খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ই জানুয়ারি ২০১৫, ১২:১১ পিএম

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাংস্কৃতিক রাজধানী কুষ্টিয়া জেলার রূপ, লাবণ্য এবং উর্বর কৃষির মূল কারিগর হলো এর নদীমাতৃক অববাহিকা। গড়াই আর পদ্মার পলিমাটি দিয়ে গড়া এই জেলার বুক চিরে জালের মতো ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য নদ-নদী, খাল ও বিল। এই জলাশয়গুলো কেবল এই অঞ্চলের ভূপ্রকৃতিকেই সতেজ রাখেনি, বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ব্যবসা-বাণিজ্য, লোকসংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনযাত্রাকে পরম মমতায় আগলে রেখেছে। কুষ্টিয়া জেলার জলপ্রবাহের সেই মূল চালিকাশক্তিগুলোর বিস্তারিত রূপরেখা নিচে তুলে ধরা হলো।
হিমালয় থেকে উৎপন্ন হওয়া পবিত্র গঙ্গা নদী যখন বাংলাদেশে প্রবেশ করে, তখন তার নাম হয় পদ্মা। এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় দীর্ঘতম এবং অন্যতম প্রধান প্রমত্তা নদী। বাংলাদেশের উত্তর-দক্ষিণের সীমানা নির্ধারণে এবং কুষ্টিয়ার ভূপ্রকৃতি গঠনে পদ্মার ভূমিকা অতুলনীয়। বাংলাদেশে এই নদীটির দৈর্ঘ্য ১২১ কিলোমিটার এবং এর গড় প্রস্থ প্রায় ১০ কিলোমিটার। সর্পিলাকার প্রকৃতির এই নদীটি যেমন শান্ত, বর্ষায় তেমনই এর রূপ হয়ে ওঠে ভয়ংকর। এর সর্বোচ্চ গভীরতা ১,৫৭১ ফুট (৪৭৯ মিটার) এবং গড় গভীরতা ৯৬৮ ফুট (২৯৫ মিটার)।
ঐতিহাসিকভাবে, রাজা রাজবল্লভের তৈরি বহু কীর্তি ও প্রাসাদ এই নদীর তীব্র ভাঙনের মুখে পড়ে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল বলে লোকমুখে পদ্মার আরেক নাম ‘কীর্তিনাশা’। কুষ্টিয়া জেলার উত্তর সীমান্ত ঘেঁষে এই নদীটি প্রবাহিত হয়েছে এবং এই জেলাতেই পদ্মার বুক থেকে জন্ম নিয়েছে গড়াই, কুমার, মাথাভাঙ্গা ও হিসনার মতো গুরুত্বপূর্ণ সব শাখা নদী।
গড়াই নদীকে কুষ্টিয়া জেলার ‘জীবনরেখা’ বা প্রাণ বলা চলে। এটি পদ্মা তথা গঙ্গার একটি অন্যতম প্রধান শাখানদী, যা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের পরিবেশ ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। কুষ্টিয়া জেলার উত্তর প্রান্তে অবস্থিত ঐতিহাসিক হার্ডিঞ্জ ব্রিজের প্রায় ১৯ কিলোমিটার ভাটিতে ‘তালবাড়িয়া’ নামক স্থানে গড়াই নদীটি পদ্মা থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে। এরপর কুষ্টিয়া জেলার কুমারগাড়ো ও শহর ঘেঁষে প্রবাহিত হয়ে এটি গণেশপুর নামক স্থান দিয়ে ঝিনাইদহ জেলায় প্রবেশ করেছে।
পরবর্তীতে এটি মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার নাকোল ইউনিয়ন পর্যন্ত প্রবাহিত হয়ে ‘মধুমতি’ নামে সাগরে পানের উদ্দেশ্যে এগিয়ে গেছে। ইতিহাসবিদদের মতে, এক সময় হুগলি-ভাগীরথী গঙ্গার আদি ধারা হলেও, কোনো এক যুগে এই গড়াই নদী দিয়েই গঙ্গার মূল স্রোত প্রবাহিত হতো।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রবহমান একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃসীমান্ত নদী হলো মাথাভাঙ্গা। নদীটি কুষ্টিয়া জেলাতেই পদ্মা থেকে মাথা তুলে ভারতের সীমান্তবর্তী মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এই নদীটির মোট দৈর্ঘ্য ১২১ কিলোমিটার এবং এর গড় প্রস্থ ২৯ মিটার। চুয়াডাঙ্গার দর্শনার নিকট এই নদীর গভীরতা প্রায় ১০ মিটার এবং এর অববাহিকার মোট আয়তন ৫০০ বর্গকিলোমিটার। মাথাভাঙ্গা নদীর একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি সম্পূর্ণ জোয়ার-ভাটার প্রভাবমুক্ত এবং এর তীর উপচে সাধারণত পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বন্যা হয় না, যা একে একটি শান্ত ও আশীর্বাদপুষ্ট নদী হিসেবে পরিচিত করেছে।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি ও ঐতিহ্যের সাথে কুমার নদের নাম গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। কুষ্টিয়া জেলা থেকে উৎপন্ন হয়ে এটি চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ এবং মাগুরা জেলার মধ্য দিয়ে তার অবয়ব বিস্তার করেছে। নদীটির মোট দৈর্ঘ্য ১২৪ কিলোমিটার এবং এর গড় প্রস্থ প্রায় ৭৫ মিটার। এক সময়ের প্রমত্তা কুমার নদ আজ কিছুটা নাব্যতা সংকটে ভুগলেও এর চারপাশের ফসলি জমি ও গ্রামীণ জনপদকে সতেজ রাখতে এর ভূমিকা আজও অনন্য।
কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নদী হলো কালীগঙ্গা। এই নদীটি মূলত কুষ্টিয়া জেলায় অবস্থিত গড়াই নদী থেকে তার মূল পানির প্রবাহ গ্রহণ করে। গড়াই থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এটি সোজা দক্ষিণ মুখী হয়ে প্রবাহিত হয়ে ঝিনাইদহ সদর উপজেলায় প্রবেশ করেছে। বর্ষাকালে এই নদীতে পানির ব্যাপক প্রবাহ দেখা যায়।
হিসনা নদীটি পদ্মার একটি ছোট অথচ ঐতিহাসিক শাখা নদী। নদীটি কুষ্টিয়া জেলার উত্তর-পশ্চিম প্রান্তের ভেড়ামারা উপজেলার পদ্মা নদী থেকে কিছুটা পশ্চিম মুখী হয়ে যাত্রা শুরু করে। এরপর ভেড়ামারা শহরের কোল ঘেঁষে এটি বাহাদুরপুর ইউনিয়নের অভিমুখে প্রবাহিত হয়েছে। স্থানীয় কৃষিকাজ ও মাছ চাষের জন্য হিসনা নদী এই অঞ্চলের মানুষের কাছে অত্যন্ত প্রিয়।
নদীগুলোর পাশাপাশি কুষ্টিয়ার অভ্যন্তরীণ জমি চাষাবাদ এবং পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রাকৃতিকভাবে ও কৃত্রিমভাবে বেশ কিছু বড় খাল গড়ে উঠেছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
তালবাড়ীয়া খাল (যা গড়াই নদীর উৎপত্তিস্থলের কাছাকাছি অবস্থিত)
মোসা খাল
জিয়া খাল (যা এই অঞ্চলের সেচ প্রকল্পে বড় ভূমিকা রাখে)
বৌদাঙ্গী খাল * বরিশাল খাল
এই খালগুলো বর্ষার অতিরিক্ত পানি নদীগুলোতে নিয়ে যায় এবং শুষ্ক মৌসুমে বিলগুলোর পানি ধরে রেখে কৃষিকাজে সহায়তা করে।
কুষ্টিয়া জেলার নিম্নভূমিগুলোতে ছড়িয়ে রয়েছে বেশ কিছু বিশাল ও ঐতিহ্যবাহী বিল। এই বিলগুলো শীতকালে পরিযায়ী বা অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয় এবং বর্ষাকালে বিশাল জলধির রূপ নেয়। কুষ্টিয়ার প্রধান বিলগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো—
বামন্দী বিল ও আড়ুয়া বিল
পুঁটিমারা বিল ও মৌলার বিল
বোয়ালিয়া বিল ও তালবাড়ীয়া বিল
সমসপুর বিল, কাদিরপুর বিল এবং সোনাপাতিল বিল
এই বিলগুলো কেবল কুষ্টিয়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকেই বাড়িয়ে দেয়নি, বরং এগুলো স্থানীয় মানুষের দেশি মাছের চাহিদা মেটানোর প্রধান উৎস এবং জীবিকার এক অন্যতম বড় মাধ্যম হিসেবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে আছে। নদী, খাল আর বিলের এই সুবিন্যস্ত জলজালই মূলত কুষ্টিয়াকে করেছে চিরসবুজ আর প্রাণবন্ত।
মন্তব্য