নিজস্ব প্রতিবেদক: আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারা দেশের ন্যায় কুষ্টিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনেও বইছে ব্যাপক নির্বাচনী আমেজ। সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে গত রোববার (২৬ নভেম্বর) বিকেলে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউস্থ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দলীয় মনোনীত প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেন।
‘সাংস্কৃতিক রাজধানী’ খ্যাত কুষ্টিয়া জেলার সংসদীয় ৪টি আসনের মধ্যে ৩টিতে নৌকার কাণ্ডারি ঘোষণা করেছে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। তবে রাজনৈতিক কৌশলগত কারণে কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা) আসনে আপাতত নৌকার কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়নি।
এদিকে দলীয় প্রার্থীর নাম ঘোষণার পর থেকেই জেলাজুড়ে যেমন বইছে আনন্দের জোয়ার, ঠিক তেমনি মনোনয়ন বঞ্চিতদের সমর্থকদের মাঝে দেখা দিয়েছে হতাশা। রাজনৈতিক মহলে জোর গুঞ্জন চলছে—কুষ্টিয়ার অন্তত তিনটি আসনে একাধিক দলীয় হেভিওয়েট নেতা ‘বিদ্রোহী’ বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে অবতীর্ণ হতে পারেন।
নিম্নে কুষ্টিয়ার ৪টি আসনের দলীয় মনোনয়ন পরিস্থিতি, প্রার্থীদের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও নির্বাচনী সমীকরণ বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
Table of Contents
Toggle- কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর): আ. কা. ম. সরওয়ার জাহান বাদশাহর ওপরই ফের আস্থা
- কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা): জোটের সমীকরণে ফাঁকা নৌকার আসন
- কুষ্টিয়া-৩ (সদর): টানা তৃতীয়বারের মতো নৌকার কাণ্ডারি মাহবুবউল আলম হানিফ
- কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা): তারুণ্য ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে ব্যারিস্টার জর্জ
- বিদ্রোহী প্রার্থীর শঙ্কা ও নির্বাচনী আমেজ
- নির্বাচন কমিশনের তফসিল ও মনোনয়ন পরিসংখ্যান
কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর): আ. কা. ম. সরওয়ার জাহান বাদশাহর ওপরই ফের আস্থা
দৌলতপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত কুষ্টিয়া-১ (সংসদীয় আসন-৭৫) আসনে নৌকা প্রতীক প্রত্যাশা করে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছিলেন মোট ১৭ জন নেতা।
মনোনয়ন প্রত্যাশী যারা ছিলেন:
আ. কা. ম. সরওয়ার জাহান বাদশাহ, আলহাজ্ব রেজাউল হক চৌধুরী, বুলবুল আহমেদ চৌধুরী, এজাজ আহমেদ মামুন বিশ্বাস, আরিফ আহমেদ বিশ্বাস, নাজমুল হুদা পটল বিশ্বাস, শরীফ উদ্দিন রিমন, দেওয়ান মাসুদ করিম মিঠু, মোফাজ্জেল হক, মাহমুদুল হাসান রাকিব, ছাদিকুজ্জামান খান সুমন, হাসানুল আসকার হাসু, আনছার আলী খান, তারিক আল মামুন, আবদুল জলিল, আহসান হাবিব এবং রাশেদুল ইসলাম বিপ্লব।
যাচাই-বাছাই শেষে দলের সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ড বর্তমান সংসদ সদস্য ও দৌলতপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আ. কা. ম. সরওয়ার জাহান বাদশাহকেই পুনরায় নৌকা প্রতীক বরাদ্দ দিয়েছে।
কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা): জোটের সমীকরণে ফাঁকা নৌকার আসন
মিরপুর ও ভেড়ামারা উপজেলা নিয়ে গঠিত কুষ্টিয়া-২ (সংসদীয় আসন-৭৬) আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম তুলেছিলেন ৬ জন।
তারা হলেন—ইফতেখার মাহমুদ, আতাহার আলী, কামারুল আরেফিন, শরিফুজ্জামান নবাব, সৈয়দ কামরুল আরিফিন এবং রশিদুল আলম।
তবে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এই আসনে কোনো নৌকার প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেননি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক দল জাসদ (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল)-এর সভাপতি হাসানুল হক ইনুর জন্য জোটগত সমঝোতার অংশ হিসেবেই এই আসনে আওয়ামী লীগ দলীয় কোনো প্রার্থী দেয়নি।
কুষ্টিয়া-৩ (সদর): টানা তৃতীয়বারের মতো নৌকার কাণ্ডারি মাহবুবউল আলম হানিফ
কুষ্টিয়া সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত কুষ্টিয়া-৩ (সংসদীয় আসন-৭৭) আসনে দলীয় মনোনয়ন ফরম তুলেছিলেন মোট ৬ জন। তারা হলেন—বর্তমান এমপি মাহবুবউল আলম হানিফ, প্রখ্যাত আইনজীবী ব্যারিস্টার এম. আমীর-উল ইসলাম, বীর মুক্তিযোদ্ধা আজগর আলী, ডাঃ এ এফ এম আমিনুল হক রতন, আনজুমান লাইলা বানু এবং খন্দকার মাহাতাবুল হক জয়।
দলীয় সিদ্ধান্ত মোতাবেক এই আসন থেকে টানা তৃতীয়বারের মতো নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করবেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ।
কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা): তারুণ্য ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে ব্যারিস্টার জর্জ
কুমারখালী ও খোকসা উপজেলা নিয়ে গঠিত কুষ্টিয়া-৪ (সংসদীয় আসন-৭৮) আসনে নৌকার টিকিট পেতে মনোনয়ন ফরম তুলেছিলেন সর্বোচ্চ ১২ জন।
তারা হলেন—বর্তমান এমপি ব্যারিস্টার সেলিম আলতাফ জর্জ, বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব সদর উদ্দিন খান, জাহিদ হোসেন জাফর, আব্দুর রউফ, আব্দুল মান্নান খান, বিশিষ্ট তথ্যপ্রযুক্তিবিদ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর, সুলতানা তরুণ, তানিয়া আমীর, মিজানুর রহমান, অভি চৌধুরী, সুনীল কুমার চক্রবর্তী এবং শাহিনুর রহমান।
সকল জল্পনা-কল্পনা শেষে এই আসনে দলের হাইকমান্ড বর্তমান সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার সেলিম আলতাফ জর্জের হাতেই পুনরায় নৌকা তুলে দিয়েছে।
২০১৮ সালে তিনি মনোনয়ন পাবার মাধ্যমে পরিচিত পান। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তরুণ এই নেতা প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
বিদ্রোহী প্রার্থীর শঙ্কা ও নির্বাচনী আমেজ
নৌকার মনোনীত প্রার্থীদের নাম ঘোষণার পরপরই জেলাজুড়ে দলীয় নেতাকর্মীরা উল্লাসে ফেটে পড়েন। বিভিন্ন স্থানে মিষ্টি বিতরণ, মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা ও আনন্দ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
তবে মুদ্রার উল্টোপিঠে রয়েছে চরম রাজনৈতিক চাপা উত্তেজনা। দলের সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানিয়ে প্রকাশ্যে অনেক মনোনয়নবঞ্চিত নেতা ও তাঁদের সমর্থকরা নীরব থাকলেও, ভেতরে ভেতরে চলছে নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দলীয় নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলোর মতে, কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর), কুষ্টিয়া-৩ (সদর) এবং কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) আসনে মনোনয়নবঞ্চিত একাধিক আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের প্রভাবশালী নেতা ‘স্বতন্ত্র প্রার্থী’ (বিদ্রোহী) হিসেবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন বলে জোরালো গুঞ্জন রয়েছে। যদি এমনটা হয়, তবে আগামী নির্বাচনে কুষ্টিয়ার আসনগুলোতে এক তীব্র ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটের লড়াই দেখার সম্ভাবনা রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের তফসিল ও মনোনয়ন পরিসংখ্যান
উল্লেখ্য, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে গত ১৮ থেকে ২১ নভেম্বর পর্যন্ত চার দিনব্যাপী আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রি কার্যক্রম চলে। সারা দেশ থেকে মোট ৩ হাজার ৩৬২টি মনোনয়ন ফরম বিক্রি করে দলটির আয় হয়েছে ১৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন ৩০ নভেম্বর। এরপর ১ থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই। আপিল ও নিষ্পত্তি হবে ৬ থেকে ১৫ ডিসেম্বর এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ১৭ ডিসেম্বর। প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে ১৮ ডিসেম্বর। আর আগামী ৭ জানুয়ারি (রবিবার) সারা দেশে একযোগে অনুষ্ঠিত হবে বহুল প্রতীক্ষিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।









