বিশুদ্ধ পানীয় জল মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান শর্ত। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের ভূ-গর্ভস্থ পানিতে যখন প্রাণঘাতী আর্সেনিকের উপস্থিতি ধরা পড়ে, তখন তা এক ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সংকটের জন্ম দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) একে আখ্যায়িত করেছিল “ইতিহাসের সর্ববৃহৎ গণ-বিষক্রিয়া” হিসেবে। এই ভয়াবহ জাতীয় ও বৈশ্বিক সংকটের মুহূর্তে পরিত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন কুষ্টিয়ার কৃতি সন্তান, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন রসায়নবিদ ড. আবুল হুসসাম।
তাঁর উদ্ভাবিত স্বল্প খরচের ‘সোনো আর্সেনিক ফিল্টার’ (SONO Filter) কেবল লাখো মানুষের জীবনই বাঁচায়নি, বরং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়েছে।
Table of Contents
Toggleজন্ম, শিক্ষাগত পটভূমি এবং মেধার বিকাশ
১৯৫২ সালে বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন আবুল হুসসাম। কুষ্টিয়ার মতো ঐতিহ্যবাহী ও সাংস্কৃতিকভাবে অগ্রসর একটি অঞ্চলে তাঁর প্রারম্ভিক জীবন অতিবাহিত হয়, যা তাঁর মননে সমাজসচেতনতার বীজ বপন করেছিল।
বিজ্ঞানের প্রতি প্রবল কৌতূহল তাঁকে রসায়নশাস্ত্রের দিকে ধাবিত করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। ১৯৮২ সালে পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় (University of Pittsburgh) থেকে অ্যানালিটিক্যাল কেমিস্ট্রি বা বিশ্লেষণী রসায়নে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বনামধন্য জর্জ ম্যাসন বিশ্ববিদ্যালয়ে (George Mason University) রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে তিনি তাঁর দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য কর্মজীবন শুরু করেন।
আর্সেনিক সংকট এবং গবেষণার প্রেক্ষাপট
নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে যখন বাংলাদেশের নলকূপের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক ধরা পড়ে, তখন ড. হুসসাম সুদূর আমেরিকায় বসেও মাতৃভূমির এই বিপর্যয় অনুভব করেন। আর্সেনিক এমন একটি গন্ধহীন ও স্বাদহীন বিষ, যা দীর্ঘমেয়াদে মানবদেহে প্রবেশ করলে চর্মরোগ, গ্যাংগ্রিন থেকে শুরু করে ফুসফুস, কিডনি ও লিভারের ক্যান্সারের মতো প্রাণঘাতী রোগ সৃষ্টি করে।
অধ্যাপক হুসসাম উপলব্ধি করেন, পশ্চিমা বিশ্বের ব্যয়বহুল পানি শোধন প্রযুক্তি বাংলাদেশের গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য কোনো কার্যকর সমাধান হতে পারে না। এমন একটি প্রযুক্তি প্রয়োজন, যা হবে সস্তা, টেকসই, বিদ্যুৎবিহীন এবং স্থানীয় কাঁচামালে তৈরি। এই চিন্তা থেকেই তিনি তাঁর ভাই ডা. এ. কে. এম. মুনিরের সাথে যৌথভাবে কুষ্টিয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে গবেষণা ও ফিল্টার তৈরির কাজ শুরু করেন।
যুগান্তকারী উদ্ভাবন: সোনো ফিল্টার (SONO Filter)
দীর্ঘ গবেষণার পর ড. আবুল হুসসাম উদ্ভাবন করেন ‘সোনো আর্সেনিক ফিল্টার’। এটি একটি অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে শতভাগ কার্যকর দ্বি-স্তর বিশিষ্ট পরিস্রাবণ ব্যবস্থা (Two-tier filtration system)।
প্রযুক্তিগত কার্যপ্রণালী ও রাসায়নিক বিশ্লেষণ
সোনো ফিল্টারের মূল বিজ্ঞান লুকিয়ে আছে এর ‘কম্পোজিট আয়রন ম্যাট্রিক্স’ (Composite Iron Matrix – CIM) বা যৌগিক লৌহ কাঠামোর মধ্যে।
- প্রথম স্তর: ওপরের বালতিতে থাকে কাস্ট আয়রন টার্নিং (লোহার কুঁচি), মোটা বালি এবং কাঠের কয়লা। ভূ-গর্ভস্থ পানিতে থাকা আর্সেনিক (আর্সেনাইট ও আর্সেনেট উভয় রূপেই) যখন এই কম্পোজিট আয়রন ম্যাট্রিক্সের সংস্পর্শে আসে, তখন রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে এটি শক্তভাবে আয়রন অক্সাইডের সাথে যুক্ত হয়ে যায় (Adsorption)।
- দ্বিতীয় স্তর: নিচের বালতিতে থাকে মিহি বালি ও ইটের খোয়া, যা পানি থেকে অন্যান্য অপদ্রব্য এবং অতিরিক্ত আয়রন ছেঁকে বের করে দেয়।
এই ফিল্টারটি পানি থেকে কেবল আর্সেনিকই দূর করে না, বরং ম্যাঙ্গানিজ, আয়রন এবং বিভিন্ন ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াও ধ্বংস করে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী শতভাগ নিরাপদ পানীয় জল নিশ্চিত করে।
সোনো ফিল্টারের তুলনামূলক সুবিধা ও উপযোগিতা
বিশ্বে আর্সেনিক পরিশোধনের নানা পদ্ধতি থাকলেও সোনো ফিল্টারের কিছু সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য একে অনন্য করে তুলেছে:
- বিদ্যুৎ ও রাসায়নিক মুক্ত: এই ফিল্টার চালাতে কোনো বিদ্যুৎ বা বাড়তি রাসায়নিক পদার্থের (Chemical Additives) প্রয়োজন হয় না। এটি সম্পূর্ণ মধ্যাকর্ষণ শক্তির (Gravity) ওপর নির্ভরশীল।
- দীর্ঘস্থায়িত্ব: একটি সোনো ফিল্টার কোনো রকম যন্ত্রাংশ পরিবর্তন ছাড়াই একটানা ৫ থেকে ৭ বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করতে পারে।
- বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: অন্যান্য ফিল্টারের মতো এটি বিষাক্ত আর্সেনিকযুক্ত বর্জ্য (Toxic Sludge) পরিবেশে উন্মুক্ত করে না। ফিল্টারের ভেতরের লোহা আর্সেনিককে স্থায়ীভাবে আবদ্ধ করে রাখে, যা পরিবেশের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ।
- সাশ্রয়ী মূল্য: স্থানীয়ভাবে কুষ্টিয়ায় উৎপাদিত হওয়ায় এর দাম সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে রাখা সম্ভব হয়েছে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: গ্রেইঞ্জার চ্যালেঞ্জ প্রাইজ ও বৈশ্বিক সম্মাননা
ড. আবুল হুসসামের এই যুগান্তকারী আবিষ্কার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। ২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল একাডেমি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং (National Academy of Engineering) টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্য তাঁকে মর্যাদাপূর্ণ ‘গ্রেইঞ্জার চ্যালেঞ্জ প্রাইজ ফর সাসটেইনেবিলিটি’ (Grainger Challenge Prize for Sustainability) প্রদান করে। এই পুরস্কারের অর্থমূল্য ছিল ১০ লক্ষ মার্কিন ডলার, যার একটি বড় অংশ তিনি বাংলাদেশে সোনো ফিল্টার বিতরণ এবং আর্সেনিক নিয়ে উচ্চতর গবেষণার কাজে দান করে দেন।
একই বছর বিখ্যাত ‘টাইম’ (TIME) ম্যাগাজিন তাঁকে ‘গ্লোবাল হিরো অফ দ্য এনভায়রনমেন্ট’ (Global Hero of the Environment) খেতাবে ভূষিত করে। একজন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী হিসেবে এটি ছিল এক অবিস্মরণীয় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
জনস্বাস্থ্যে বাস্তব প্রয়োগ এবং আর্থসামাজিক প্রভাব
বিজ্ঞান গবেষণাগার থেকে বেরিয়ে মানুষের বাস্তব জীবনে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, সোনো ফিল্টার তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। কুষ্টিয়ার স্থানীয় কারখানা থেকে উৎপাদিত হাজার হাজার সোনো ফিল্টার বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের আর্সেনিক উপদ্রুত অঞ্চলে বিতরণ করা হয়েছে।
এর ফলে লক্ষাধিক মানুষ সরাসরি আর্সেনিকের বিষক্রিয়া থেকে রক্ষা পেয়েছে। চিকিৎসা ব্যয় হ্রাস এবং নিরাপদ পানির নিশ্চয়তার কারণে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থার দৃশ্যমান উন্নতি ঘটেছে।






