বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা ও আইনি কাঠামোর উন্নয়নে বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলার অবদান ঐতিহাসিকভাবেই অত্যন্ত সুদৃঢ়। এই জনপদের মাটি যুগে যুগে এমন অসংখ্য ক্ষণজন্মা আইনবিদের জন্ম দিয়েছে, যাঁরা মেধা, প্রজ্ঞা ও সততার মাধ্যমে দেশের বিচার বিভাগকে সমৃদ্ধ করেছেন। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি আবু বকর সিদ্দিকী তাঁদের মধ্যেই অন্যতম এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
তৃণমূল পর্যায়ের একজন আইনজীবী হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু করে তিনি মেধা ও একাগ্রতার গুণে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগের বিচারক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর দীর্ঘ বিচারিক জীবন, ন্যায়বিচারের প্রতি অবিচল আস্থা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় অবদান তাঁকে কুষ্টিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কৃতি সন্তানে পরিণত করেছে।
Table of Contents
Toggleজন্ম ও পারিবারিক ঐতিহ্য: খোকসার নিভৃত পল্লী থেকে যাত্রা
বিচারপতি আবু বকর সিদ্দিকী ১৯৫৪ সালের ২৯ জুলাই কুষ্টিয়া জেলার খোকসা উপজেলার রমানাথপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম আবদুল গোফুর মোল্লা এবং মাতা মরহুমা নূরজাহান বেগম।
গ্রামীণ শান্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠা আবু বকর সিদ্দিকীর পারিবারিক পরিমণ্ডল ছিল অত্যন্ত শিক্ষানুরাগী ও আদর্শিক। তাঁর পরিবার শুধু তাঁকেই নয়, দেশের বিচার বিভাগকে উপহার দিয়েছে আরেকজন রত্ন—তাঁর ছোট ভাই হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, যিনি পরবর্তীতে বাংলাদেশের ২৩তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। একই পরিবার থেকে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে নেতৃত্ব দেওয়ার এই বিরল দৃষ্টান্ত তাঁদের পারিবারিক মূল্যবোধ ও শৃঙ্খলারই প্রতিফলন।
শিক্ষাজীবন: জ্ঞানানুশীলনের মজবুত ভিত্তি
আইনের মতো একটি জটিল ও বিশ্লেষণাত্মক পেশায় সফল হতে গেলে একটি মজবুত শিক্ষাগত ভিত্তির প্রয়োজন হয়। আবু বকর সিদ্দিকীর শিক্ষাজীবন ছিল অত্যন্ত গোছানো এবং কৃতিত্বপূর্ণ।
- প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা: তিনি নিজ এলাকার খোকসা জানিপুর সরকারি পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে এসএসসি (SSC) পাস করেন।
- উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা: এরপর তিনি বাগেরহাটের ঐতিহ্যবাহী সরকারি পি.সি. কলেজ থেকে আইএসসি (ISC) সম্পন্ন করেন।
- উচ্চশিক্ষা ও আইন পাঠ: বিজ্ঞানের ছাত্র হলেও পরবর্তীতে তিনি আইন পেশায় ক্যারিয়ার গড়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি স্বনামধন্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথমে বিএসসি (B.Sc) এবং পরবর্তীতে আইনশাস্ত্রে এলএলবি (LL.B) ডিগ্রি অর্জন করেন।
বরেণ্য কর্মজীবন: তৃণমূল থেকে সর্বোচ্চ আদালত
বিচারপতি আবু বকর সিদ্দিকীর কর্মজীবন অধ্যবসায় ও ধাপে ধাপে সাফল্যের এক অনন্য উদাহরণ। তিনি সরাসরি উচ্চ আদালতে নিয়োগ পাননি; বরং একেবারে তৃণমূল পর্যায় থেকে বিচারিক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে সর্বোচ্চ পর্যায়ে আসীন হয়েছেন।
বিচারিক জীবনের প্রারম্ভিক পর্যায়
আইন পেশায় তাঁর হাতেখড়ি হয় নিজ জেলা কুষ্টিয়াতেই। ১৯৭৯ সালে তিনি কুষ্টিয়া জেলা আইনজীবী সমিতিতে (Kushtia Bar Association) একজন আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। তবে তিনি কেবল আইন পেশায় সীমাবদ্ধ না থেকে বিচার বিভাগে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেন।
১৯৮০ সালের ২৩ এপ্রিল তিনি ‘মুনসেফ’ (সহকারী জজ) হিসেবে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসে যোগদান করেন। দীর্ঘ ১৭ বছর নিম্ন আদালতের বিভিন্ন পর্যায়ে সততা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পর ১৯৯৭ সালের ৭ মে তিনি জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন।
হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে নিয়োগ
নিম্ন আদালতে দীর্ঘ তিন দশকের অভিজ্ঞতার পর তাঁর মেধা ও বিচারিক প্রজ্ঞার মূল্যায়ন করে সরকার তাঁকে উচ্চ আদালতে নিয়োগ দেয়।
- ২০০৯ সালের ৩০ জুন তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান।
- দুই বছর পর, ২০১১ সালের ৬ জুন তিনি হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বিচারক হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
- হাইকোর্টে দীর্ঘ ৯ বছর অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পর, ২০১৮ সালের ৯ অক্টোবর তিনি দেশের সর্বোচ্চ আদালত—সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন।
বাংলাদেশের বিচার বিভাগে এক বিরল ইতিহাস
বিচারপতি আবু বকর সিদ্দিকীর কর্মজীবনের একটি ঐতিহাসিক ও বিরল দিক রয়েছে, যা বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে প্রথম। আপিল বিভাগে তাঁর নিয়োগের সময় তাঁর আপন ছোট ভাই বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীও একই বিভাগে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে আপন দুই ভাইয়ের একই সঙ্গে আপিল বিভাগের বিচারপতি পদে আসীন থাকার এটিই ছিল প্রথম ঘটনা। কুষ্টিয়ার খোকসার একটি প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে এসে দুই ভাইয়ের এমন অনন্য উচ্চতায় আরোহণ স্থানীয় জনসাধারণের জন্য এক অভাবনীয় গর্বের বিষয়।
বিচারিক দর্শন ও অবসর পরবর্তী দায়িত্ব
২০২১ সালের ১৫ জুলাই তিনি বিচারিক কাজ থেকে বিদায় নেন এবং ২৮ জুলাই ৬৭ বছর পূর্ণ হওয়ায় আপিল বিভাগ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর গ্রহণ করেন। তাঁর বিচারিক দর্শনের অন্যতম মূলভিত্তি ছিল আইনের শাসন ও বিচারপ্রার্থীদের হয়রানিমুক্ত সেবা প্রদান। তাঁর বিদায়ী সংবর্ধনায় দেওয়া একটি বক্তব্য অত্যন্ত বিখ্যাত— “বিচারালয় যেন বাণিজ্যালয় না হয়।” এই একটি বাক্যেই তাঁর ন্যায়নিষ্ঠতা ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা ফুটে ওঠে।
অবসরের পরও রাষ্ট্র তাঁর মেধা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েছে। সুদীর্ঘ বিচারিক অভিজ্ঞতার মূল্যায়নস্বরূপ সরকার তাঁকে পরবর্তীতে ‘আইন কমিশন’-এর সদস্য হিসেবে নিয়োগ প্রদান করে।






