬০ সালে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্নাতকোত্তর (এমএসসি) ডিগ্রি অর্জন করেন। দেশে একাডেমিক সাফল্য অর্জনের পর তিনি উচ্চতর গবেষণার জন্য যুক্তরাজ্যে যান এবং ১৯৬৫ সালে বিশ্ববিখ্যাত ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তত্ত্বীয় নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে (Theoretical Nuclear Physics) পিএইচডি (PhD) ডিগ্রি লাভ করেন।
পারমাণবিক গবেষণা ও তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানে অবদান
যুক্তরাজ্য থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি সম্পন্ন করে দেশে ফিরে ড. শমশের আলী তৎকালীন পরমাণু শক্তি কেন্দ্রে পেশাগত গবেষণা জীবন শুরু করেন। তত্ত্বীয় পরমাণু পদার্থবিদ্যায় তাঁর বৈজ্ঞানিক পেপারগুলো আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গবেষণা জার্নালে প্রকাশিত হতে থাকে।
ঢাকা পরমাণু শক্তি কেন্দ্র ও পরমাণু শক্তি কমিশন
১৯৭৪ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা পরমাণু শক্তি কেন্দ্রের (Atomic Energy Centre, Dhaka) পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের (BAEC) সিনিয়র বিজ্ঞানী ও সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে নিউক্লিয়ার রিয়্যাক্টর টেকনোলজি, আলফা ডেকে (Alpha Decay), এবং নিউক্লিয়ার স্ক্যাটারিং (Nuclear Scattering) সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মানের একাধিক উচ্চতর গবেষণা পরিচালিত হয়।
বিশ্ববরেণ্য পদার্থবিদদের সাথে যৌথ গবেষণা
তিনি ইতালির ট্রিয়েস্টে অবস্থিত ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরিটিক্যাল ফিজিক্স’ (ICTP)-এর সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট হিসেবে দীর্ঘকাল কাজ করেছেন। সেখানে তিনি তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বিজ্ঞানী অধ্যাপক আবদুস সালামের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসেন এবং যৌথ গবেষণা কার্যক্রমে অংশ নেন। এছাড়া তিনি দি ওয়ার্ল্ড একাডেমি অফ সায়েন্সেস (TWAS) এবং ইসলামিক ওয়ার্ল্ড একাডেমি অফ সায়েন্সেস (IAS)-এর একজন সম্মানীয় ফেলো হিসেবে বৈশ্বিক বিজ্ঞান নীতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখেন।
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা: দূরশিক্ষণের নতুন দিগন্ত
ড. এম শমশের আলীর কর্মজীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো বাংলাদেশে দূরশিক্ষণ (Distance Education) ও অনিয়মিত শিক্ষার অবকাঠামো গড়ে তোলা। ১৯৯২ সালে জাতীয় সংসদ কর্তৃক ‘বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আইন’ পাসের পর প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য হিসেবে তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
১৯৯২ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি প্রাতিষ্ঠানিক দূরদর্শিতার মাধ্যমে এই বিশ্ববিদ্যালয়টির শক্ত ভিত্তি স্থাপন করেন। দূরশিক্ষণ মাধ্যম হিসেবে রেডিও, টেলিভিশন ও মুদ্রণ উপকরণের সমন্বয় ঘটিয়ে তিনি প্রান্তিক কৃষক, চাকরিজীবী, নারী এবং প্রথাগত শিক্ষাবঞ্চিত লাখ লাখ মানুষের কাছে উচ্চশিক্ষার সুযোগ উন্মুক্ত করেন। তাঁর নির্দেশিত শিক্ষা কাঠামোই পরবর্তীকালে বাংলাদেশে প্রযুক্তিভিত্তিক অল্টারনেটিভ এডুকেশনের স্থায়ী মডেল হিসেবে রূপ নেয়।
বিজ্ঞান ও ধর্মের সমন্বয়সাধন: চিন্তাবিদ হিসেবে প্রভার বিস্তার
একজন পদার্থবিদ হওয়ার পাশাপাশি ড. এম শমশের আলী ইসলামী জীবনদর্শন ও আধুনিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সুষম সমন্বয়সাধনে গভীর আগ্রহী ছিলেন। বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যে কোনো মৌলিক বিরোধ নেই—এই দর্শনের ওপর ভিত্তি করে তিনি বহু নিবন্ধ, গ্রন্থ ও বক্তৃতা প্রদান করেছেন।
টেলিভিশন ও জাতীয় গণমাধ্যমে বিজ্ঞানবিষয়ক অনুষ্ঠানে তাঁর চমৎকার উপস্থাপন তরুণ প্রজন্মকে বিজ্ঞানমুখী হতে উৎসাহিত করেছে। মহাজাগতিক সৃষ্টিতত্ত্ব, পদার্থবিজ্ঞান এবং প্রাকৃতিক নিয়মগুলোর সাথে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের সংযোগ ঘটিয়ে তিনি এক প্রাঞ্জল পাঠ শৈলী তৈরি করেন।
প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব ও বাংলাদেশ একাডেমি অফ সায়েন্সেস
অধ্যাপক শমশের আলী দীর্ঘ সময় (১৯৮২ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপনা করেন। ২০০৪ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত তিনি দেশের বিজ্ঞানীদের সর্বোচ্চ জাতীয় সংগঠন ‘বাংলাদেশ একাডেমি অফ সায়েন্সেস’ (BAS)-এর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় খাতের মানোন্নয়নেও তাঁর বিশেষ অবদান রয়েছে। ২০০২ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত তিনি সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে তিনি গবেষণা ও নৈতিক শিক্ষার মান নিশ্চিতকরণে গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা প্রয়োগ করেন।
পুরস্কার, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও অর্জিত সম্মাননা
বিজ্ঞানে অবদান, পরমাণু গবেষণা এবং শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকার জন্য ড. এম শমশের আলী দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বহু সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।
- হরিপ্রসন্ন রায় স্বর্ণপদক: পদার্থবিজ্ঞানে মৌলিক গবেষণার জন্য।
- বাংলাদেশ একাডেমি অফ সায়েন্সেস স্বর্ণপদক: ভৌতবিজ্ঞানে উচ্চতর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ।
- খান বাহাদুর আহসানউল্লাহ স্বর্ণপদক: শিক্ষা ও সমাজসেবায় বিশেষ অবদানের জন্য।
- আন্তর্জাতিক ফেলোশিপ: TWAS (The World Academy of Sciences) এবং IAS (Islamic World Academy of Sciences)-এর স্থায়ী ফেলোশিপ।
কুষ্টিয়ার বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য ও ড. শমশের আলীর স্থায়ী উত্তরাধিকার
কুষ্টিয়া জেলা যেমন লালন সাঁইয়ের মারফতি আধ্যাত্মিকতা, মীর মশাররফ হোসেনের সাহিত্য এবং কাঙ্গাল হরিনাথের সাংবাদিকতায় সমৃদ্ধ, তেমনি আধুনিক বিজ্ঞান ও শিক্ষায় ড. এম শমশের আলীর নাম কুষ্টিয়ার গৌরবকে আন্তর্জাতিক দরবারে নিয়ে গেছে। ভেড়ামারার প্রাকৃত ঐতিহ্য থেকে উঠে এসে বিশ্বমানের বিজ্ঞানী ও দূরশিক্ষণ উচ্চশিক্ষার সফল রূপকার হওয়ার এই রূপরেখাটি আধুনিক বাংলাদেশের জন্য এক স্থায়ী অনুপ্রেরণা।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (Frequently Asked Questions)
ড. এম শমশের আলী কেন বিখ্যাত?
ড. এম শমশের আলী একজন প্রখ্যাত পরমাণু বিজ্ঞানী, তত্ত্বীয় পদার্থবিদ, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বউবি) প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য এবং বাংলাদেশ একাডেমি অফ সায়েন্সেসের সাবেক সভাপতি।
ড. এম শমশের আলীর জন্মস্থান কোথায়?
তিনি ১৯৩৭ সালের ১ই নভেম্বর কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারায় জন্মগ্রহণ করেন।
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা কী ছিল?
তিনি ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বউবি) প্রথম ও প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো, মিডিয়াভিত্তিক দূরশিক্ষণ কোর্স ও গণশিক্ষার পাঠ্যসূচি তৈরি করেন।
তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানে তাঁর বিশেষ গবেষণা ক্ষেত্র কী ছিল?
তিনি মূলত তত্ত্বীয় নিউক্লিয়ার ফিজিক্স (Theoretical Nuclear Physics), আলফা ডেকে (Alpha Decay), এবং নিউক্লিয়ার স্ক্যাটারিং নিয়ে কাজ করেছেন। আন্তর্জাতিক সংস্থা ICTP-তে নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী আব্দুস সালামের সাথেও তিনি গবেষণা করেছেন।







