কুমারখালীর হাতুড়ে চিকিৎসককে এক বছরের জেল - কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

কুমারখালীর হাতুড়ে চিকিৎসককে এক বছরের জেল

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: এপ্রিল ১৩, ২০২৬

কুমারখালী প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে হাফেজ মো. ইব্রাহিম খলিল্লাহ (২৮) নামের এক হাতুড়ে ডাক্তারকে একবছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এছাড়াও অনির্দিষ্টকালের জন্য ওই ডাক্তারের চেম্বারটি সিলগালা করা হয়েছে। গতকাল রবিবার (১২ এপ্রিল) দুপুর আড়াইটার দিকে উপজেলার শিলাইদহ ইউনিয়নের বেলগাছি গগণ হরকরা মোড় এলাকায় উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স যৌথ অভিযান চালায়। অভিযানে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ এর ৫২ ধারায় আদালত পরিচালনা করেন উপজেলা সহকারী কমিশনার ( ভূমি) নাভিদ সারওয়ার।

আদালত পরিচালনায় সহযোগীতা করেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা চিকিৎসক মোছা. শামিমা আক্তার, থানা পুলিশ প্রমূখ। হাতুড়ে চিকিৎসক ইব্রাহিম খলিল্লাহ শিলাইদহ ইউনিয়নের দাঁড়িগ্রামের রশিদ শেখের ছেলে ও বেলগাছি মেডিকেল হলের মালিক। আদালত ও লিখিত অভিযোগ সুত্রে জানা গেছে, হাফেজ মো. ইব্রাহিম খলিল্লাহ কয়েকবছর আগে মসজিদের ইমামতি করতেন। এরপর মানবিক বিভাগ থেকে ২০১৪ সালে এসএসি পাশ করেন। পরে একটি কলেজ থেকে ডিগ্রিও পাস করেন। পরে ২০২৩ সালে কুমারখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে মাত্র ২১ দিনের প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ নেন।

এরপর তিনি বেলগাছি গগণ হরকরা মোড় এলাকায় বেলগাছি মেডিকেল হল নামে একটি চেম্বার খুলে শিশুসহ বিভিন্ন বয়সি মানুষকে সকল রোগের চিকিৎসা দেওয়া শুরু করেন। সম্প্রতি কয়েকজন শিশু চুলকানি রোগের জন্য তাঁর কাছে গেলে তিনি তাঁদের আলফাকোর্ট নামের একধরনের ষ্টেরোয়েড ইনজেকশন দেন। ইনজেকশনের পর থেকে শিশুদের কারও মুখ অস্বাভাবিকভাবে ফুলে উঠছে, কারও মুখে গজাচ্ছে লোম। এতে অন্তত ১০ শিশুর জীবন বিপন্ন হতে বসলে ৮ মার্চ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরবার লিখিত অভিযোগ দেন ভুক্তভোগী সাত অভিভাবক।

গতকাল দুপুরে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, শিলাইদহের রবীন্দ্র কুঠিবাড়ী-আলাউদ্দিন নগর সড়কে বেলগাছি গগণ হরকরা মোড়। মোড়ের পূর্বপাশে অবস্থিত বেলগাছি মেডিকেল হল নামক একটি ওষুধের দোকান। সেখানে অভিযান চালাচ্ছে প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা। ভিড় করেছেন উৎসুক জনতা। এ সময় শিলাইদহ ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য ওয়াজ উদ্দিন বলেন,  গ্রামের মানুষ বোকাসোকা। আর সেই সুযোগে বিশাল সাইনবোর্ড টাঙিয়ে ভুলভাল চিকিৎসা দিচ্ছিলেন ইব্রাহিম। অথচ সে ডাক্তারই না। আসলে এসব প্রতারকদের শাস্তি হওয়া উচিৎ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, এতোদিন জানতাম ইব্রাহিম ডাক্তার। নামের আগে ডাক্তার লিখেন তিনি। সিল- প্যাডও আছে। অথচ আজ শুনলাম মাত্র ২১ দিনের ট্রেনিং নিয়ে তিনি ডাক্তারী করছেন। এভাবে মানুষের জীবন নিয়ে খেলা ঠিক নয়।

দাঁড়িগ্রামের খাইরুল ইসলাম বলেন, তিন – চার মাস আগে আমার মেয়ে খাদিজার (১৩) চুলকানী রোগ হলে ইব্রাহিমের কাছে নিয়েছিলাম। তিনি আলফাকোর্ট ইনজেকশন দিলে মেয়ে খুব কান্নাকাটি শুরু করে। এরপর ধীরে ধীরে মেয়ের মুখ অস্বাভাবিকভাবে ফুলে উঠে। পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক চিকিৎসকের কাছে নিই। বর্তমানে সেখানে চিকিৎসা চলছে। তাঁর ভাষ্য, ইব্রাহিমের ভুল চিকিৎসায় অন্তত ১০ শিশুর জীবন বিপন্ন। কারও মুখ অস্বাভাবিককভাবে ফুলে গেছে। কারও মুখে লোম গজিয়েছে। সবাই কুষ্টিয়া, ঢাকা ও রাজশাহীর বিভিন্ন চিকিৎসকের সেবা নিচ্ছে বর্তমানে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা চিকিৎসক মোছা. শামিমা আক্তার বলেন, মাত্র ২১ দিনের প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি ( ইব্রাহিম) ক্লিনিকের মতো চেম্বার খুলে চিকিৎসা দিচ্ছিলেন। এমনকি ষ্টেরোয়েড জাতীয় চিকিৎসাও দিচ্ছিলেন। যা তিনি করতে পারেন না।

এতে অনেকের জীবন বিপন্ন হতে বসেছে। এমন কয়েকজন শিশুর অভিভাবকের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচিলনা করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, এখন হাতেই কাছেই অনেক সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্র আছে। সুতরাং সবাইকে আরও সচেতন হতে হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার বলেন, লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে এক হাতুড়ে চিকিৎসককে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে একবছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। এছাড়াও চেম্বারটিকে সিলগালা করা হয়েছে। জনস্বার্থে এমন অভিযান অব্যাহত থাকবে।