দৌলতপুর প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ধর্মা অবমাননার অভিযোগে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ও মুসল্লিদের হামলায় নিহত কথিত পীর শামীম রেজা বা শামীম জাহাঙ্গীর (৫৫) এর দাফন সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল রবিবার (১২ এপ্রিল) বিকেল সাড়ে ৫টায় পুলিশ প্রহরায় দক্ষিণ-পশ্চিম ফিলিপনগর কবরস্থানে জানাজা শেষ তার দাফন সম্পন্ন করা হয়। এর আগে বিকেল সাড়ে ৩ টায় নিহত শামীম রেজার মরদেহ কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে সেনাবাহিনীর তত্বাবধানে নিজ বাড়িতে নেওয়া হয়। সেখানে আনুষ্ঠানিকতা শেষে তার মরদেহ কবরস্থানে নেওয়া হয়।
তবে কথিত ওই পীর শামীম রেজার জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠানে তার ভক্ত ও অনুসারীদের উপস্থিতি ততটা লক্ষ্য করা যায়নি। দুই একজন ভক্তদের দেখা গেলেও তারা এ বিষয়ে কেউ মুখ খুলতে রাজি হননি। এদিকে নিহত শামীম রেজার দাফন দক্ষিণ-পশ্চিম ফিলিপনগর গ্রামের তার নিজ আস্তানায় করার জন্য দু’এক ভক্ত দাবি জানালেও নিহতের পরিবার, এলাকাবাসী ও প্রশাসনের সিদ্ধান্তে সেটা সম্ভব হয়নি। এদিকে শামীম রেজাকে হত্যার পর থেকে তার আস্তানা ও আশপাশের এলাকায় থমতমে অবস্থা বিরাজ করছে। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে আস্তানা বা দরবার শরীফে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনী মোতায়েন রয়েছে।
বিক্ষুব্ধ জনতার হামলায় ধ্বংসস্তুপে পরিণত হওয়া আস্তানার আসবাবপত্র ও বাদ্যযন্ত্র ছাড়ানো ছিটানো অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে। নিহত পীর শামীম জাহাঙ্গীরের বড় ভাই অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক ফজলুর রহমান জানান, দুপুরে নামাজ পড়ে এসে খাওয়া-দাওয়ার সময় হঠাৎ চিল্লাচিল্লিতে বাইরে বের হয়ে দেখি ভাই রক্তাক্ত অবস্থায় অচেতন হয়ে মাটিতে পড়ে আছে। পুলিশের সহায়তায় তাকে নিয়ে আমরা হাসপাতালে যাই। এর কিছুক্ষণ পরে আমার ভাই মারা যায়। তিনি আরও বলেন, আমার ভাই খুব ভালো ছাত্র ছিল। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স কমপ্লিট করেছেন। পরে তিনি রেডিয়েন্ট অ্যান্ড কলেজের ম্যানেজমেন্টের প্রধান ছিলেন।
চাকরিরত অবস্থায় তার বিয়ে হয় এবং দেড় থেকে দুই বছরের সংসার জীবন হওয়ার পরে তারা আলাদা হয়ে যায়। এরপরে আমার ভাই কেরানীগঞ্জের জাহাঙ্গীরের কাছে ছিলেন। এরপর থেকে আমরা জানি, আমার ভাই মারা গেছেন। তার কোনো খোঁজ খবর ছিল না। করোণাকালে আমার ভাই এলাকায় আসেন। তারপর থেকে তিনি নিজের মত করে থাকা শুরু করেন। আমার ভাই খুব সৌখিন মানুষ ছিলেন।
অভিযোগ থাকলে সমাধান করতে পারত। এইভাবে একটা মানুষকে মারা ঠিক হয়নি। মামলার বিষয়ে তিনি জানান, গতকাল রোববার রাতে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে বসে সিদ্ধান্ত নেব; আমরা মামলা করব কি করব না। বা কি করা যায়। দাফনের পর তার ফুফাতো ভাই জানান, যারা এই কাজ করেছেন খুব খারাপ করেছেন। কোনো সমস্যা থাকলে তার সাথে বসতে পারতো। তাকে বলতে পারতো। দেশে আইন-কানুন আছে। তারা আইনের আশ্রয় নিতে পারতো। এইভাবে একটা মানুষকে দিনের বেলা কেন হত্যা করতে হবে। কি স্বার্থ আছে তাদের?
এদিকে গতকাল রোববার দুপুর ১২টার দিকে খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপারেশন) শেখ জয়নুদ্দীন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সকলকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকার কথা বলেছেন। তবে হত্যাকান্ডের ঘটনায় এরিপোর্ট লেখা পর্যন্ত থানায় মামলা হয়নি এবং এ ঘটনায় কেউ আটক বা গ্রেফতার হয়নি বলে দৌলতপুর থানা পুলিশ সূত্র জানিয়েছে। ঘটনার পর শনিবার রাতে কুষ্টিয়া পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে গণমাধ্যম কর্মীদের জানিয়েছেন, পুরোনো একটি ভিডিও নতুন করে ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশ তাকে (শামীম) উদ্ধার করলেও জনতার তুলনায় সদস্য সংখ্যা কম থাকায় পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িতদের শনাক্তে কাজ চলছে।
শামীম হত্যার বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান গণমাধ্যমকে বলেন, বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি শান্ত ও স্বাভাবিক রয়েছে। বিজিবির টহলসহ সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মোতায়েন রয়েছে। হামলার ঘটনায় আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাদের বাড়িতেও পুলিশি পাহারা থাকবে। এ ছাড়াও দৌলতপুরের হোসেনাবাদ এলাকার বাউল শিল্পী শফি মণ্ডলের গ্রামের বাড়িতেও পুলিশ পাহারা রাখা হয়েছে। শফি মণ্ডল বর্তমানে ঢাকায় রয়েছেন।
হত্যাকান্ড সংঘঠিত হওয়ার খবর পেয়ে কুষ্টিয়া-১ দৌলতপুর আসনের এমপি আলহাজ্ব রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা ঢাকা থেকে এলাকায় ছুটে যান। ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, ঘটনাটি দুঃখজনক। অপরাধী যেই হোক তার জন্য আইন আছে, প্রশাসন আছে। তাই বলে আইন হাতে তুলে নিয়ে কাউকে হত্যা করা এটা কারো জন্য কাম্য হতে পারেনা। তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনা হবে বলে উল্লেখ করেন। এরআগে শনিবার দুপুর আড়াইটার দিকে দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের দক্ষিন-পশ্চিম ফিলিপনগর গ্রামে অবস্থিত কথিত পীর শামীম রেজাকে তার আস্তানার দোতলার নিজ কক্ষ থেকে টেনে হেঁচড়ে বের করে তাকে পিটিয়ে ও ধারাল অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করে দোতলর থেকে নীচে ছুড়ে ফেলা হয়। সেখান থেকে তার ভক্তরা উদ্ধার করে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক শামীমকে মৃত ঘোষণা করেন।
এসময় বিক্ষুব্ধ জনতা তার আস্তানায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। হামলায় কথিত ওই পীরের কয়েকজন নারীভক্ত সহ অন্তত ৭ জন ভক্ত আহত হয়ে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন চিকিৎসা কেন্দ্রে ভর্তি রয়েছেন। এরআগে কথিত পীর শামীম রেজা ওরফে শামীম জাহাঙ্গীরের দেওয়া পবিত্র কোরআন অবমাননাকর বক্তব্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছড়িয়ে পড়লে এলাকাবাসী ও ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। পরে তারা ফিলিপনগর আবেদের ঘাটে সংগবদ্ধ হয়ে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শামীমের দরবার বা আস্তায় হামলা চালায়। এসময় হামলকারীরা কথিত পীর শামীম রেজাকে এলোপাতাড়িভাবে কুপিয়ে ও পিটিয়ে গুরুতর জখম করে আস্তানায় আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
খবর পেয়ে দৌলতপুর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। স্থানীয়দের দাবি, ইসলাম ও কোরআন অবমাননার অভিযোগে বিক্ষুব্ধ জনতা এ হামলা চালায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি পুরোনো ভিডিও নতুন করে ভাইরাল হওয়ার পর এনিয়ে এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। স্থানীয় ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শামীম রেজা ২০১৮ সালের দিকে পৈতৃক ভিটায় আস্তানা গড়ে তোলেন এবং নিজেকে ‘সংস্কারপন্থী ইমাম’ পরিচয় দিতেন। তার আগে তিনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করে ঢাকায় একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। পরে চাকরি ছেড়ে আধ্যাত্মিক চর্চায় যুক্ত হন। ২০২১ সালে একটি শিশুর মরদেহ বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে দাফনের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তিনি সেসময় আলোচনায় আসেন।
একই বছরের ১৮ সেপ্টেম্বরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে তাকে আটক করে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। হত্যাকাণ্ড সংঘঠিত হওয়ার খবর পেয়ে কুষ্টিয়া-১ দৌলতপুর আসনের এমপি রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা ঢাকা থেকে এলাকায় ছুটে যান। ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, ঘটনাটি দুঃখজনক। অপরাধী যেই হোক তার জন্য আইন আছে, প্রশাসন আছে। তাই বলে আইন হাতে তুলে নিয়ে কাউকে হত্যা করা এটা কারো জন্য কাম্য হতে পারেনা। তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনা হবে বলে উল্লেখ করেন। এর আগে, শনিবার (১১ এপ্রিল) দুপুর আড়াইটার দিকে দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের দক্ষিণ-পশ্চিম ফিলিপনগর গ্রামে অবস্থিত কথিত পীর শামীম রেজাকে তার আস্তানার দোতলার নিজ কক্ষ থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে তাকে পিটিয়ে ও ধারাল অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করে দোতলা থেকে নিচে ছুড়ে ফেলা হয়। সেখান থেকে তার ভক্তরা উদ্ধার করে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে সেখানকার চিকিৎসক শামীমকে মৃত ঘোষণা করেন।
