বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং শিক্ষাবিস্তারে স্থানীয় পর্যায়ে যাঁদের অবদান অবিস্মরণীয়, বৃহত্তর কুষ্টিয়া অঞ্চলের কৃতি সন্তান ড. আলাউদ্দিন আহমেদ তাঁদের মধ্যে অন্যতম এক প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। একাধারে সফল শিল্প উদ্যোক্তা, দানবীর, শিক্ষানুরাগী এবং প্রথিতযশা আইনজীবী হিসেবে তিনি নিজ জেলার সীমানা ছাড়িয়ে জাতীয় পরিসরে নিজের মেধা ও সমাজসেবামূলক কাজের স্বাক্ষর রেখে গেছেন।
ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি জনকল্যাণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং আইনি সেবার মাধ্যমে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে নজির তিনি স্থাপন করেছেন, তা কুষ্টিয়ার ইতিহাসে চিরকাল অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
Table of Contents
Toggleজন্ম, পারিবারিক শেকড় ও প্রারম্ভিক জীবন
কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার ৫ নম্বর নন্দলালপুর ইউনিয়নের চকরঘুয়া (বর্তমানে ‘আলাউদ্দিন নগর’) গ্রামে ১৯৪৪ সালের ৩১ জুলাই আলাউদ্দিন আহমেদ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা বাহার আলী এবং মাতা তহিরুন্নেছা। জন্মের পর তাঁর নাম রাখা হয়েছিল “আলো”।
মাত্র চার-পাঁচ বছর বয়সে তিনি পিতাকে হারান। পরবর্তীতে তাঁর পিতৃতুল্য চাচা মোহাম্মদ আলী (চাঁদ আলী) এবং মায়ের স্নেহ ও তত্ত্বাবধানে তিনি বেড়ে ওঠেন। শৈশবের এই প্রতিকূলতা ও গ্রামীণ অভাব-অনটন তাঁকে খুব কাছ থেকে মানুষের কষ্ট উপলব্ধি করতে শিখিয়েছিল, যা পরবর্তীতে তাঁর সমাজসেবামূলক মনন গঠনে প্রধান ভূমিকা রেখেছিল।
শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের সূচনা
প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের জন্য তাঁকে প্রতিদিন পায়ে হেঁটে দুই মাইল পথ পাড়ি দিতে হতো। এই সংগ্রাম থেকেই তাঁর মনে গ্রামীণ এলাকার শিশুদের শিক্ষার আলো ছড়ানোর তাগিদ জন্মায়।
- মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা: তিনি কুমারখালী এম. এন. হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৬১ সালে যশোর জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর কুষ্টিয়া কলেজ থেকে ১৯৬৬ সালে বি.কম ডিগ্রি অর্জন করেন।
- চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সি ও আইন শিক্ষা: তিনি দেশের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সি অধ্যয়ন করেন। পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালে এলএলবি ডিগ্রি ও আয়কর আইনশিল্পের সনদ লাভ করেন এবং ১৯৭০ সাল থেকে কুষ্টিয়ায় আয়কর আইনজীবী হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু করেন।
- উচ্চতর ব্যবসায়িক বিস্তার: আশির দশকের শুরুতে (১৯৮০ সালে) তিনি ঢাকায় তাঁর পেশাগত ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম বিস্তৃত করেন এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় আয়কর পরামর্শকদের কাতারে নিজের স্থান করে নেন।
শিল্প উদ্যোক্তা হিসেবে অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি
আইন পেশা এবং কনসালটেন্সির পাশাপাশি আলাউদ্দিন আহমেদ দেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অসামান্য অবদান রেখেছেন। তিনি বহুবিধ শিল্প প্রতিষ্ঠান ও কর্পোরেট উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত আছেন:
- তিনি হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং হেলথকেয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (HDC)-এর নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
- এছাড়াও তিনি আলো মাল্টিপারপাস লিমিটেড ও বাংলাবান্ধা ল্যান্ড পোর্ট লিমিটেড-এর চেয়ারম্যান এবং শিলাইদহ ডেইরি লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক।
- তাঁর প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত উদ্যোগগুলোর মধ্যে আলাউদ্দিন নগর মাশরুম ইন্ডাস্ট্রিজ, ফিশারিজ এবং অ্যাগ্রো প্রসেস ইন্ডাস্ট্রিজ অন্যতম। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কুষ্টিয়া ও এর আশেপাশের অঞ্চলে হাজার হাজার বেকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
শিক্ষানুরাগ ও ‘আলাউদ্দিন নগর’ প্রতিষ্ঠা
কুষ্টিয়ার অবহেলিত চকরঘুয়া গ্রামকে একটি আধুনিক শিক্ষা ও জনকল্যাণকেন্দ্রে রূপান্তর করার নেপথ্যে রয়েছে তাঁর একক প্রচেষ্টা। তাঁর এই কর্মতৎপরতার কারণেই এলাকাটি আজ সর্বমহলে ‘আলাউদ্দিন নগর’ হিসেবে পরিচিত। শিক্ষা বিস্তারে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদানের মধ্যে রয়েছে:
- বিদ্যালয় ও কলেজ প্রতিষ্ঠা: ১৯৭২ সালে চকরঘুয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে সরকারি হয়। ১৯৮২ সালে তাঁর অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত ‘আলাউদ্দিন আহমেদ হাই স্কুল’ পরবর্তীতে উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ ও কলেজিয়েটে রূপ নেয়।
- শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও বিশেষায়িত শিক্ষা: শিক্ষকদের মান উন্নয়নে ১৯৯৮ সালে ‘আলাউদ্দিন আহমেদ টিচার্স ট্রেনিং কলেজ’ এবং ১৯৯৯ সালে ‘আলাউদ্দিন আহমেদ শারীরিক শিক্ষা কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন।
- বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সহায়তা: নদীগর্ভে বিলীন হওয়া কুমারখালী কলেজ পুনর্নির্মাণে তিনি ২০০ ফুট দীর্ঘ ভবন নিজ খরচে নির্মাণ করে দেন। এ ছাড়া বাঁশগ্রাম আলাউদ্দিন আহমেদ ডিগ্রি কলেজ, বাহার কৃষি কলেজ এবং খোকসায় কিন্ডারগার্টেনসহ বিভিন্ন ধর্ম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।
জনকল্যাণ, দাতব্য উদ্যোগ ও অবকাঠামো উন্নয়ন
দানবীর আলাউদ্দিন আহমেদের সমাজসেবা কেবল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; গ্রামীণ অবকাঠামো ও জনস্বাস্থ্য উন্নয়নেও তাঁর ভূমিকা ব্যাপক:
- সেচ ও কৃষি প্রকল্প: ১৯৮২ সালে তিনি নিজ এলাকায় কৃষি, সেচ ও নিষ্কাশন প্রকল্প চালু করেন, যার মাধ্যমে শত শত গভীর ও অগভীর নলকূপ স্থাপন এবং হাজার হাজার জলাধার ও কালভার্ট নির্মিত হয়।
- স্বাস্থ্য ও গ্রামীণ সুবিধা: চকরঘুয়ায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র স্থাপন এবং গ্রামীণ জনপদে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর প্রচেষ্টা এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মান চিরতরে বদলে দিয়েছে।
- সামাজিক অবদানের ক্ষেত্র: কুষ্টিয়া পৌর গোরস্থানে জানাজার শেড নির্মাণ, ঈদগাহ ময়দান সংস্কার, মসজিদ ও মাদরাসা নির্মাণ এবং দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত বৃত্তির ব্যবস্থা করার মাধ্যমে তিনি মানবকল্যাণের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
ব্যক্তিগত জীবন ও উত্তরাধিকার
তিনি ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ শিলাইদহের প্রখ্যাত সমাজসেবক ও সংস্কৃতিানুরাগী গাজী হাবিবুর রহমানের কন্যা সুরাইয়া বিলকিসকে বিবাহ করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি যেমন সফল উদ্যোক্তা, তেমনি সামাজিকভাবে এক নিবেদিতপ্রাণ প্রাণপুরুষ। কুষ্টিয়ার মাটি ও মানুষের কল্যাণে তাঁর এই বহুমুখী অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তাঁকে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখবে।






